সুন্নি মনীষীদের দৃষ্টিতেও কেন ইয়াজিদ চরম ঘৃণার পাত্র? (পর্ব ০১)



অভিশপ্ত ইয়াজিদ ইমাম হুসাইন (আ.)কে শহীদ করার ঘটনার পর বলেছিল: আমার পূর্বপুরুষরা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে তারা দেখতেন যে, কিভাবে আমি মুহাম্মাদের পরিবার ও (তাঁদের গোত্র) বনি হাশিমের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি।  

অভিশপ্ত ইয়াজিদ এক কবিতা আবৃত্তি করে বলেছিল: আমি আহমদের (রাসূল-সা.) কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি বদর যুদ্ধের বদলা হিসেবে যা সে (তিনি) করেছিল ওই যুদ্ধে আমাদের পূর্ব পুরুষদের বিরুদ্ধে।

লম্পট ও মদ্যপ ইয়াজিদ আরো বলেছিল: মদ যদি দ্বীনে মুহাম্মাদিতে হারাম হয়ে থাকে তবে ঈসা ইবনে মারিয়মের ধর্ম তথা খ্রিস্টান ধর্মের আলোকে হালাল হিসেবে খাও!!! (তাফসিরে ইবনে মাজহারি, খ-৫, পৃ-২১১-১২) 

ইয়াজিদের এতসব কুফরি কাজ ও বর্বরতা সত্ত্বেও আজকাল ও অতীতেও নানা যুগে একদল জ্ঞান-পাপী ও অজ্ঞ (এদের অনেকই  ইয়াজিদ ও মুয়াবিয়া বা তার সঙ্গীদের বংশধর) এবং একদল সুবিধাবাদী এটা দাবি করেন যে ইয়াজিদ নাকি হুসাইন (আ.)-কে হত্যার নির্দেশ দেয়নি। বরং ইমাম ও তাঁর সঙ্গীরা শহীদ হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং ইবনে জিয়াদ ইমাম ও নবী-পরিবারকে হত্যা করায় ইয়াজিদ তাকে তিরস্কার করেছিল।

এটা যে আষাঢ়ে গল্প বা সত্য হয়ে থাকলেও  তা যে ইয়াজিদের প্রতারণামূলক একটি অভিনয় বা সংক্ষিপ্ত নাটক ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা-না হলে ইয়াজিদ ইমাম হুসাইন (আ.) ও নবী-পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার করে তাদের শাস্তি দিত। এ ছাড়াও  ইয়াজিদ এতটা বিবেকবান ও ভাল মানুষ হলে তার বাহিনী মক্কা ও মদীনায়ও হামলা চালিয়ে এ দুই পবিত্র শহরে হাজার হাজার সাহাবিদেরকে হত্যা করত না এবং মদীনার নারীদের ওপর গণ-ধর্ষণ চালাতে তার সেনাদের নির্দেশ দিত না। (ধর্ষিত হয়েছিল এক হাজার কুমারী মেয়ে)।মক্কা ও মদিনায় রক্ত-গঙ্গা বইয়ে দেয়ার পাশাপাশি ইয়াজিদের বাহিনী বিশ্বনবী (সা.)র পবিত্র রওজা সংলগ্ন মসজিদকে ঘোড়ার আস্তাবল বানিয়ে এমন পবিত্র স্থানকে ঘোড়ার মল-মূত্র দিয়ে অপবিত্র করেছে এবং তারা পবিত্র কাবা ঘরে অগ্নিসংযোগ করেছিল। আর এইসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য সুন্নি ঐতিহাসিক সূত্রেই বর্ণিত হয়েছে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন  মাওলানা শাহ আবদুল হক দেহলাভীর লিখিত কারবালার পর পবিত্র মক্কা ও মদীনায় ইয়াজিদি তাণ্ডবলীলা শীর্ষক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ)

ইয়াজিদ সম্পর্কে ইমাম হুসাইনের .মন্তব্য

ইয়াজিদ ভাল মানুষ হলে ইমাম হুসাইন (আ.) এ কথা বলতেন না যে, ইয়াজিদের মত অসৎ লোক যদি মুসলমানদের (স্বীকৃত) নেতা হয় তাহলে ইসলাম চির-বিদায় নেবে। ইয়াজিদ ভাল মানুষ হলে মক্কা ও মদিনার বিখ্যাত সাহাবিরা তাকে সমর্থন করতেন, কিন্তু তারা তা করেননি বলেই মক্কা ও মদিনায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় ইয়াজিদ।

সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে যোবাইর

ইয়াজিদ এটা শুনেছিল যে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে যোবাইর বলতেন: ইয়াজিদ এক প্রতারক, মাতাল ও সত্য পথ পরিত্যাগকারী এবং এমন এক ব্যক্তি যে গায়িকা নারীদের সঙ্গে থাকে। (বিদায়া ও নিহায়া, খণ্ড-৮ পৃ-২৭৯) তিনি মদীনায় ইয়াজিদ বাহিনীর হত্যা ও অপরাধযজ্ঞকেও বৃহত্তম ও কুতসিততম অপরাধ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

ইবনে জিয়াদও ইয়াজিদকে ফাসিক বলেছে

এমনকি ইয়াজিদের দোসর ইবনে জিয়াদও মক্কায় হামলা চালানোর ব্যাপারে তার রাজা ইয়াজিদের হঠকারী নির্দেশে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিল: আল্লাহর শপথ! এক ফাসিকের জন্য আমি দুটি বিষয় সমন্বিত করব না। আমি এরিমধ্যে নবীর কন্যার সন্তানকে হত্যা করেছি। আর এখন সে (ইয়াজিদ) আমাকে বায়তুল হারামে যুদ্ধ বাধাতে বলছে। ইবনে জিয়াদ যখন ইমাম হুসাইন (আ.)-কে শহীদ করে তখন জিয়াদের মা মারজানা তীব্র তিরস্কার করে পুত্রকে বলেছিল: তোমার মৃত্যু হোক! তুমি কি করলে এবং কত বড় অপরাধ করেছ! (বিদায়া ও নিহায়া, খণ্ড-৮ পৃ-২৭৯)

মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াজিদ

ইয়াজিদ যে নিকৃষ্টতম ব্যক্তি ছিল তা তার ছেলে মুয়াবিয়া (দ্বিতীয় মুয়াবিয়া)ও উল্লেখ করেছিল বলে ইতিহাসে বর্ণনা এসেছে। ইয়াজিদ ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবার এবং সঙ্গীদের হত্যা করায় মুসলমানদের মধ্যে ইয়াজিদ পরিবার কলঙ্কিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াজিদ এবং এ জন্য সে ইয়াজিদের মৃত্যুর পর কথিত খলিফা হতে রাজি হয়নি।

ইয়াজিদের অভিশপ্ত হওয়া সংক্রান্ত আরো এক অকাট্য যুক্তি

সুন্নি মনীষী ইবনে কাসিরের বিদায়া ও নিহায়ার অষ্টম খণ্ডের ২৭৪ পৃষ্ঠায় এ হাদিসটি উল্লেখিত হয়েছে ইমাম হাম্বলের মুসনাদ থেকে। এতে বলা হয়েছে: যে অবিচার ছড়িয়ে দেয় ও মদীনার লোকদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তার ওপর আল্লাহর ও তাঁর ফেরেশতাদের এবং সব মানুষের অভিশাপ বর্ষিত হয়।

পবিত্র কুরআনেও (সুরা আহজাবে) বলা হয়েছে: যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিরক্ত করে বা কষ্ট দেয় আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তথা পরকালে তাদের ওপর অভিশাপ দেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন অপমানজনক বা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। (৩৩:৫৭)

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি:

কেবল কোনো বেদাআতির পক্ষেই ইয়াজিদকে ভালবাসা ও তাকে সম্মানিত করা সম্ভব। ইয়াজিদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য এমনই যে তার ভক্তরাও ঈমানহীন হতে বাধ্য।

দ্বিতীয় ওমর নামে খ্যাত উমাইয়া শাসক

তার সামনে একদিন এক ব্যক্তি ইয়াজিদকে আমিরুল মুমিনিন (মুমিনদের নেতা) বলে উল্লেখ করায় ওমর ওই লোকটির ওপর চাবুকের বিশটি আঘাত হানার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ( ইমাম হাজার আসকালানির তাহজিব আত্বতাহজিব, খণ্ড-৬, পৃ-৩১৩)

 



back 1 2