সূরা রা’দ

তাফসীর বিষয়ক রেডিও তেহরানের ধারাবাহিক আলোচনা


এবার ২৮ নম্বর আয়াতের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি এ আয়াতে বলা হয়েছে, "যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয় ( এরা তারাই) জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই কেবল চিত্ত প্রশান্ত হয়"
আগের আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ তা'লা সত্যসন্ধানীদেরকেই সুপথে পরিচালিত করেন
এই আয়াতে বলা হচ্ছে, তারাই সৎপথ লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং দ্বিধাহীন চিত্তে আল্লাহর অস্তিত্বের উপর ঈমান এনে মানসিক তৃপ্তি বা প্রশান্তিতে উপনিত হয় কারণ মনে-প্রাণে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে চিত্তে স্বর্গীয় প্রশান্তির আবহ তৈরী হয় ফলে আস্থা ও শান্তিতে মন ভরে ওঠে এই মানসিক শান্তির সাথে যেমন অন্য কিছুর তুলনা চলে না তেমনি প্রকৃত ইমান ছাড়া অন্য কোন ভাবে তা অর্জন করাও সম্ভব হয় না
আল্লাহর স্মরণ বলতে বুঝায়, নামাজ বা এবাদত - বন্দেগী ছাড়াও সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা
বিশেষ করে আপদকালে কিংবা কোন ভুল করে ফেললে তার সাহায্য ও অনুকম্পা কামনা করা স্বাভাবিক জীবণে আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলে না যাওয়া ইত্যাদি তবে যে ব্যক্তির অন্তর ইমানের আলোতে দীপ্ত এবং স্বর্গীয় প্রশান্তিতে ভরপুর সে ব্যক্তির মনে সব সময় আল্লাহর ভয়ও বিদ্যমান থাকে কারণ ইমানের দীপ্তিতে সে আল্লাহর বিশালত্ব এবং শক্তিমত্তাকে অনুভব করতে পারে ফলে আল্লাহর শক্তিমত্তা এবং বিশালত্বের সামনে সব কিছুই তার কাছে তুচ্ছ মনে হয় এজন্য দেখা যায় ইমানদাররা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয় না অপর দিকে ইমান বা আল্লাহর উপর বিশ্বাস না থাকার করণে ধর্মহীন সমাজে বিষন্নতা ও অন্যান্য মানসিক রোগ বেশি দেখা যায়

( ২৯-৩১ আয়াত )

পাঠক! আজকের আসরে সূরা রা'দের ২৯ থেকে ৩১ আয়াতের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে চলুন দেখা যাক ২৯ নম্বর আয়াতে কি বলা হয়েছে '' যারা (আল্লাহর উপর ) বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য এবং শুভ পরিণাম

এর আগের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর স্মরণ ঈমানদার মুসলমানের মনকে প্রশান্ত করে, এর ফলে তাঁরা মানসিক সুখ ও প্রশান্তি অনুভব করেন এই আয়াতে বলা হচ্ছে , ঈমানদার ব্যক্তিরা সব সময় সৎকর্মশীল তারা প্রত্যেক কাজে এবং পদক্ষেপে আল্লাহর সম্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন ফলে তাঁরা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেন তাদের জীবণ ঐশী সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরে ওঠে তাদের জীবণের পরিণতিও হয় অত্যন্ত শুভ
একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, পবিত্র কোরআনে স্বাধারণত ইমানের পাশাপাশি সৎকর্মের বিষয়টিকে স্থান দেয়া হয়েছে
বিষয়টি এমন যে ঈমান এবং সৎকর্ম যেন অবিচ্ছেদ্য যারা ঈমানদার তাদের বৈশিষ্ট্য মুনাফিক এবং ফাসেকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন ফাসেকের মনে আল্লাহর বিশ্বাস থাকলেও সে অনেক ক্ষেত্রে পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে , কিন্তু মুনাফিক মন থেকে আল্লাহকে বিশ্বাস না করলেও জন সম্মুখে নিজেকে ঈমানদার বা মুসলমান হিসেবে প্রকাশ করে

ধন-সম্পদই পার্থিব সুখ-শান্তির একমাত্র উপাদান নয় যাদের মনে ইমানের আলো নেই তাদের পার্থিব জীবণও সুখের হয় না সুখময় জীবণের জন্য ঈমান অত্যন্ত জরুরী একজন ঈমানদার ইহকালেও যেমন সফল পরকালেও তেমনী সফল অপর দিকে যার মনে ঈমান বা আল্লাহর বিশ্বাস নেই তার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য খুবই ক্ষণস্থায়ী

এবার ৩০ নং আয়াতের দিকে যাচ্ছি। প্রথমেই এ আয়াতের অর্থ জানা যাক। এতে বলা হয়েছে, (হে নবী) এভাবেই আমি আপনাকে এমন এক জাতির নিকট রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছি যার পূর্বে বহু জতি গত হয়েছে (আপনাকে প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো) আমি আপনাকে যা প্রত্যাদেশ করেছি তা আপনি তাদের নিকট আবৃত্তি করবেন তথাপি তারা যদি করুনাময় (আল্লাহকে) অস্বীকার করে, বলুন, তিনিই আমার প্রতিপালক, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই তাঁরই উপর আমি নির্ভর করি এবং তাঁরই নিকট আমার প্রত্যাবর্তন
যুগে যুগে নবী-রাসুলদের আগমন, বহু জাতি গত হওয়া এবং সত্যকে গ্রহন করার ব্যপারে মক্কার কাফেরদের উদাসীনতার প্রতি ইঙ্গিত করে এই আয়াতে বলা হয়েছে , বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মাদ (দঃ) প্রথম নবী বা রাসুল নন যে তার নব্যুয়তের ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ থাকবে
প্রত্যেক জাতির জন্যই আল্লাহ পয়গম্বর প্রেরণ করেছেন , তারা প্রত্যেকেই প্রত্যাদেশ বাণী মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছেন তারা নিজ থেকে বা মনগড়া কোন কথা মানুষকে বলেন নি তারা সবাই একটি বাণীই প্রচার করেছেন, আর তা হলো আল্লাহ এক এবং তিনিই উপাসনার যোগ্য আল্লাহ ছাড়া আর কোন অবলম্বন নেই সকলকেই তার দিকে ফিরে যেতে হবে

এই আয়াতের দুটো লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে,

এক. সত্যকে গ্রহনের ক্ষেত্রে অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস তাদের ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে অধ্যয়ন সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে

দুই. অবিশ্বাসী শত্রুদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভর করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত
এবার আমরা ৩১ নং আয়াতের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি, দেখা যাক এই আয়াতে কি বলা হয়েছে

''যদি কোরআন দ্বারা পর্বতকে গতিশীল করা হত, অথবা পৃথিবীকে বিদীর্ণ করা হত, অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত (তবুও তারা বিশ্বাস স্থাপন করত না) তবে সমস্ত বিষয়ই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন ঈমানদাররা কি ওদের ঈমান না আনার ব্যাপারে নিশ্চিত হয় নি ? তারা কি জানে না যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয়ই সকলকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন ! যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের কর্মফলের জন্য তাদের বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে, অথবা বিপর্যয় তাদের ঘরের আশেপাশেই আপতিত হতেই থাকবে যে পর্যন্ত না আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সমাগত হয় নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 next