মানবতার ধর্ম ইসলাম ১-৪



মানবতার ধর্ম ইসলাম

প্রথম পর্ব

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ এবং সামগ্রিক জীবন বিধান হিসেবে ইতোমধ্যেই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে জ্ঞানী গুণী বিশেষজ্ঞগণ মহান এই ধর্ম নিয়ে পড়ালেখা করতে গিয়ে এই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ও স্বরূপের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পান। যার ফলে শত্রুদের তাবৎ ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিকাশ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। আসলে ইসলামের নীতিমালা এবং শিক্ষাগুলো জুলুম অত্যাচার নিপীড়নের বিরোধী হবার কারণে বিশ্বের বলদর্পী শক্তিগুলোর স্বার্থের পথে তা মারাত্মক অন্তরায়। যার ফলে আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ এবং তার বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার জন্যে তাদের সর্বপ্রকার সামর্থ ও শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। আমরা তাই এই আসরে ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ ও বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

সূচনালগ্ন থেকেই ইসলাম শত্রুতার মুখে পড়েছিল। আজও সেই শত্রুতা অব্যাহত আছে। তবে বর্তমানে পশ্চিমা বলদর্পী শক্তিগুলো ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতার নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। তারা এখন বিশ্বব্যাপী ইসলামভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা ইসলামকে যুদ্ধ ও সহিংসতার ধর্ম এবং মানবাধিকার উপেক্ষাকারী বলে প্রচার করার চেষ্টা করছে। এসব করে তারা বিশ্ববাসীকে ইসলাম বিমুখ করে রাখতে চায়। তবে নামসর্বস্ব কিছু মুসলমানের কাজকর্ম পশ্চিমাদের ঐসব প্রচারণার অনুকূলে গেছে। যেমন- আল কায়েদা ও তালেবান। এই গোষ্ঠিগুলো সহিংসতাকামী,নির্দয় এবং সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত থেকেও নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দেয়। এদিকে গণমাধ্যমগুলো তাদের ভয়াবহ কর্মকাণ্ডগুলোকে ফলাও করে প্রচার করছে,যেসব দেখলে যে কোনো মানুষই মুসলমানদের ব্যাপারে ঘৃণ্য ও অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করবে। পশ্চিমাদের ব্যাপক অপপ্রচারণার ফলে যে-কোনো সাধারণ মানুষ বা অসচেতন মানুষ ঐসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ভুল করে ইসলাম এবং মুসলমানদের কার্যক্রম বলে ভাবতে পারে।

তবে সুখকর ব্যাপারটি হলো, বিশ্বের প্রকৃত মুসলমানদের বিশাল অংশটি মুসলিম নামধারী ঐসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠির কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং ঐসব গোষ্ঠিকে বিচ্যুত বলে মত দিয়েছেন। পশ্চিমারা যেহেতু ইসলামের শক্তিশালী ও উন্নত সংস্কৃতিকে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করতে সক্ষম নয় সেহেতু তারা ইসলামের অগ্রগতিতে শঙ্কিত হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারণার আশ্রয় নিয়েছে। বিশেষ করে যারা ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী তাদেরকে ফিরিয়ে রাখার স্বার্থে ইসলামকে সন্ত্রাসী বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। সেজন্যে এখন সবার মনেই একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-ইসলাম কি আসলেই সন্ত্রাসী বা সহিংসতার ধর্ম? ধারাবাহিক এই আসরে আমরা এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করবো। সেইসাথে প্রেম ভালোবাসা স্নেহ ও কল্যাণ আর মানবতার মুক্তির ধর্ম ইসলামের বিশেষ কিছু দিক ও তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো

পবিত্র কোরআন নিয়ে সামান্য পড়ালেখা করলেই অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যাবে যা থেকে বোঝা যাবে ইসলাম একটি দয়া, অনুগ্রহ ও কল্যাণের ধর্ম।আল্লাহর অনুগ্রহের কথা, করুণার কথা দয়ার কথায় কোরআন পরিপূর্ণ। কোরআনের প্রতিটি সূরা শুরু করতে হয় এমনকি মুসলমানদের প্রতিটি কাজ শুরু করতে হয় বিসমিল্লাহ বলে। এর অর্থই হলো সেই আল্লাহর নামে শুরু করছি যিনি পরম করুণাময় এবং দয়াবান। কোরানের ১১৪ টি সূরার মধ্যে ১১৩ সূরা এই বিসমিল্লা বলে শুরু হয়েছে। কোরআনের অসংখ্য আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অসম্ভব দয়ালু, তিনি ক্ষমাকারী এবং মেহেরবান ইত্যাদি। তো যেই ধর্মের মূল গ্রন্থটির সূচনা হয়েছে আল্লাহর দয়া আর রহমতের ঘোষণা দিয়ে সেই ধর্ম কি সহিংস হতে পারে?

কোরআনের আয়াতগুলোর প্রতি মনোযোগী হলে দেখা যাবে আল্লাহর অনুগ্রহ, করুণা এবং দয়ার্দ্রতার বিষয়টি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। সেখানে লক্ষ্য করা যাবে আল্লাহর এই দয়ার ব্যাপারটি কেবল যে ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের জন্যে তা নয়, বরং সমগ্র মানব জাতির জন্যেই প্রযোজ্য। এ কারণে ইসলাম ধর্মও কেবল মুসলমানদেরই নয় বরং সমগ্র মানব জাতির ধর্ম।সূরায়ে জাসিয়ার চৌদ্দ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ "হে নবী! আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে,যারা কিয়ামত বা পুনরুত্থান দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে না, যাতে তিনি কোন সম্প্রদায়কে তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল দেন ।" আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই আয়াতে মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন তারা যেন অমুসলমানদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল হয় এবং তাদের মন্দ দিকগুলোকে না দেখার ভান করে বা উপেক্ষা করে যায়। তো এরকম একটি ধর্মকে কী করে সহিংস বলা যায়!

আসলে আল্লাহর রহমত বা দয়ার ভাণ্ডার অফুরন্ত,অসীম। কিন্তু কিছু কিছু লোক বিচ্যুতির পথে পা বাড়িয়ে নিজেদের মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে ফেলে আল্লাহর রহমতের ব্যাপার হতাশ কিংবা বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। তাদেরকে সঠিক পথ দেখানোর জন্যেই আল্লাহ নবী রাসূলদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এরকমই একজন নবী হলেন ইব্রাহিম (আ)। তিনি লুতের কওমকে আসন্ন বিপদ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে ব্যাপক চেষ্টা চালান। আল্লাহর কাছে তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সাধারণত নবীরা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানব জাতিকে সুসংবাদ এবং সতর্কতা প্রদানকারী হিসেবেই আবির্ভূত হন। ঐ সতর্কতাও আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহ, যাতে তারা বিচ্যুতি থেকে সঠিক পথে ফিরে আসেন এবং সৌভাগ্যের প্রশস্ত পথে অগ্রসর হয়। এই সতর্কতাও অনুগ্রহ। সেজন্যেই রাসূলের পরিচয় সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছেঃ আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।' সেজন্যেই আমরা লক্ষ্য করবো মূর্তিপূজকরা পর্যন্ত যখন নবীজীকে বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করতো তখনো তিনি ধৈর্যের সাথে বরণ করতেন কখনোই তাদেরকে পাল্টা গালি দেন নি, তাদেরকে অভিশাপ দেন নিকোরআনে তাই বলা হয়েছে নিশ্চয়ই আপনি সবোর্ত্তম চরিত্রের অধিকারী।'

সূরা আল-ইমরানের একশ' উনষাট নম্বর আয়াতে রাসূলের এই কোমল ও সহৃদয় হবার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছেঃ আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো।' এটা ছিল সত্যিকারের এক অলৌকিক ব্যাপার। কেননা নবীজীর আবির্ভাবের আগে আরবের লোকেরা যেখানে খুনখারাবি ছাড়া কিছুই বুঝতো না, সেখানে নবীজীর আগমনের পর তাঁর এই ধৈর্যশীলতা ও কোমল হৃদয়ের আকর্ষণে মানুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়, ঝুকেঁ পড়ে। এ জন্যে অতি দ্রুত তিনি একটি শক্তিশালী উম্মাত গঠন করতে সক্ষম হন। অসম্ভব ভালোবাসা আর পারস্পরিক আন্তরিকতাপূর্ণ এই উম্মাত গঠনের পেছনে সহিংসতা কিংবা শক্তির বিন্দুমাত্র প্রয়োগ ছিল না। সেই ভালোবাসা আর আন্তরিক একতাপূর্ণ ধর্ম ইসলামকে কি সহিংসতার ধর্ম বলা যায়?

দ্বিতীয় পর্ব



1 2 next