তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান

রেডিও তেহরান



কোরআনের আলো
(
৭০তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলো অনুষ্ঠান থেকে আপনাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। কোরআনের আলোর গত অনুষ্ঠানে আমরা দান করার ব্যাপারে মুমিনদের প্রতি উপদেশমূলক আয়াতের ব্যাখ্যা আলোচনা করেছিলাম। আজকের পর্বেও এ সম্পর্কিত পরবর্তী ব্যাখ্যা জানবেন। প্রথমে সুরা বাকারার ২৬৮ ও ২৬৯ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হ', দান খয়রাতের সময় শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং লোভ ও কৃপণতার মত বিভিন্ন জঘন্য কাজে উসাহ দেয়। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের তথা প্রাচুর্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আল্লাহ প্রশস্ত মহাজ্ঞানী। তিনি যাকে ইচ্ছা জ্ঞান বা প্রজ্ঞা দান করেন এবং যাকেই তিনি প্রজ্ঞা দেন, সে নিশ্চিতভাবে প্রচুর কল্যাণ লাভ করে। জ্ঞানীরা ছাড়া কেউই উপদেশ গ্রহণ করে না। শয়তান ও শয়তানের বৈশিষ্টের অধিকারী মানুষেরা বিভিন্ন উপায়ে দান-খয়রাত ও অন্যকে সাহায্য করা থেকে মানুষকে বিরত রাখে। শয়তান এ কূমন্ত্রনা দেয় যে, তোমার নিজেরই অর্থ সম্পদের দরকার হবে। আবার কখনো এ কূমন্ত্রনা দেয় যে, কেন তুমি কষ্ট করছ বা কেন তাকে সাহায্য করছ ? যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে সে দরিদ্র ও অভাবী হ'ত না। এই সব লোকেরা মানুষকে দান করতে বাধা দেয়, এবং মানুষকে সম্পদ জমা করতে বলে, একইসাথে তারা মানুষকে অভাব ও দারিদ্রের ভয় দেখায়। অথচ এ দুনিয়ায় আমাদের যতটুকু খোদার অনুগ্রহ দরকার, তার চেয়ে বেশী অনুগ্রহ দরকার হবে বিচার দিবসে। এছাড়াও যারা আল্লাহর রাস্তায় গরীবদের দান খয়রাত করে আল্লাহ তাদের ভবিষ্যত কল্যাণের নিশ্চয়তা দিয়েছেন অথা তারা দারিদ্রের মোকাবেলায় বীমার সুবিধে পাবে। দুঃখজনক ব্যাপার হ', অনেকেই এই কৌশলপূর্ণ দিকের প্রতি গুরুত্ব দেননা এবং শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়। তারা শুধু অর্থ সম্পদকেই কল্যাণ বলে মনে করে। অথচ প্রকৃত কল্যাণ হ', প্রজ্ঞা বা দূরদর্শীতার অধিকারী হওয়া এবং সঠিক পথ বাছাইয়ের ক্ষমতা লাভ করা। তাই প্রকৃত জ্ঞানীরা আল্লাহর ক্ষমার ওয়াদা সত্ত্বেও শয়তানের কূমন্ত্রনায় কান দেন না। এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হ',
প্রথমত : দারিদ্রের ভয়ে কৃপনতা করা উচিত নয়। কারণ, শয়তানই দারিদ্রের ভয় দেখায় যাতে আমরা দান না করি। তাই আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরনের মাধ্যমে দারিদ্রের ভয়ের মোকাবেলা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত : সুস্থ বিবেকের অধিকারী ব্যক্তি শয়তানে প্রলোভন ও কূমন্ত্রনায় কান না দিয়ে আল্লাহর ওয়াদায় বিশ্বাস করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সেই জ্ঞানী যে আল্লাহর অনুগত নিজের খেয়াল খুশী তথা প্রবৃত্তি, শয়তান ও খোদা বিরোধী লোকদের অনুসারী ব্যক্তি জ্ঞানী নয়। এবারে সুরা বাকারার ২৭ ও ২৭১ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হ', যা কিছু তোমরা দান কর বা মানত কর আল্লাহ তা জানেন। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই। তোমরা যদি তা প্রকাশ্যে দান কর, তবে ভাল। আর যদি তা গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্থকে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরো ভাল। এতে তোমাদের অনেক অকল্যাণ বা পাপ দূর হবে। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন। দান-খয়রাতের পথে একটি বড় বাধা ', অধিকাংশ দাতা এটা চান যে, দানের জন্য তার প্রশংসা করা হোক। তাই, এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তোমার ভালো কাজের দিকে কেউ লক্ষ্য না করুক কিংবা কেউ কৃতজ্ঞতা না জানাক, কিন্তু আমি আল্লাহ তো তোমার ভাল কাজের সাক্ষী রইলাম এবং আমার কাছে তোমার কাজ লিপিবদ্ধ বা রেকর্ড হয়ে রইল। তবে কি তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করছ না ? যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দান করে থাকো তবে কেন মানুষের কাছে প্রতিদানের আশা করছ ? তাই মানুষের জানা উচিত, আল্লাহ তাদের সব কাজই দেখছেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই 'ল সকাজের মূল লক্ষ্য। কোরআনের ভাষায় দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থদের প্রতি উদাসীনতা হ' জুলুম বা অন্যায় এবং জালেম লোকেরা বিচার দিবসে সব ধরনের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবে। আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ও দরিদ্রদের প্রতি উদাসীন জালেমদের জন্য বিচার দিবসে কোন সুপারিশের কোন ক্ষেত্রই তৈরি করেনি। দান করার ক্ষেত্রে জাকাতের মত ওয়াজেব বা অবশ্য পালনীয় দান প্রকাশ্যে করা ভাল, কিন্তু মুস্তাহাব বা ইচ্ছাধীন দান গোপনে করা ভাল। সম্ভবত: এর যুক্তি হ'ল ওয়াজেব বা অবশ্য পালনীয় কাজ করা সবারই দায়িত্ব এবং এতে সাধারণত: লোক দেখানোর প্রবণতা থাকেনা। এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো ',
প্রথমত : আল্লাহ আমাদের দানের খবর রাখেন। তাই সবচেয়ে ভালো সম্পদ থেকে আল্লাহর রাস্তায় দান করতে হবে এবং দানের উদ্দেশ্য হতে হবে সবচেয়ে মহ আর সবচেয়ে মহ উদ্দেশ্য হ'ল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
দ্বিতীয়ত : দান করতে হবে কখনো প্রকাশ্যে এবং কখনো গোপনে। প্রকাশ্য-দানে অন্যান্যরা দান করতে উসাহী হয়। আর গোপনে দানের মাধ্যমে অহংকার ও নিজেকে জাহির করা থেকে দূরে থাকা যায়।
তৃতীয়ত : দান-খয়রাত হ' গোনাহ মাফ বা ক্ষমা লাভের একটি মাধ্যম। তওবা ও ক্ষমা লাভের জন্য অনেক সময় দান খয়রাত করা উচিত যাতে আল্লাহ আমাদের গোনাহ বা পাপ ক্ষমা করে দেন। এবারে সুরা বাকারার ২৭২ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হ', হে নবী, মানুষের সুপথ পাওয়াটা আপনার দায়িত্ব নয়, আল্লাহ যাকে চান সে-ই সুপথ পায় এবং মানুষ তাদের সম্পদ থেকে যা দান করে, তা তাদের জন্যই দান করে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে দান করো না। তোমরা যদি তোমাদের বৈধ সম্পদ থেকে দান কর তার পুরস্কার তোমাদের ওপর জুলুম করা হবে না। বিভিন্ন তাফসীরের বর্ণনায় দেখা যায়, মুসলমানরা দরিদ্র মুশরিকদের দান করার ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। যখন তাঁরা রাসুল (সঃ) কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করল তখন এ আয়াত নাজেল হয়। এ আয়াতে বলা হয়েছে জোর করে ধর্ম চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। তাই প্রকৃত মুসলমানের সাহায্য পাবার জন্য মুসলমান হবার সার্টিফিকেট দেখাতে হয় না। আল্লাহ যেমন এ পৃথিবীতে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নির্বিশেষে সবাইকে জীবিকা ও অন্যান্য অনুগ্রহ দিয়ে থাকেন, তেমনি কোন প্রকৃত মুসলমান অভাবী ও দরিদ্রকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে ? কে মুসলমান ও কে অমুসলমান তা দেখেন না। কারণ, অন্যান্য মানুষ ও আল্লাহর সৃষ্টি বলে সাহায্য পাবার অধিকার রাখে। আর ইসলামের শত্রু নয় এমন দরিদ্র অমুসলিমদের সাহায্য করলেও বিচার দিবসে এর পূর্ণ প্রতিদান পাওয়া যাবে। ইসলাম মানব প্রেমের ধর্ম ও মানব দরদী ধর্ম। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হ',
প্রথমত : খোদায়ী গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয় এবং কেউ কাউকে ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতে পারেনা। এমনকি নবী ও কাউকে ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত : ইসলাম মানব সেবার ধর্ম। ইসলাম অমুসলমানদের মধ্যেও দারিদ্র ও অভাবকে মেনে নেয়না।
তৃতীয়ত : কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে, তাহলে সে তার স কাজের প্রতিদান পৃথিবীতে ও পরকালে ও পেয়ে থাকে।

 

কোরআনের আলো
(
৭১ তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা বাকারার ২৭৩ থেকে ২৭৭ নম্বর আয়াতের তেলাওয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো । প্রথমেই আমরা সুরা বাকারার ২৭৩ ও ২৭৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, দান ও সদকা এমন অভাবগ্রস্তদের প্রাপ্য ,যারা আল্লাহর ধর্মের কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ বা বিপদগ্রস্ত হয়েছেন । তারা একদিকে নিজেদের জীবিকা অর্জনের জন্য চলাফেরার ও সফরের ক্ষমতা রাখেনা। আর অন্যদিকে তীব্র আত্মসংযম ও মর্যাদার কারণে লোকজন তাদেরকে ধনী এবং অভাবমুক্ত মনে করে । কিন্তু তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে । তারা মানুষের কাছে ব্যাকুলভাবে কিছু চায়না । বিশ্বাসীরা জেনে রাখো , তোমরা শুদ্ধ সম্পদ থেকে যা দান কর , আল্লাহতা জানেন । যারা দিনে ও রাতে , গোপনে ও প্রকাশ্যে দান করে , আল্লাহর কাছে তাদের পুরুষ্কার রয়েছে , সুতরাং তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দানের জন্য দুঃখিত হবেনা এই দুই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো , ইসলাম মুসলিম সমাজে ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব পরামর্শ দেয় , সেসবের মধ্যে অন্যতম হলো ,দান-খয়রাত । অর্থা ইসলাম ধনী ও সম্পদশালীদেরকে তাদের সম্পদের কিছু অংশ দরিদ্র ও বঞ্চিতদের দান করতে বলে । এই আয়াতে দান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে ,যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও অভিবাসন বা হিজরতের কারণে সম্পদ হারিয়েছে এবং আয়-উপার্জনের কোন ক্ষমতাও যাদের নেই তাদেরকে যেন দান করা হয় । সংযমী হবার কারণে এই শ্রেণীর মানুষ অন্যদের কাছে কিছু চায়না এবং নিজেদের অভাবের কথাও তুলে ধরেনা । তাই সাধারণ মানুষ তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে । কিন্তু মুমিনদেরকে এই শ্রেণীর সম্মানিত মানুষের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে হবে এবং এইসব দ্বীনি ভাইয়েরা যেন কষ্ট না পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে । ইসলামের ইতিহাসে দেখা গেছে ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবী (সাঃ)' অনেক সহযোগী তাঁর সাথে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন । মদীনায় তাদের ঘরবাড়ী ,অর্থ-সম্পদ কিছুই ছিলনা । কারণ ,মক্কার মুশরিকরা তাদের সমস্ত ধন-সম্পদ দখল করে নিয়েছিলেন । মদীনার মানুষ তাদের অনেককে নিজেদের ঘরে স্থান দেয় ও তাদের ব্যয়ভার বহন করতে থাকে । তবে মুহাজিরদের অধিকাংশই মসজিদে নব্বীর সুফফাহ ' নামক স্থানে আশ্রয় নেয় । এই দুই আয়াতে তাদের আভাব মোচনের জন্য মুমিনদেরকে আহবান জানানো হয়েছে । এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : ধনীদের সম্পদের মধ্যে আল্লাহ দরিদ্রদের অধিকার রেখেছেন ।
দ্বিতীয়ত : মুসলিম সমাজে দরিদ্ররা তাদের অভাবের কথা বলার আগেই যেন তাদের অভাব মেটানো হয় । এতে করে মুমিনের সম্মান ক্ষুন্ন হবার কোনো সুযোগ থাকবে না । মুসলিম সমাজে মুমিনের সম্মান ক্ষুন্ন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ।
তৃতীয়তঃ কোরআনের দৃষ্টিতে, তারাই দরিদ্র বা ফকীর যারা বিভিন্ন শারিরীক সমস্যা যেমন- রোগ,বার্ধক্য, প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা যুদ্ধ প্রভৃতি কারণে জীবিকা অর্জনের ক্ষমতা রাখে না । অথচ তারা বৈষয়িক চাহিদা পূরণের চেয়ে সম্মান রক্ষাকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকেন । তাই যারা বিভিন্ন সমাজে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে অর্থ দেয়ার জন্যে মানুষকে পীড়াপীড়ি করে তারা দরিদ্র নয় , বরং ভিক্ষুক ।
চতুর্থতঃ যারা আল্লাহর রাস্তায় দান খয়রাত করে , আল্লাহ তাদেরকে ভবিষ্যতে দারিদ্র্য থেকে দূরে রাখবেন এবং তাদের কোনো ভয় নেই । কারণ , আল্লাহর ওপর ভরসা করার কারণে তারা নিজেদের দানের জন্য কখনও অনুতপ্ত বা দুঃখিত হবেনা ।
এবারে সুরা বাকারার ২৭৫ও ২৭৬ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো । এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, যারা সুদ খায় তারা অর্থ ও সম্পদের জন্য এত উন্মত্ত যে তারা মাতালদের মত ভারসাম্যহীন এবং শয়তানের প্রভাবিত পাগলের মত তারা নিজ অবস্থান থেকে দাঁড়াবে । তাদের এই অবস্থা এজন্য যে , তারা বলে, বেচা-কেনা তো সুদের মত! অথচ আল্লাহ বেচা-কেনাকে বৈধ করেছেন এবং সুদকে অবৈধ বা হারাম করেছেন । অতএব, যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ আসার পর সে সুদ গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে অতীতে তার সুদ নেয়ার বিষয়টি আল্লাহ বিবেচনা করবেন । কিন্তু যারা পুনরায় সুদ নিতে আরম্ভ করবে , তারাই নরকের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে । আল্লাহ সুদের আয়কে ধ্বংস করেন এবং দানকে বাড়িয়ে দেন , আল্লাহ অবিশ্বাসী বা অকৃতজ্ঞ পাপীদের ভালবাসেন না ।
সুপ্রিয় পাঠক, আপনারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন , মহান আল্লাহ সুরা বাকারার পর পর ১৪ টি আয়াতে মুমিনদেরকে দান খয়রাতে উসাহিত করেছেন এবং এর ব্যক্তিগত ও সামাজিক সুফলেরও বর্ণনা করেছেন । একদিকে দানশীলতার চেতনা বৃদ্ধি করা ও দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমানো এবং অন্যদিকে শ্রেণী বৈষম্য হ্রাস করাসহ ইসলামী সমাজে ভ্রাতৃত্বের চেতনা বৃদ্ধি করা ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় উসাহ দেয়া এসব আয়াতের মূল লক্ষ্য । আর এসব আয়াতের পর পবিত্র কোরআনে সুদ সমস্যার উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে সুদ সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করা ছাড়াও ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্যকেও নষ্ট করে । সুদের কারণে একদিকে ধনীদের বিরুদ্ধে গরীবদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ বাড়তে বাড়তে তা বিস্ফোরণের পর্যায়ে উপনীত হয় এবং অন্যদিকে তা সুদখোরের মধ্যে এমন উন্মত্ততা সৃষ্টি করে যে, সে অর্থ ও স্বর্ণ ছাড়া আর কিছুই চেনেনা । এ ধরনের ব্যক্তি টাকার জন্য মানবিকতা পর্যন্ত বিসর্জন দেয় । সুদখোর সমাজের উপাদন প্রক্রিয়ায় কোন ইতিহাস ভূমিকা রাখেনা । চিন্তা ও শ্রম না খাটিয়েই সে অভাবগ্রস্তকে ঋণ দিয়ে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবী করে । এরফলে দরিদ্ররা আরো দরিদ্র ও দূর্বল এবং ধনীরা আরো ধনী হয় । আর সমাজের বঞ্চিত শ্রেণীর ওপর এটা সবচেয়ে বড় ধরনের জুলুম । আর এ জন্যেই সমস্ত ঐশী গ্রন্থে সুদকে হারাম করা হয়েছে এবং সুদখোরদের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে । দৃশ্যত : সুদের মাধ্যমে অর্থের বৃদ্ধি, ও দান সদকার মাধ্যমে সম্পদ হ্রাস পেলেও সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি ও বরকত আল্লাহর ইচ্ছাধীন । সুদের মাধ্যমে যে অর্থ অর্জিত হয় তা ব্যক্তির জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে না । সুদের আয়ের বিরুদ্ধে বঞ্চিতদের ঘৃণা থাকে বলে সুদখোর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা পায়না এবং অনেকসময় তার আসল সম্পদও হাতছাড়া হয়ে যায় । অথচ দানশীল ব্যক্তি দানের জন্য সমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করায় নিরাপত্তা ও প্রশান্তি লাভ করে এবং তার উন্নতি ও কল্যাণের পথ প্রশস্থ হয় । এখানে এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো একে একে উল্লেখ করছি
প্রথমত : সুদ গ্রহণ ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং এরফলে সমাজের অর্থনৈতি ভারসাম্য নষ্ট হয় । সুদখোর ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা অর্জন করে এবং সুদ গ্রহণের কারণে সমাজে ন্যায় বিচারের পরিবর্তে জুলুম ও নিপীড়নের বিস্তার ঘটে
দ্বিতীয়ত: ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ ধর্ম । তাই এ ধর্মে অর্থনৈতিক কর্মসূচিও রয়েছে । ইসলাম মানুষের ওপর নিস্প্রাণ ইবাদত চাপিয়ে দেয় না এবং পার্থিব বিষয়ে মানুষকে দিক-নির্দেশণা বিহীনভাবে ছেড়ে দেয়নি ।
তৃতীয়ত : সুদ-গ্রহণ এক ধরনের অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ । আল্লাহ আমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা আল্লাহর দেয়া আমানত মাত্র এ সম্পদ থেকে বঞ্চিতদের দান না করা হলো, আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা । এ অকৃতজ্ঞতা সম্পদের ধ্বংস ডেকে আনে।
এবারে সুরা বাকারার ২৭৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এই আয়াতের অর্থ হলো, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও সকাজ করে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠিত করে ও জাকাত দেয়, তারা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাবে। ভবিষ্যতের জন্য তাদের কোন আশঙ্কা নেই এবং অতীতের জন্যেও তারা দুঃখিত বা অনুতপ্ত হবে না । এই আয়াতে প্রকৃত মুমিনের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে যে, প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসী শুধু নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে না, জাকাত দেয়ার মাধ্যমে সে আল্লাহর সৃষ্টির সাথেও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে । প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসীরা ধর্মকে প্রাণহীন শুষ্ক দায়িত্বের মধ্যে সীমিত করে না । তারা অন্যদের কল্যাণের জন্যেও সচেষ্ট থাকে । সবশেষে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করছি, জাকাত ও দানশীলতার বিস্তৃতির মাধ্যমে সমাজে যেন সুদখোর ও বঞ্চিতদের অধিকার ক্ষুন্নকারীদের তপরতার কোন অবকাশ না থাকে এবং সমাজে যেন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় । #

কোরআনের আলো
(
৭২তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক , কোরআনের আলোর গত অনুষ্ঠানগুলোতে আমরা ব্যক্তি ও সমাজের ওপর সুদের অশুভ প্রভাব সম্পর্কিত আয়াত নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের পর্বেও সুদ সংক্রান্ত আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে সুরা বাকারার ২৭৮ ও২৭৯ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করবো। এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, হে বিশ্বাসীরা, আল্লাহকে ভয় কর। যদি বিশ্বাসী হও, তাহলে সুদ বাবদ মানুষের কাছে যা তোমাদের পাওনা ছিল তা পরিত্যাগ কর। আর যদি তা না কর, তবে ধরে নেয়া হবে যে, তোমরা আল্লাহও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছ। যদি তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবে তোমাদের জন্যই তোমাদের মূলধন রয়েছে। তোমরা সুদ নিয়ে অত্যাচার করোনা এবং মূলধন হারিয়ে অত্যাচারিতও হয়ো না। পবিত্র কোরআনে যখন সুদ বর্জনের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন কোন কোন মুসলমান মানুষের কাছ থেকে সুদ বাবদ অনেক অর্থ পাওনা ছিল। তাই তারা এ বিষয়ে রাসুলের কাছে প্রশ্ন করলে এই দুই আয়াত নাজেল হয় এবং নবী (সঃ) মুসলমানদের সমাবেশে সুদ সংক্রান্ত সকল চুক্তিকে বাতিল ঘোষণা করেন। রাসুল (সঃ) সবার আগে সুদের লেন দেন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য নিজের আত্মীয় স্বজন ও বংশের প্রতি আহবান জানান। পূর্ববর্তী আয়াতে আমরা দেখেছি যে, বঞ্চিতদের অর্থ সাহায্য করা ও তাদের ঋণ দেয়া আল্লাহকে ঋণ দেয়ার সমতুল্য। আর আল্লাহ নিজেই তাদের পুরস্কার দিবেন। এই আয়াতে সুদ নিয়ে বঞ্চিতদের ওপর জুলুম করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, যদি সুদ নেয়া থেকে বিরত না হও,তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল বঞ্চিতদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করবেন। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : ঈমান আনার অর্থ শুধু নামাজ পড়া ও রোজা রাখা নয়। অবৈধ সম্পদ থেকে দূরে থাকাও ঈমান ও খোদাভৗরুতার শর্ত।
দ্বিতীয়ত : ইসলাম মালিকানাকে সম্মান করে, কিন্তু সুদ গ্রহণ ও শোষনের অনুমতি দেয় না।
তৃতীয়ত : অত্যাচার করা ও অত্যাচারিত হওয়া উভয়ই নিন্দনীয়। তাই সুদ দেয়া ও নেয়া দুটোই নিষিদ্ধ।
এবারে সুরা বাকারার ২৮০ ও ২৮১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, ঋণী যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তার সচ্ছলতার জন্য অপেক্ষা কর, আর যদি ঋণ ফেরত দেয়ার ক্ষমতাই না থাকে তাহলে তাদের ঋণ মাফ করে দেয়াই উত্তম। তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যে দিন তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, তখন যে যা অর্জন করেছে , তা সম্পূর্ণরূপে দেয়া হবে এবং তোমাদের ওপর অন্যায় করা হবেনা। পূর্ববর্তী কয়েকটি আয়াতে দানখয়রাত ও ঋণ দেয়ার জন্য মুমিনদেরকে উসাহিত করার পর,সুদ না নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, ঋণ দেয়ার পর সুদ নেয়া তো চলবেই না, একই সাথে চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তি যদি স্বল্প সময়ে ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা না রাখে , তবে তাকে সময় দেয়া উচিত এবং এমনকি যদি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাই না রাখে, তাহলে ঋণ মাফ করে দেয়ার উপদেশ দেয়া হয়েছে। ঋণ মাফ করে দেয়ার জন্য পরকালে প্রতিদান দেয়া হবে বলেও আল্লাহ ঘোষনা করেছেন। ধর্মের এইসব উপদেশ যদি সমাজে বাস্তবায়িত হ'ত তাহলে সমাজে সচ্ছলতা পবিত্রতা ও ভ্রাতৃত্ব কতই না বৃদ্ধি পেত। এর ফলে অভাবগ্রস্তদের অভাব পূর্ণ হওয়া ছাড়াও ধণীরা লোভী কৃপণ ও দুনিয়াপূজারী হত না এবং ঋণীও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান ও হ্রাস পেত। এবারে এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হলো,
প্রথমত : বঞ্চিতদের কল্যাণ সাধনই হ', দান খয়রাত ও ঋনের মূল উদ্দেশ্য। তাই এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে বঞ্চিতরা আরো অভাবগ্রস্থ হয়ে পরে।
দ্বিতীয়ত : ইসলাম বঞ্চিতদের প্রকৃত সহায়। তাই সুদকে নিষিদ্ধ করে এবং দানকে উসাহিত করে ইসলাম সমাজের অর্থনৈতিক শূন্যতা পূরণ করছে।
তৃতীয়ত : দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগনের সন্তুষ্টি অর্জন করা, সম্পদ অর্জনের চেয়ে ভালো।
এবারে সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর নিয়ে আলোচনা করবো। এই আয়াতের অর্থ হলো, হে বিশ্বাসীগণ, যখন একে অন্যের সাথে কোন নির্দিষ্টকালের জন্য ধারের আদান প্রদান করবে তখন তা লিখে রাখ এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে লিখে দেয়, আল্লাহ যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন সেভাবে লিখতে লেখক যেন অস্বীকার না করে। অতএব তার লিপিবদ্ধ করাই উচিত এবং যে ব্যক্তির ওপর দায়িত্ব সেও লিখিয়ে নেবে এবং তার উচিত নিজ প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করা, আর যার ওপর দায়িত্ব সে যদি লেখাতে অযোগ্য অথবা দুর্বল হয়, তবে তার অভিভাবকেরা ন্যায়সঙ্গত ভাবে লিখিয়ে নেবে এবং তোমাদের মধ্যে দুজন পুরুষ সাক্ষীকে সাক্ষী কর, কিন্তু যদি দুজন পুরুষ না পাওয়া যায়, তাতে সাক্ষীদের মধ্যে তোমরা নির্ভর যোগ্য ও বিশ্বস্ত একজন পুরুষ ও দুজন নারী মনোনীত কর। যদি দুই একজন ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেবে। যখন সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আহবান করা উচিত নয়। আর ছোট হোক বর হোক বিরক্ত হয়োনা, আল্লাহর কাছে তা ন্যায্যতর ও প্রমাণের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হবার নিকটতর, কিন্তু তোমরা পরস্পরে ব্যবসায় যে নগদ অর্থ আদানপ্রদান কর, তা না লিখলে কোন দোষ নেই, তোমরা যখন পরস্পর বেচা-কেনা কর , তখন সাক্ষী রেখো, লেখক ও সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদি তোমরা তাদের ক্ষতিগ্রস্থ কর, তা তোমাদের জন্য পাপ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তিনি তোমাদের শিক্ষা দেন আল্লাহ সব বিষয়ে মহাজ্ঞানী। সুরা বাকারার এই আয়াত পবিত্র কোরআনের দীর্ঘতম আয়াত। মানুষের অর্থ সম্পদ রক্ষার বিষয়ে এতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দান খয়রাত করা ও ঋণদেয়ার উপদেশ সম্পর্কিত আয়াত এবং সুদ নেয়া নিষিদ্ধ ঘোষনার আয়াতের পর এই আয়াতে লেন দেনের সঠিক পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে যাতে মানুষকে লেন দেনের ক্ষেত্রে সব ধরনের ভুল ও অন্যায় থেকে দূরে রাখা যায় এবং কোন পক্ষই যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। লেন-দেনের সঠিক পদ্ধতির যেসব শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, এবারে তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
প্রথমত : যে কোন ধর্মাবলম্বীর সাথে বেশী বা কম অর্থের ঋণ বা অন্য কোন ধরনের লেন-দেন করা হোক না কেন তা দলীল আকারে লিখে রাখা উচিত।
দ্বিতীয়ত : কোন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দলীল লেখাতে হবে। তা-না হলে দেনার দায় লেখকের ওপর চাপানোর ভয় থাকে।
তৃতীয়ত : দেনাদার ও দলীল লেখককে আল্লাহর ভয় রাখতে হবে এবং কারো অধিকার লংঘন করা যাবে না।
চতুর্থত : লিখিত প্রমান ছাড়াও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য দু-জন সাক্ষী থাকতে হবে।
পঞ্চমত : নগদ লেন-দেনের ক্ষেত্রে লিখিত দলীল জরুরী নয়। সাক্ষীই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।
এবারে সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো তুলে ধরছি।
প্রথমত : ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামাজিক ধর্ম। ব্যক্তিগত দিক ও মানুষের আত্মিক দিকের বিকাশ ছাড়াও এ ধর্মে সমাজের অর্থনৈতিক এবং আইনগত বা অধিকারগত বিষয়ের ওপর গভীর দৃষ্টি দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত : লেন-দেনের চুক্তি লিখে রাখার কথা বলা হয়েছে এমন এক সময়ে যখন সাধারণ মানুষ লেখা-পড়া জানতো না। আর এ থেকেই বোঝা যায় শিক্ষা ও জ্ঞানের উন্নতির প্রতি ইসলাম ধর্ম গুরুত্ব আরোপ করে।
তৃতীয়ত : চুক্তি পত্র লিখতে বলার উদ্দেশ্য হলো, জনগণের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা সৃষ্টি করা। অবিশ্বাস সৃষ্টি এর উদ্দেশ্য নয়। ভুল করা , ভুলে যাওয়া বা অবহেলা করা সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিনষ্ট করে।
চতুর্থত : লেন-দেন যথাযথ ভাবে লিখে রাখা বা রেকর্ড করার তিনটি সুবিধে রয়েছে। সুবিধেগুলো হলো, ন্যায় বিচারের নিশ্চয়তা, সাক্ষীদের জন্য লেন-দেনের দলীল থাকা এবং অবিশ্বাস ও সন্দেহের পথ বন্ধ হওয়া। #

কোরআনের আলো
(
৭৩ তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক , কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা পবিত্র কোরআনের দীর্ঘতম সুরা বাকারার শেষের কয়েকটি আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করব। আগের কয়েকটি আয়াতে আমরা ব্যবসা ও লেন-দেন যদি নগদ না হয় সেক্ষেত্রে এবং ঋণের ক্ষেত্রে দলীল প্রমাণ লিখে রাখার ব্যাপারে কোরআনের দিক নির্দেশনা সম্পর্কে জেনেছি।
সুরা বাকারার শেষের কয়েকটি আয়াতেও এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তো শুরুতেই আমরা সুরা বাকারার ২৮৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। এই আয়াতের অর্থ হ', যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে নগদ নয় এমন লেন-দেনের ক্ষেত্রে বা ঋণ-প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বন্ধক রাখ। যদি কেউ কাউকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়েছিল, তার উচিত গচ্ছিত দ্রব্য ফিরিয়ে দেয়া এবং নিজ প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করা। হে মুসলমান, কারো অধিকারের ব্যাপারে সাক্ষ্য বা সাক্ষী গোপন করোনা। যে কেউ তা গোপন করবে তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। গত অনুষ্ঠানে আমরা যেমনটি বলেছিলাম ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য নগদ নয়,এমন সব ধরনের লেন-দেনের লিখিত দলীল রাখার পরামর্শ দেয় এবং দু'জন স্বাক্ষীর উপস্থিতিতে দলীল লিখতে বলা হয়েছে, যাতে কোন পক্ষের ভুল বা স্মৃতি বিভ্রটের কারণে সমস্যা দেখা না দেয়। ইসলাম এ বিষয়ে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, সফরের সময়ও লেন-দেনের দলীল লিখে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। আর যদি কোন লেখক না পাওয়া যায় তাহলে কোন কিছু গচ্ছিত রেখে লেন-দেনকে সুদৃঢ় করতে বলেছে। কিন্তু পাওনাদার ও দেনাদার উভয়কেই একথা মনে রাখতে হবে যে তাদের কাছে যা রয়েছে তা হলো, আমানতকে মূল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। পাওনাদারের কাছে যা বন্ধক রয়েছে তা হলো, আমানত এবং এই বন্ধকের অপব্যবহারের অধিকার তার নেই। বরং এই বন্ধক অক্ষত ও সুরক্ষিত অবস্থায় দেনাদারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। দেনাদারকে ও বিশ্বস্ত বলে ধরে নেয়া হয় এবং এ জন্যেই তাকে ঋণ দেয়া হয়। তাই সময়মত দেনা শোধ করা তাদের দায়িত্ব। এতে করে পাওনাদারেরও ক্ষতি হয় না। বিশেষ করে, যে সব ক্ষেত্রে পাওনাদার দেনাদারকে এতটা পর্যন্ত বিশ্বাস করে যে, তার কাছ থেকে কোন বন্ধক বা জামানত না নিয়েই তাকে ঋণ দিয়েছে, সে সব ক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহকে স্মরণ রাখা উচিত এবং পাওনাদারের অধিকার নষ্ট করা উচিত নয়। এই আয়াতের শেষাংশে মুমিন মুসলমানদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে, মানুষের অধিকারের ব্যাপারে কথা বলতে বা সাক্ষ্য দিতে কেউ যেন অবহেলা না করে কারণ, আল্লাহ মানুষের অন্তরের খবর রাখেন এবং কেউ যদি কারো অধিকারের ব্যাপারে নীরব থাকে বা অধিকার গোপন রাখে, তাহলে তা হবে অত্যন্ত বড় পাপ। যদিও মানুষ অনেক সময় তা বুঝতে পারেনা। এই ধরনের পাপ মানুষের আত্মাকে অপবিত্র করে। এই আয়াতের মূল শিক্ষণীয় দিক হলো,
প্রথমত : নগদ নয় এমন সব লেনদেন মুখের কথার ভিত্তিতে করা উচিত নয়। বরং লিখিত প্রমাণ রেখে স্বাক্ষী রেখে ও প্রয়োজন হলে বন্ধক বা জামানত রেখে লেন-দেন সুদৃঢ় করা উচিত।
দ্বিতীয়ত : সময় মত দেনা পরিশোধের মাধ্যমে পারস্পরিক বিশ্বাস অটুট রাখতে হবে এবং সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে।
এবারে সুরা বাকারার ২৮৪ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হ',আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সমন্ত আল্লাহরই, তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা প্রকাশ কর অথবা গোপণ রাখ, আল্লাহ সে সবই জানেন এবং সে অনুযায়ী আল্লাহ তোমাদের হিসাব গ্রহণ করবেন। এরপর আল্লাহ যাকে শাস্তির উপযুক্ত মনে করেন তাকে শাস্তি দিবেন এবং যাকে ক্ষমার উপযুক্ত মনে করেন , তাকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। এই আয়াতে বিশ্বাসীদের সাবধান করে দিয়ে বলা হয়েছে এমন ধারণা করো না যে শুধু শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমন- চোখ, কান, হাত, পা এসব দিয়ে যেসব পাপ করা হয়েছে সে সব পাপেরই শাস্তি দেয়া হবে। আল্লাহ অন্তরের পাপ সম্পর্কেও অবহিত এবং অন্তরের পাপ অনুযায়ী আল্লাহ তোমাদের বিচার করবেন। অন্তরের গোণাহ বা পাপ বলতে চিন্তাগত বিকৃতি, কুফরী বিশ্বাস, জনগনের অধিকার গোপন করা প্রভৃতিকে বোঝায়। কিন্তু শয়তান যদি মানুষের অন্তরে খারাপ কাজের কূ-মন্ত্রনা দেয় এবং মানুষ যদি খারাপ কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও ঐ কাজে জড়িত না হয়, তাহলে সে জন্য শাস্তি পাবেনা। অবশ্য পাপের চিন্তা বা ইচ্ছা, ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে অন্ধকার ও কলুষিত করে এবং পাপের পথ খুলে দেয়।
এবারে সুরা বাকারার ২৮৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হ', রাসুল, তাঁর প্রতি তাঁর প্রতিপালক হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা বিশ্বাস করেন এবং বিশ্বাসীরাও আল্লাহকে, তাঁর ফেরেশতাদেরকে বিশ্বাস করেন। আর তাঁরা বলেন , আমরা আল্লাহর রাসুলদের মধ্যে কোন পার্থক্য করিনা তাদের সবার প্রতিই আমরা ঈমান রাখি। তাঁরা বলে, আমরা শুনলাম ও স্বীকার করলাম, হে আমাদের প্রতিপালক । আমরা তোমারই কাছে ক্ষমা চাইছি এবং তোমারই দিকে চরম প্রত্যাবর্তন। ইসলামের দৃষ্টিতে, বিশ্ব একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত এবং বিশ্ববাসীকে মুক্তির পথ দেখানোর জন্য ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী বা শিক্ষক পাঠানো হয়েছে। এই নবীরা মানবজাতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করেছে। মানুষের চিন্তা ও বিবেক যখন আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচী উপলদ্ধি করার যোগ্য হ', তখন আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সঃ )কে মানবজাতির জন্য সর্বশেষ নবী হিসেবে মনোনীত করেন। তাই একজন মুসলমান সমন্ত নবী ফেরেশতা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রেরিত সমস্ত গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং তাঁরা নবীদের মধ্যে কোন বৈষম্য করেনা।
এবারে সুরা বাকারার ২৮৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হ', আল্লাহ কাউকে সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব দেননা। ভালো কাজের মাধ্যমে যা সে অর্জন করেছে, তা তার জন্যই , আর যা সে খারাপ কাজের মাধ্যমে অর্জন করে তাও তারই জন্য। বিশ্বাসীরা বলে , হে আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদের ভুল ত্রুটি হয়, তবে আপনি আমাদের অপরাধী করবেন না, হে আমাদের প্রতিপালক , পাপ ও বিদ্রোহের কারণে আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেমন গুরুভার অর্পন করেছিলেন, আমাদের ওপর তেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করবেন না। যে শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের নেই, সে শাস্তি আমাদের ওপর আরোপ করবেন না। আমাদের কে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে দয়া করুন,আপনিই আমাদের প্রভু । তাই অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের জয়যুক্ত করুন। মহান আল্লাহতা'লা মানুষকে বিভিন্ন গুণ ও যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কেউ বেশী প্রতিভাবান, কেউ কম প্রতিভাবান, কেউ শক্তিশালী ও সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী। আবার কেউ দূর্বল ও রুগ্ন। কেউ ফর্সা , কেউ কালো এবং কেউ নারী ও কেউ পুরুষ। এসবের মধ্যে কোন কোন পার্থক্য মানব প্রজন্ম সৃষ্টি ও রক্ষার জন্য জরুরী। আবার কোন কোন পার্থক্য বা বৈষম্য মানুষের ওপর জুলুম ও সামাজিক অবিচারেরই ফল মাত্র । এটা স্বাভাবিক যে, এই সব পার্থক্য ও বৈষম্য মানুষের শরীর এবং মনের ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখে। মানুষের মধ্যে এতসব পার্থক্য সত্ত্বেও আল্লাহ যদি তাদের কাছ থেকে একই ধরনের প্রত্যাশা রাখেন , তবে তা হবে অবিচার । তাই এ আয়াতে আল্লাহর অন্যতম প্রধান গুন হিসেবে তাঁর ন্যায়পরায়নতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ কাউকে তার ক্ষমতা বা সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব দেন না এবং তার কাছে এর চেয়ে বেশী প্রত্যাশা ও করেন না। তাই শাস্তি ও পুরস্কার দায়িত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের হবে। আল্লাহ সোবহানাহু-তায়ালা , বিচার দিবসে প্রত্যেকের কাছ থেকে তার উপলব্ধি ক্ষমতা, ধর্মীয় জ্ঞান অনুযায়ী হিসাব নিবেন। তাই আলর ন্যায় বিচার অনুযায়ী মানুষ যদি কোন ফরজ কাজ বা আল্লাহর নির্দেশ অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলক্রমে অমান্য করে পাপে লিপ্ত হয়, তাহলে তা পাপ বলে বিবেচিত হবে না। জানা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে যেসব পাপ করা হয় শুধুমাত্র সেসব পাপের জন্যই শাস্তি দেয়া হবে। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হলো ,
প্রথমত : ইসলাম সহজ সরল ধর্ম। ইসলাম সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব পালন করতে বলে না। যেমনটি ইসলামের নবী (সাঃ) ও বলেছেন, আমি সহজ ও সরল ধর্মের নবী মনোনীত হয়েছি।
দ্বিতীয়ত : পুরস্কার ও শাস্তির ভিত্তি হলো, কাজ বা তপরতা। আর কাজ করা হয় ইচ্ছার ভিত্তিতে। তাই ভুল করে যেসব অপরাধ করা হয় সেগুলোর জন্য আল্লাহ শাস্তি দিবেন না।
তৃতীয়ত : আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়ালু , করুণাময় এবং ক্ষমাশীল। তাই মানুষ তওবা করলে আল্লাহ তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন এবং পাপের কালিমা থেকে তাদেরকে পবিত্র করেন। #

( সূরা বাকারা সমাপ্ত )

 



back 1 2 3