সূরা রা’দ

তাফসীর বিষয়ক রেডিও তেহরানের ধারাবাহিক আলোচনা


নবী করিম (দঃ) এর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করার বর্ণনা দেয়ার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে, কাফের অবিশ্বাসীরা যেন এটা মনে না করে যে, তারা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে সক্ষম হয়েছে, কাজেই নিজেদের ইচ্ছা মত চলতে পারবে তাদের মনে রাখা উচিত, মহান আল্লাহ তাদের হঠকারীতার জন্য পার্থিব জগতে যেমন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন তেমনি পরকালেও তাদেরকে কঠিন পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে
কাফের অবিশ্বাসীদেরকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়
একদল আছে, যাদের সামনে যুক্তি বা নিদর্শন উপস্থাপিত হলে সত্যকে গ্রহণ করার মত মানসিকতা তাদের রয়েছে আরেকটি দল আছে যারা এতটাই গোঁড়া যে মৃত ব্যক্তিও যদি তাদের সাথে কথা বলে তাহলেও তারা সত্যকে মেনে নিবে না এই আয়াত এই শ্রেণীর ঔদ্ধত কাফেরদের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে

আল্লহ তায়ালা মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন ফলে মানুষ সত্যকে গ্রহন করতে পারে আবার তা প্রত্যাখ্যানও করতে পারে কাজেই ঈমানদারদের এটা প্রত্যাশা করা উচিত নয় যে দুনিয়ার সব মানুষই সত্যকে গ্রহন করে ভালো মানুষ হয়ে যাবে
আল্লাহর চান মানুষ স্বাধীনভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার মাধ্যমে সত্যকে গ্রহন করুক
তা না হলে তিনি পারতেন সকলকে ঈমানদার বানিয়ে ফেলতে

( ৩২-৩৫ আয়াত )

পাঠক! আজ আমরা সূরা রা'দের ৩২ থেকে ৩৫ নম্বর আয়াতের অনূবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবো। প্রথমেই ৩২ নম্বর আয়াতের অর্থ জানা যাক। এতে বলা হয়েছে, হে মুহাম্মদ! আপনার পূর্বে বহু রাসূলকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়েছে। অতঃপর আমি অবিশ্বাসী কাফেরদেরকে কিছু অবকাশ দিয়েছি। তারপর তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি। অতএব ভেবে দেখুন, আমার শাস্তি কেমন ছিলো।

এর আগের কয়েকটি আয়াতে কাফেরদের একগুয়েমী ও হঠকারিতা কথাবার্তা ও সত্যকে গ্রহণ না করার জন্য নানা বাহানার কিছু বর্ণনা দেয়া হয়েছে ; যা আমরা গত আসরে আলোচনা করেছি। এই আয়াতেও একই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নবী করিম (সাঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, আপনি এটা মনে করবেন না যে, কাফেররা কেবল আপনাকে নিয়েই ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে বরং এর আগে বহু নবী রাসূল এ ধরনের ঠাট্টা-বিদ্রুপের শিকার হয়েছেন। তাদেরকে আমি তৎক্ষণাৎ পাকড়াও না করে কিছুটা সময় দিয়েছি যাতে তারা সত্য পথে ফিরে আসার সুযোগ পায়। কিন্তু যখন তারা সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগায়নি তখন আমি তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করলাম।
পাপ বা অন্যায় করার পরও দেখা যায় অনেকেরই কিছুই হয় না কিংবা তাদের ওপর ঐশি শাস্তি আসতে দেখা যায় না। এর কারণ হলো মহান আল্লাহ অনেক সময় বান্দাকে অনুশোচনার জন্য সময় দেন। কিন্তু যখন সময় পেয়েও মানুষ নিজের পাপ বা অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত হয় না বা তওবা করে না, তখনই তার ওপর নেমে আসে নানা বিপদাপদ। এ জন্য পাপাচারি মানুষকে জীবনের কোন এক সময় তার পাপের শাস্তি ভোগ করতে হয়।
এবারে সূরা রা'দের ৩৩ ও ৩৪ নম্বর আয়াতের অর্থ জানা যাক। এ আয়াত দুটোতে বলা হয়েছে. "যিনি প্রত্যেক মানুষ ও তার কর্মের প্রতি লক্ষ্য রাখেন তিনি কি তাদের সমান যাদেরকে তারা অংশী করে ? অথচ তারা আল্লাহর বহু অংশী করেছে। বলুন, আল্লাহর অংশীদের পরিচয় দাও। অথবা তোমরা আল্লাহকে এমনকিছুর সংবাদ দাও যা তিনি জানতেন না। তা না হলে অসার কথা বলছো। না, যারা কাফের তাদের ছলনা তাদের নিকট শোভন প্রতীয়মান হয় এবং তার সৎ পথ থেকে নিবৃত হয়। আর আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার জন্য কোন পথপ্রদর্শক নেই। তাদের জন্য পার্থিব জীবনে রয়েছে শাস্তি এবং পরকালের শাস্তি তো আরও কঠোর এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে তাদেরকে রক্ষা করার কেউ নেই।"

যারা মুশরিক অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে প্রতীমা বা দেব-দেবীর কাছে সাহায্য কামনা করে, নিজেদের হাতে বানানো মূর্তির আরাধনা করে, তাদেরকে উদ্দেশ্য করে এই আয়াতে বলা হয়েছে, বিশ্বজগতের সকল কিছু যে আল্লাহর নিয়ন্ত্রাধীন, তাঁকে বাদ দিয়ে পাথর বা মাটির তৈরি মূর্তি বা প্রতীমার ধর্ণা দেয়ার কি কোন প্রয়োজন আছে ? এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বর্ণনা দেয়ার পর বলা হয়েছে, এ ধরনের মানুষের জন্য বাতেল বা অসত্য অত্যন্ত শোভন বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে মিথ্যার পেছনে ছুটে চলে। আসলে যারা পাপের কারণে ঐশী নির্দেশনা লাভের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে, তাদেরকে সুপথে আনার সাধ্য কারো নেই।
পবিত্র কোরআনে এভাবে মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে সক্রিয় করার জন্য অনেক কিছু প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে মানুষ তার জ্ঞান-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা তা নির্ণয় করতে পারে।
এবার দেখা যাক ২৫ নম্বর আয়াতে কি বলা হয়েছে-"ধর্মপ্রাণ , পরহেজগারদের জন্যে প্রতিশ্রুত জান্নাত এমন বাগানসদৃশ যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তার ফলগুলো এবং ছায়া চিরস্থায়ী। এটা তাদের প্রতিদান যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে এবং অবিশ্বাসী কাফেরদের প্রতিফল হচ্ছে নরক বা অগ্নি।"
এই আয়াতে পরকালে মুমিন কিংবা মুসলমানদের অস্থার বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে, খোদাভীরু মুত্তাকীদেরকে যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে জান্নাত বা বেহেশত। যাতে রয়েছে রকমারী ফলমূল এবং আহার্য দ্রব্য। তা যেন সবুজঘেরা গাছপালায় পরিবেষ্টিত অপূর্ব সুন্দর এক বাগান বিশেষ। তবে তা এ জগতের বাগানের সাথে যেমন তুলনার যোগ্য নয়, তেমনি কল্পনারও অতীত। এ জন্য পবিত্র কোরআনে ‘মেস্‌ল' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে অর্থাৎ যদি কেউ কল্পনা করতে চায় তাহলে সে সবুজ গাছপালায় আচ্ছ্বাদিত ছায়ায় ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যমন্ডিত মনোরম কোন বাগানের কথা ভাবতে পারে। এখানে লক্ষণীয় একটি বিষয় হচ্ছে, এই আয়াতে মুশরিকদের বিপরীতে মুত্তাকী বা খোদাভীরু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে মুমীন শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। এ থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি যে, ঈমানের সাথে তাকওয়া বা খোদাভীতিটাও অপরিহার্য। তাকওয়া ছাড়া ঈমান মূল্যহীন। শুধু মুখে ঈমান আনলে বা মুসলমান হবার দাবি করলেই হবে না, ঈমানের সাথে সাথে পাপ ও সকল মন্দ কাজ পরিহার করতে হবে। #

( ৩৬-৩৮আয়াত )

আজকের আসরে যথারীতি সূরা রা'দের ৩৬ থেকে ৩৮ আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে প্রথমে দেখা যাক ৩৬ নং আয়াতে কি বলা হয়েছে- "যাদেরকে আমি গ্রন্থ দিয়েছি তারা আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার জন্য আনন্দিত হয় কিন্তু কোন কোন দল এর কিছু অংশ অস্বীকার করে বলুন! আমি তো আল্লাহর উপাসনা করতে এবং তাঁর কোন অংশী না করতে আদিষ্ট হয়েছি আমি তাঁরই প্রতি (সকলকে) আহ্বান করি এবং তাঁরই নিকট আমার প্রত্যাবর্তন"

এই আয়াতে নবী করিম (সাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে, আপনি এটা আশা করবেন না যে, সব মানুষই আপনার কথা মেনে নিবে এবং ঐশী ফরমানের অনুগত হয়ে যাবে কিছু লোক সত্যকে গ্রহণ করবে আবার অনেকেই সত্যকে প্রত্যাখ্যান করবে এজন্য হতাশ হওয়ার কিছু নেই যদি এমন হয় যে একটি মানুষও আপনার কথা গ্রহণ করছে না, তারপরও হতাশা যেন আপনাকে গ্রাস না করে, আপনি আপনার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করুন এবং স্বগৌরবে ঘোষণা করুন-আমি একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করি এবং আমি তাঁরই বান্দা আমি মানব জাতিকে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, এর পেছনে আমার ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ নেই
রাসুলে খোদা (সাঃ)এর এই দ্ব্যর্থহীন আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই একত্ববাদীদের অর্থাৎ পুরানো ঐশী ধর্মগ্রন্থগুলোর অনুসারীদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে নেয় , আবার তাদের মধ্যে অনেকেই নবী করিম (সাঃ) এর বাণী উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় ফলে সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থের উপর বিশ্বাস স্থাপনের সৌভাগ্য থেকে তারা বঞ্চিত হয়

এই আয়াতে লক্ষ্যনীয় একটি বিষয় হচ্ছে, দ্বীনের প্রতিটি বিধানের উপর ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করা অপরিহার্য এর কিছু অংশ গ্রহণ না করার অর্থ পুরাপুরি ইসলামকে অমান্য করা
এবার ৩৭ নং আয়াতের দিকে নজর দেয়া যাক
এই আয়াতে বলা হয়েছে- "এমনিভাবে আমি এ কুরআনকে আরবী ভাষায় নির্দেশরূপে অবতরণ করেছি জ্ঞান প্রাপ্তির পর আপনি যদি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেন তাহলে আল্লাহর বিরুদ্ধে আপনার কোন অভিভাবক ও রক্ষক থাকবে না"



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 next