ইমাম হাসান (আ.) ও মুয়াবিয়ার সন্ধি-চুক্তি

সংকলক : আলহাজ্ব ডক্টর মোঃ সামিউল হক


ইমাম হাসান (আ.) ও মুয়াবিয়ার সন্ধি-চুক্তি

সংকলক : আলহাজ্ব ডক্টর মোঃ সামিউল হক

ভূমিকা

১৩৯৩ বছর আগে ৪১ হিজরির এই দিনে (২৬ শে রবিউল আউয়াল) বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)র প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) উমাইয়া বিদ্রোহী মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের সঙ্গে সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষর করে শর্ত-সাপেক্ষে ততকালীন মুসলিম রাষ্ট্রের খেলাফত (বা রাজনৈতিক শাসন) সাময়িকভাবে ত্যাগ করেন।

পিতা আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)র শাহাদতের পর ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। পিতার অসমাপ্ত কাজ তথা মুয়াবিয়ার বিদ্রোহ দমনের জন্য তিনিও জিহাদ করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং তিনি মুয়াবিয়ার কাছে লেখা এক চিঠিতে লিখেছিলেন যে, মুসলমানরা তাঁর পিতার পর তাঁকে খেলাফতের জন্য বেছে নিয়েছে, আর তাই জনগণের মত মুয়াবিয়াও যেন তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। মুয়াবিয়া যদি এখনও ভুল করেন (অর্থাত বিদ্রোহ অব্যাহত রাখেন) তাহলে তিনি মুসলমানদেরকে নিয়ে তাকে শাস্তি দেবেন বলেও সতর্ক করে দিয়েছিলেন ওই চিঠিতে। তিনি তাকে এও লিখেছিলেন যে, “আল্লাহকে ভয় কর, জুলুম ও মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ কর। অনুগত ও শান্তিকামী হও। আর এমন লোকদের সঙ্গে কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ করো না যারা তোমার চেয়ে এ কাজে বেশি যোগ্য।

ইমাম হাসান ও ইসলামকে রাজতন্ত্র প্রচলনের হাত থেকে রক্ষার চেষ্ঠা

 বিদ্রোহী মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে উতসাহিত করার জন্য হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) খেলাফতের দায়িত্ব নেয়ার পর পরই যোদ্ধাদের বেতন শতকরা ১০০ ভাগ বৃদ্ধি করেছিলেন। তাই এ ধারণা ঠিক নয় যে ইমাম হাসান (আ.) সাহসী ও জিহাদপন্থী ছিলেন না।  মিথ্যা প্রচারে অভ্যস্ত উমাইয়ারাই ইমামকে ভীরু ও বিলাসী হিসেবে ইতিহাসে তুলে ধরতে চেয়েছে।

সন্ধির কারণ

 দুঃখজনকভাবে হযরত ইমাম হাসান (আ.) তার সমর্থকদের মধ্যে জিহাদের কোনো আগ্রহই দেখতে পাননি। বরং তাঁর প্রধান সেনা কর্মকর্তারাই মুয়াবিয়ার গুপ্তচরদের লোভনীয় প্রস্তাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এমনকি তাদের কেউ কেউ ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র করে ইমাম হাসান (আ.)-কে মুয়াবিয়ার হাতে তুলেও দিতে চেয়েছিল।

এ ছাড়াও হাসান (আ.) জানতেন যে মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এই সুযোগে বাইজান্টাইন সম্রাট চতুর্থ কনস্টানটিন মুসলমানদের প্রথম কিবলা অধ্যুষিত বায়তুল মোকাদ্দাস শহরটি দখলের পদক্ষেপ নেবে। তাই ইমাম শান্তি ও কূটনৈতিক পন্থার মাধ্যমে প্রিয় নানার ধর্মের বার্তা তথা খাঁটি মুহাম্মদী ইসলামকে রক্ষার জন্য ও  ইসলামকে দূষণমুক্ত করার যে কাজ পিতা হযরত আলী (আ.) শুরু করেছিলেন সেই মিশনকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে মুয়াবিয়ার সঙ্গে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত সমর্থকদের নিস্ক্রিয়তা ও আদর্শিক বিচ্যুতির কারণেই ইমাম হাসান (আ.)-কে যুদ্ধ-বিরতির পথ বেছে নিতে হয়েছিল।

ইমাম (আ.) এও জানতেন যে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা বা শাসন-ক্ষমতা হাতে না পেলেও  মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত  ইমামই থেকে যাবেন। তাই মুয়াবিয়ার স্বরূপ বা আসল চেহারা জনগণের কাছে তুলে ধরার জন্য তাকে কিছু (নোংরা কাজের সুযোগ) অবকাশ দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে এ সন্ধির ফলে মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল।

অবশ্য ইমাম হাসান (আ.)  ছোট ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)র মতই জালেম শাসকের বিরুদ্ধে জিহাদের পথই ধরতেন যদি তিনি দেখতেন যে, অল্প কিছু সংখ্যক হলেও তাঁর কিছু একনিষ্ঠ ও নিবেদিত-প্রাণ সমর্থক রয়েছেন যারা ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে ও শহীদ হতে প্রস্তুত। ইতিহাসে দেখা যায় শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন (বা কিছু কম/বেশি) শাহাদত-পাগল ও আহলে-বাইত প্রেমিক মুসলমান ইমাম হুসাইন (আ.)র সঙ্গে স্বেচ্ছায় থেকে গেছেন এবং মহাবীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছেন। ইমাম হুসাইন (আ.) কুফার প্রায় সব মানুষের সমর্থন পেয়েছিলেন প্রথম দিকে। তারা পরবর্তীতে এই ইমামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। অন্যদিকে ইমাম হাসান (আ.)র সঙ্গীরা প্রথম দিকেই তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং এমনকি গোপনে শত্রু  শিবিরে যোগ দেয়। তাই ইমাম হাসান (আ.) নিবেদিত-প্রাণ সমর্থকের সংখ্যা ছিল ইমাম হুসাইন (আ.) নিবেদিত-প্রাণ সঙ্গীদের সংখ্যার চেয়েও অনেক কম বা হাতে গোনা যে কয়জন সঙ্গী ছিল তাদের ওপর ভরসা করতে পারেননি বড় ভাই ইমাম হাসান (আ.)। কারণ, আদর্শিক দৃঢ়তা তাদের মধ্যে ছিল না।

মুয়াবিয়ার বংশ-গোত্র ও ইমাম হাসানের বংশগোত্রের বিরোধিতা

উল্লেখ্য, মুয়াবিয়ার বাবা আবু সুফিয়ান  ছিল ইসলামের ও বিশ্বনবী (সা.)র কঠোরতম শত্রু । মক্কা বিজয়ের পর (অষ্টম হিজরিতে) অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুয়াবিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু বিশ্বনবী (সা.)র পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর সঙ্গে তার শত্রুতা অব্যাহত থাকে। হযরত আলী (আ.)র বিরুদ্ধে এক মিথ্যা অজুহাতে সে সিরিয়া থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সিফফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এই বিদ্রোহের কারণে। এই যুদ্ধে মুয়াবিয়ার পক্ষে ৪৫ হাজার নিহত এবং হযরত আলী (আ.)র পক্ষে শহীদ হন পঁচিশ হাজার মুজাহিদ।

হযরত আলী (আ.)র বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু করার পেছনে মুয়াবিয়ার অজুহাত ছিল তৃতীয় খলিফার হত্যাকাণ্ডের বিচার। এটা যে নিছক অজুহাতই ছিল তার প্রমাণ হল হযরত আলী (আ.)র শাহাদতের পর মুসলিম বিশ্বের সব অঞ্চল ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ত করা সত্ত্বেও  মুয়াবিয়া আর কখনও তৃতীয় খলিফার হত্যাকারীদের বিচারের কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি। দ্বিতীয় খলিফার শাসনামল থেকেই সিরিয়ায় প্রায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রধানের মত চালচলনে অভ্যস্ত মুয়াবিয়া জানত যে হযরত আলী (আ.)র মত কঠোর ন্যায়বিচারক শাসক তাকে কখনও ছোট বা বড় কোন পদ দেবেন না। তাই আলী (আ.) খলিফা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মত মুয়াবিয়াকেও পদচ্যুত করলে ইসলামের ইতিহাসে রাজতন্ত্র প্রবর্তনকারী মুয়াবিয়া সিরিয়ায় বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে।



1 2 next