সূরা রা’দ

তাফসীর বিষয়ক রেডিও তেহরানের ধারাবাহিক আলোচনা


এই আয়াতে বিশ্বাসী মোমিন এবং অবিশ্বাসী কাফেরদের শেষ পরিণতি সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে বলা হয়েছে , যারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করেছে তাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরষ্কার , আর যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে চলেছে তারা এত ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হবে যে , সে সময় তারা যদি পৃথিবীর সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশী সম্পদের মালিক হয় , ঐ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য তারা সবই বিলিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবে কিন্তু সে দিন তাদের কোন কথা, কোন আর্জিই গ্রহন করা হবে না তাদের ধন সম্পদ, কোন কিছুই সেদিন তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না
আয়াতের শেষ ভাগে বলা হয়েছে , সে দিন অবিশ্বাসী কাফেরদের কাছ থেকে কঠোর হিসাব নেয়া হবে
হাদীস শরীফে বলা হয়েছে ; যারা ইহজগতে মানুষের সাথে কঠোর আচরণ করবে কেয়ামতের দিন তাদের সাথে কঠোর আচরণ করা হবে , আর যারা দুনিয়ায় মানুষের ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর সৃষ্টিতে দেখবে এবং নম্র আচরণ করবে কেয়ামতের দিন তাদের সাথে অনুরূপ আচরণই করা হবে

যারা বুদ্ধিমান তারা এই নশ্বর জীবণের জন্য সঠিক পথটাই বেছে নেয়, যে পথে রয়েছে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ আর যারা এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে চায় না , যাদের চিন্তা-চেতনা নশ্বর জগতকে নিয়েই আবর্তিত হয় তাদেরকে নেহায়েত অপরিনামদর্শী ও নির্বোধ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না
এবার ১৯ নং আয়াতে দেখা যাক কি বলা হয়েছে, " আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তাকে যে ব্যক্তি সত্য বলে বিশ্বাস করে ,তার সাথে জ্ঞানান্ধ ব্যক্তির কি তুলনা চলে ? বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই শুধু উপদেশ গ্রহন করে
"

বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা দিয়ে এই আয়াতে বলা হয়েছে , সত্য দ্বীন বা জীবন বিধানকে যারা মনে প্রাণে গ্রহন করতে সক্ষম হয়েছে তারাই প্রকৃত জ্ঞানি ও বুদ্ধিমান বুদ্ধিমান বলেই তারা বাস্তব সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছে কিন্তু যারা সত্য দ্বীনকে গ্রহন না করে তা প্রত্যাখ্যান করে তাদের চোখ থাকলেও তারা আসলে অন্ধের মত তাদের বিবেক বুদ্ধি কুসংস্কার, গোয়ার্তুমী এবং অজ্ঞতার আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে কোরআনের ভাষায় এরা হচ্ছে উলুল আলবাব পবিত্র কোরআনে ১৬ বার নাম উচ্চারিত হয়েছে অনেক অন্ধও জ্ঞান ও হৃদয়ের আলোতে সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে, কিন্তু অনেক চক্ষুষ্মান ব্যক্তির হৃদয় অজ্ঞতার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যাওয়ার কারণে সত্য উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়ে পড়ে#

( ২০-২২ আয়াত )

পাঠক ! আজকের আসরে যথারীতি সূরা রা'দের ২০ থেকে ২২ আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। প্রথমেই ২০ ও ২১ নং আয়াতের অর্থ জানা যাক।

" (বুদ্ধিমান তারাই ) যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার রক্ষা করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না, এবং আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুন্ন রাখে, তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে "

এর আগের আয়াতে বিশ্বাসী মোমেন এবং অবিশ্বাসী কাফেরকে চক্ষুষ্মান ও অন্ধের সাথে তুলনা করা হয়েছে , এবং মোমেন বিশ্বাসীকে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী বলা হয়েছে এই আয়াতেও মোমেন বিশ্বাসীদেরকে জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে, বুদ্ধিমানদের বড় একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা কখনো ঐশি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না সৃষ্টিকর্তার সাথে প্রত্যেক মানুষ এক ঐশি প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোনটা তত্বগত যেমন, সত্যের অনুসরণ ও ন্যায়কামিতা, কোনটা বুদ্ধিবৃত্তিক যেমন পরকালে বিশ্বাস আবার কোন কোন প্রতিশ্রুতি হচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসনগত যেমন, বৈধ-অবৈধ বা হালাল-হারাম মেনে চলা ইত্যাদী ফলে যারা বুদ্ধিমান এবং জ্ঞান নির্ভর তারা নির্দ্বিধায় সত্যকে গ্রহণ করে এবং তাদের অঙ্গীকার রক্ষার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে
তবে খোদার সাথে বান্দার গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গীকার হচ্ছে ,মানুষ অত্যাচারী ও অসৎ শাসক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হবে এবং সৎ ও ধর্মপরায়ণ শাসক গোষ্ঠিকে সর্বতঃভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করবে।
আল্লাহতা'লা সূরা বাকারায় এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আমার প্রতিশ্রুতি সীমালংঘনকারীদের জন্য প্রযোজ্য নয়
ইমানদারদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার ব্যাপারে অত্যন্ত যত্মবান কারণ আল্লাহ তা'লা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার ব্যাপারে জোর নির্দেশ দিয়েছেন ইসলাম ধর্মে ধর্মীয় বন্ধনের গুরুত্বও অপরিসিম পবিত্র কোরআনে একে ইমানদার ভাই বা দ্বীনি ভাই হিসেবে উল্লেখ করেছে এই গুরুত্বের কারণেই ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) তাঁর অন্তিম মুহূর্তে সকল আত্মীয় স্বজনের জন্য উপহার পাঠিয়েছিলেন আত্মীয়-স্বজনদের যারা ইমামের সাথে বৈরী আচরন করতো ইমাম তাদের জন্যও উপহার পাঠান
আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয় এবং কৃত কর্মের জন্য যে হিসাব দিতে হবে সেজন্য মোমেন মুসলমানের মনে সব সময় ভয় কাজ করে
ইমানদারদের এটা বড় একটি বৈশিষ্ট্য।

সেলায়ে রাহম বা আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা, একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া, বিপদের সময় অন্যের জন্য সাহয্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে ইসলাম যে শুধু অনুপ্রাণিত করেছে তাই নয়, ইসলাম এ ব্যাপারে জোরালো নির্দেশ দিয়েছে কাজেই প্রকৃত মুসলমান হওয়ার জন্য এ বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

এবার ২২নং আয়াতের দিকে নজর দিচ্ছি। দেখা যাক এই আয়াতে কি বলা হয়েছে-
"যারা তাদের প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে, যথাযথভাবে নামাজ পড়ে, আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দকে দূর করে, তাদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম। "

মোমেনদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা প্রতিকূল পরিবেশে ধৈর্য্য ধারণ করতে পারে এবং অবিচলভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকে আল্লাহ ধৈর্য্য ধারণকারীকে পছন্দ করেন তবে ঐশি সাহায্য লাভের জন্য ধৈর্য্যের পাশাপাশি এবাদত বন্দেগী বিশেষ করে নামাজ পড়াটা জরুরী আল্লাহ তা'লা পবিত্র কোরআনেও বলেছেন, তোমরা নামাজ ও ধৈর্য্যের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর
সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের খোঁজ খবর নেয়া মুমিনদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য
যারা প্রকৃত মুমিন তারা সমাজের দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করেন তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তা করেন, কাজেই তারা প্রকাশ্যে যেমন গরীবের পাশে দাঁড়ান তেমনি গোপনেও মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন
এই আয়াত থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, মানুষের সেবা করা ছাড়া আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করা যায় না
সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি সচ্ছলদের দায়িত্ব রয়েছে সে দিকে প্রতিটি মুসলমানের সচেতন থাকতে হবে #



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 next