তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান

রেডিও তেহরান


সূরা বাকারা ( ৬১ ৭৩ পর্ব )

 

কোরআনের আলো
(
৬১তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর গত পর্বে আমরা জেনেছি ইসলাম স্ত্রীর অধিকার রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং স্ত্রীর উপর যেকোন শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালানো নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে । যৌথভাবে জীবন যাপন অব্যাহত রাখতে স্বামী ও স্ত্রী সম্মত না হলে ইসলাম তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদকে, অনিশ্চিত অবস্থায় স্ত্রীকে কন্ঠিত করে তাকে চাপের মুখে রাখার চেয়ে ভালো বলে মনে করে । আজকের পর্বে আমরা তালাক সম্পর্কে কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা করবো । প্রথমে সুরা বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এ আয়াতের অর্থ হলো, ‘‘ যেসব স্ত্রী তালাক পেয়েছে তারা পুনরায় বিয়ের আগে তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে পবিত্র হওয়ার জন্য । আর তারা যদি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তবে আল্লাহ তাদের গর্ভে যা সৃষ্টি করেছেন তা অন্য কাউকে বিয়ের লক্ষ্যে গোপন করা তাদের জন্য বৈধ নয়, বরং সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সময় পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করা উচিত । আর এ সময়ের মধ্যে তাদের স্বামীরা যদি আপোস করতে চায়, তবে তাদের স্বামী তাদেরকে পুনরায় বিয়ে করার বেশি অধিকার রাখে । স্বামীদের জানা উচিত স্ত্রীদের উপর তাদের যেমন ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে, তেমনি স্বামীদের উপরও স্ত্রীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার অছে । আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও প্রজ্ঞাময় ।'' এ আয়াতে পরিবারের ও সন্তানদের পবিত্রতা রক্ষার জন্য তালাকের পর পুনরায় বিয়ের আগে স্ত্রীদেরকে প্রায় তিন মাস অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে । যাতে তাদের গর্ভে যদি সন্তান থেকে তবে তা যেন স্পষ্ট হয় এবং নবজাতকের অধিকার যেন রক্ষা করা হয় । সম্ভবত এই নবজাতক তালাক প্রতিরোধের পটভূমি সৃষ্টি করতে পারে । এরই মধ্যে স্বামী বা স্ত্রী যদি তালাকের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং পুনরায় আগের মতো যৌথ জীবন শুরু করতে চায় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে পুর্বের স্বামী অন্যদের চেয়ে বেশি অধিকার পাবে। আয়াতের শেষাংশে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ মিটানো ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের উভয়কেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে । আর এ লক্ষ্যে প্রথমে স্বামীদের উদ্দেশ্যে বলা হলো,‘‘তোমাদের স্ত্রীর যেমন ঘর ও সংসারের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তেমনি তোমাদেরও স্ত্রীর অধিকার রক্ষার জন্য দায়িত্ব আছে । উপযুক্ত ও পছন্দনীয় পন্থায় এই দায়িত্ব পালন করতে হবে ।'' এরপর স্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, ‘‘ পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব স্বামীর এবং এক্ষেত্রে স্ত্রীর চেয়ে স্বামীর যোগ্যতা বেশি '' এবারে সুরা বাকারার ২২৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । ‘‘যেকোন স্বামী দুই বার পর্যন্ত তালাক দিয়েও পূর্বের স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে পারে । এরপর হয় তাকে উপযুক্ত মর্যাদায় স্ত্রী হিসেবে রাখবে অথবা সদয়তার সাথে ত্যাগ করবে । স্বামী ও স্ত্রী যদি এ আশংকা করে যে তারা আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে স্ত্রীর কাছ থেকে নিজের দেয়া সম্পদ থেকে কিছু ফিরিয়ে নেয়া স্বামীর জন্য বৈধ নয় । এরপর যদি তোমাদের ভয় হয় যে তারা উভয়ই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নিয়ে নেয় তবে উভয়ের মধ্যে কারোই কোন পাপ নেই । এই হলো আল্লাহর নির্দেশের সীমা এবং এই সীমানা লংঘন করো না । যারা আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে তারা অত্যাচারী।'' আগের আয়াতে বলা হয়েছিল তালাকের পর স্ত্রীকে তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে। যাতে তার গর্ভে যদি সন্তান থেকে থাকে তা যেন স্পষ্ট হয় এবং তালাকের বিষয়ে স্বামী অনুতপ্ত হলে যেন পুনর্মিলনের সম্ভাবনা থাকে । এই আয়াতে বলা হয়েছে স্বামী মাত্র দুইবার পর্যন্ত স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তা ফিরিয়ে নিতে পারে । আর যদি তৃতীয়বার স্ত্রীকে তালাক দেয় তাহলে স্ত্রীর কাছে আর ফিরে যেতে পারবে না এরপর পরিবার পরিচালনার বিষয়ে একটি জরুরী মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে । পুরুষদের উদ্দেশ্যে এ মূলনীতিতে বলা হয়েছে স্বামীদেরকে হয় পৃথক থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হবে অথবা স্ত্রীর সাথে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে হবে । আর যদি একত্রে বসবাস একেবারেই সম্ভব না হয় তাহলে অত্যন্ত ভদ্রভাবে স্ত্রীকে মুক্তি দিয়ে দাও এবং এক্ষেত্রে অবশ্যই স্ত্রীর প্রাপ্য দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে । আর যদি স্ত্রী নিজেই তালাকের জন্য পীড়াপীড়ি করেন, তাহলে স্ত্রী তার মোহরানা মাফ করে দিয়ে তালাক নিতে পারেন কিন্তু কোন অবস্থাতেই মোহরানা মাফ করিয়ে নেয়ার জন্য স্ত্রীর উপর কোন ধরনের চাপ দেয়া বা তালাক নিতে তাকে বাধ্য করানো যাবে না এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তাহলো
প্রথমত : স্ত্রীর মানবীয় অধিকার ছাড়াও তার অর্থনৈতিক অধিকারও রক্ষা করতে হবে এবং স্ত্রীর সম্পদ ও মোহরানা থেকে স্বামী কিছুই গ্রহণ করতে পারবে না ।
দ্বিতীয়ত : তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ যদি একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে তাহলে স্বহৃদয়তার সাথে তা করতে হবে এবং প্রতিশোধ ও বিদ্বেষের মনোভাব নিয়ে তা করা যাবে না ।
তৃতীয়ত : যেসব পরিবার তার সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলে সেসব পরিবার অত্যন্ত সৌভাগ্যের অধিকারী আর যদি কোন পরিবার পাপের সাথে চলতে থাকে তবে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ ঐ পরিবার টিকে থাকার চেয়ে অনেক ভালো ।
এবারে সূরা বাকারার ২৩০ ও ২৩২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এই আয়াতের অর্থ হলো, যদি কোন স্বামী দুই বার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে পুনরায় তার কাছে ফিরে আসার পর স্ত্রীকে তৃতীয়বারের মতো তালাক দেয় তবে ঐ স্ত্রী তার জন্য আর বৈধ হবে না যদি না অন্য কোন পুরুষ তাকে বিয়ে করে । এই দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দিলে যদি তারা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার ইচ্ছে রাখে তবে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেইআর এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা । আল্লাহ তো জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা করেন । আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও এবং তারা নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত করে নেয়, তখন তোমরা নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও অথবা সহানুভূতির সাথে তাদেরকে মুক্ত করে দাও । আর তোমরা তাদেরকে জ্বালাতন ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশ্যে আটকে রেখোনা । আর যারা এমন করবে, নিশ্চয়ই তারা নিজেদেরই ক্ষতি করবে । আর আল্লাহর নিদর্শনকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করো না । আল্লাহর সে অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর যা তোমাদের ওপর রয়েছে এবং তাও স্মরণ কর, যে কিতাব ও জ্ঞানের কথা নাজেল করা হয়েছে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়ার জন্য । আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে আল্লাহ সব বিষয়ে মহাজ্ঞানী । তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এবং তারা তাদের ইদ্দতকাল পূর্ণ করে, তখন তারা যদি পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিধিমত সম্মত হয়, তবে স্ত্রীরা তাদের পূর্ব-স্বামীদের বিয়ে করতে চাইলে তাদেরকে বাধা দিওনা । এ দিয়ে তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও কেয়ামতের দিনে বিশ্বাস করে তাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে । এরমধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে একান্ত পরিশুদ্ধতা ও অনেক পবিত্রতা । আর আল্লাহ যা জানেন, তোমরা তা জান না । ইসলাম বৈধ ও প্রাকৃতিক কামনা-বাসনাকে সম্মান করে এবং স্বামী ও স্ত্রীর পুণর্মিলন ও তাদের কোলে সন্তানের প্রতিপালনকে স্বাগত জানায় । আর এ জন্যই ইসলাম, কোন স্ত্রী যদি অন্য পুরুষকে বিয়ে করার পর পুনরায় তার থেকে আলাদা হয়ে যায় তবে পূর্বের স্বামীর সাথে উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে বিয়েকে বৈধ করেছে । এক্ষেত্রে তাদের পুণর্বিবাহে অভিভাবক বা অন্যকারো বাধা দেয়ার কোন অধিকার নেই এবং এক্ষেত্রে উভয়ের সম্মতিই বিয়ের আকদ্ হিসেবে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তা হলো বর নির্বাচনে কনের মতামতকে সম্মান দেখাতে হবে এবং বিয়ের ভিত্তি হলো বর ও কনের যথাযথ সম্মতি । অতএব আমরা পারিবারিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য দম্পতিদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি । আপনারা পরস্পরের অধিকার যথাযথভাবে পালন করুন যাতে সন্তানদের এ উষ্ণ আশ্রয়স্থল শীতল না হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত যেন বিবাহ-বিচ্ছেদ না ঘটে ।#

কোরআনের আলো
(
৬২ তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর গত কয়েকটি পর্বে আমরা পরিবার ও স্বামী-স্ত্রীর সমস্যা সম্পর্কে ইসলামের বিধি, বিধান নিয়ে আলোচনা করেছি । কোরআনের পরবর্তী আয়াতসমূহে আমরা দেখবো ইসলাম সন্তানের অধিকার আদায় করা এবং এমনকি স্বামী- স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হবার পরও সন্তানের অধিকার আদায়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে । এ বিষয়ে সুরা বাকারার ২৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে " যে কেউ স্তন্যপানের কাল পূর্ণ করতে চায়, তারজন্য মায়েরা তাদের সন্তানকে পূর্ণ দু'বছর স্তন্যপান করাবে । পিতার কর্তব্য হলো তালাকের পরও যথাযোগ্যভাবে সন্তানের মায়ের ভরণপোষণ করা । আর বাবা ও মাকে তাদের সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ করা যাবে না । অনুরূপভাবে সন্তান বা উত্তরাধিকারীদের ওপরও একই দায়িত্ব রয়েছে । কিন্তু যদি তারা পরস্পরের সম্মতি ও পরামর্শক্রমে স্তন্যপান বন্ধ রাখতে চায়, তবে তাদের কারো কোন অপরাধ নেই । যদি তোমরা নিজ সন্তানদেরকে স্তন্য দেয়ার জন্য ধাত্রীদের কাছে অর্পন করে নিয়ম অনুযায়ী কিছু দান কর, তবে তাতেও তোমাদের জন্য দোষ নেই এবং আল্লাহকে ভয় কর । আর জেনে রেখো যে, তোমরা যা করছ আল্লাহ তা খুব ভালোভাবে দেখছেন। ‘‘পরিবার হলো প্রতিটি সমাজের স্তম্ভ । এই ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়লে সমাজে সংকট দেখা দেবে । আগের আয়াতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ সম্পর্কে বলার পর এই আয়াতে তালাকের পর সন্তানের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে । এই আয়াতে মাতৃস্নেহের গুরুত্ব বিচার করে ও শিশুর জন্য মায়ের দুধের প্রয়োজনের আলোকে শিশুকে দু'বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে । এমনকি মা যদি সন্তানের বাবা থেকে বিচ্ছিন্নও হয় বা সন্তানের পিতার মৃত্যু ঘটে তবুও মাকে সন্তানের এই অধিকার পূরণ করতে হবে । স্বামীর সাথে বনি-বনা না হবার জন্য সন্তানের দৈহিক ও মানসিক ক্ষতি করা যাবে না । অবশ্য সন্তান ও সন্তানের মায়ের ভরন-পোষণের দায়িত্ব পালন করা সন্তানের পিতার দায়িত্ব এবং তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে এমন কোন কাজ করার অধিকার সন্তানের পিতার নেই । এই আয়াত থেকে আমরা যা যা শিখলাম তা হলো,
প্রথমত : শিশুদের অধিকার রক্ষা করা পিতা-মাতার জন্য অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব । শিশুদেরকে তাদের পিতা-মাতার বিচ্ছেদের নেতিবাচক পরিণতির শিকার হতে দেয়া যাবে না
দ্বিতীয়ত : ইসলামী বিধান অনুযায়ী পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব স্বামীর এবং পরিবারের ভরণ-পোষন যোগাতে স্ত্রী বাধ্য নয় ।
এবারে সুরা বাকারার ২৩৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এ আয়াতের অর্থ হলো, ‘‘ তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায় তাদের স্ত্রীদেরকে চারমাস ১০দিন অপেক্ষা করতে হবে । ইদ্দত বা এই নির্ধারিত সময় শেষ হবার পর তারা যথানিয়মে নিজেদের জন্য যা করবে, তাতে তাদের কোন অপরাধ নেই । তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অভিজ্ঞ ।'' তালাক ছাড়া অন্য যে করণে স্ত্রীকে দুঃখজনকভাবে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয় তা হলো স্বামীর মৃত্যু । প্রাকৃতিকভাবে বা অসুস্থ হয়ে স্বামী মারা গেলে বিধবা স্ত্রীর কী করণীয় তা এই আয়াতে বলা হয়েছে । বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের মধ্যে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর করণীয় সম্পর্কে ইতিহাসে বিভিন্ন প্রথার কথা জানা যায় । অনেকের বিশ্বাস, স্ত্রীকেও স্বামীর মৃত্যুর পর মরতে হবে এবং এজন্য স্বামীর সাথে তাকে জীবন্ত কবর দিতে হবে । কোন কোন জাতি স্ত্রীর পুনর্বিবাহকে নিষিদ্ধ করেছে । আবার অনেকে স্বামীর মৃত্যুর পর পরই বিধবা স্ত্রীর পুনর্বিবাহকে বৈধ বলে মনে করেন । এই সব চরম পন্থা ও বাড়াবাড়ির বিপরীতে ইসলাম মৃত স্বামীর মর্যাদা রক্ষা এবং বিধবা স্ত্রী গর্ভবতী কিনা তা স্পষ্ট করার জন্য অপেক্ষার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে । কিন্তু এই সময় পেরিয়ে যাবার পর বিধবাকে নিজ পছন্দমত বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছে এবং এক্ষেত্রে অন্যদের মতামত তার জন্য জরুরী নয় । এবারে সুরা বাকারার ২৩৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এ আয়াতের অর্থ হলো, ‘‘ ইদ্দতকালীন মহিলাদের কাছে তোমরা ইঙ্গিতে বিয়ের প্রস্তাব করলে অথবা তা তোমাদের মনে গোপন রাখলে তোমাদের কোন পাপ নেই । আল্লাহ জানেন যে তোমরা তাদের সম্বন্ধে আলোচনা করবে । কিন্তু উপযুক্ত কথাবার্তা ছাড়া গোপনে তাদের কাছে কোন অঙ্গীকার করো না । জেনে রাখ, তোমাদের অন্তরে যা আছে আল্লাহ তা জানেন । আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহিষ্ণু । ‘‘আগের আয়াতে বলা হয়েছিল স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রীরা নিজেদের পছন্দমত যে কোন স্বামী গ্রহণ করতে পারে । এই আয়াতে বলা হয়েছে যদিও ইদ্দতকালীন সময়ে বিধবা স্ত্রীদেরকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই, কিন্তু রুচি সম্মত ও পরিবেশ সম্মতভাবে তাদের সাথে কথা বলতে হবে । কারণ স্বামী হারানোর কারণে তারা শোক-সন্তপ্ত রয়েছে ।
এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তাহলো
প্রথমত : ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম । আর প্রত্যেক মানুষই স্বভাবগতভাবে বিয়ে করতে আগ্রহী । ইসলাম এই চাহিদার বিরোধীতা করে না । বরং নারী ও পুরুষের জন্য এর বৈধ ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে ।
দ্বিতীয়ত : বিয়ের আগে বিয়ের জন্য গোপন চুক্তি বা ওয়াদা করা এবং বিধবা স্ত্রীদের সাথে অনুপযোগী আচরণ করা থেকে দূরে থাকতে হবে ।
সুরা বাকারার ২৩৬ ও ২৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘ যদি তোমরা তোমাদের স্ত্রীকে স্পর্শ না করে অথবা তাদের মোহরানা বা প্রাপ্য নির্ধারন না করে তালাক দাও , তবে তোমাদের জন্য কোন দোষ নেই । তোমরা তাদের সংস্থানের ব্যবস্থা করবে । বিত্তবান তার সাধ্যমত ও বিত্তহীন তার সামর্থ অনুযায়ী বিধিমত সংস্থানের ব্যবস্থা করবে । আর এটাই ন্যায়পরায়ন লোকের কর্তব্য । তোমরা যদি তাদেরকে স্পর্শ করার আগেই তালাক দাও , অথচ মোহর ধার্য করে থাক, তবে যা তোমরা ধার্য করেছ তার অর্ধেক তাদেরকে দিতে পার । যদি না স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহ-বন্ধন রয়েছে সে মাফ করে দেয় এবং মাফ করে দেয়াই আত্মসংযমের নিকটতর । তোমরা পরষ্পরের মধ্যে উদারতার কথা ভুলে যেওনা । তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন ।'' এই দুই আয়াতে তালাকের সময় স্ত্রীর অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, বিয়ের মূল চুক্তিতে দেন মোহর ধার্য না করা হলেও নিজের আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী স্ত্রীকে অর্থ দিয়ে বিচ্ছেদের তিক্ততা কিছুটা দূর করতে হবে । আর এটা হলো সকর্মশীলতার পরিচয়। আর যেক্ষেত্রে মোহরানা নির্ধারিত রয়েছে ও স্ত্রীকে স্পর্শ করা হয়েছে সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে পূর্ণ মোহরানা দিতে হবে এবং এমনকি একদিন স্পর্শ করা হলেও পূর্ণ মোহরানা দিতে হবে । স্ত্রীকে স্পর্শ না করা হলেও পূর্ণ মোহরানা দেয়া উত্তম ও মহত্বের নিদর্শন । আর পুরোপুরি সম্ভব না হলে অর্ধেক পরিমান মোহরানা দিতে হবে ।
অবশ্য স্ত্রী চাইলে পুরো অংশ বা আংশিক পরিমানে মোহরানা মাফ করে দিতে পারে এই দুই আয়াতের শিক্ষা হলো কোরআনের আকাঙিক্ষত পরিবার হবে এমন যে তালাকের সময়ও স্বামী-স্ত্রী মানবীয় ও নৈতিক বিষয়কে মনে রাখবে । অবশ্য পালনীয় অধিকার রক্ষা করা ছাড়াও উভয়পক্ষকে বিদ্বেষ ও রুক্ষতার পরিবর্তে একে অপরের প্রতি উদার ও ক্ষমাশীল হতে হবে । #

কোরআনের আলো
(
৬৩ তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর আজকের পর্বে ব্যক্তি, সমাজ ও পারিবারিক জীবনে ইসলামের বিধান সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে সুরা বাকারার ২৩৮ ও ২৩৯ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই দুই আয়াতের অর্থ হ', তোমরা নামাজের প্রতি যত্মবান হবে, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাজের এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীতভাবে দাঁড়াবে। যদি তোমরা শত্রু বা বিপদের আশঙ্কা কর তখন তোমরা পদচারী বা আরোহী অবস্থাতেই পড়। যদি তোমরা নিরাপদ বোধ কর, তবে আল্লাহকে স্মরণ করবে যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা জানতেনা। মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য উপযুক্ত ও নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ জরুরী। যদি খাবার থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে তা অক্ষম বা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তেমনি আমাদের আত্মার উন্নতি ও পূর্ণতা এবং সৃষ্টির উসের সাথে নৈকট্যের জন্য স্রষ্ট্রা অর্থা আল্লাহর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা দরকার। আর এজন্যেই খাবারের মত নামাজ ও দিনে কয়েকবার আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে আমাদের শরীর ও আত্মা সমানতালে পূর্ণতা লাভ করে এবং আমাদের আত্মা অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে সতেজ ও প্রানবন্ত হয়। তাই এই আয়াতে নামাজের বিষয়ে সচেতন থাকার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে এবং সন্ত্রাস ও যুদ্ধের সময় ও এই ওয়াজিব দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যুদ্ধের সময় নামাজকে স্বাভাবিক অবস্থার নামাজের মত আদায় করা সম্ভব নয় বলে ইসলাম বিকল্প পন্থাও দেখিয়ে দিয়েছে। এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তা হ', নামাজ সব সময়ই মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। এমনকি যুদ্ধের ক্ষতি না করে মুজাহিদদেরকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে শক্তিশালী করে।
এবারে সুরা বাকারার ২৪০ থেকে ২৪২ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। এই তিন আয়াতের অর্থ হ', তোমাদের মধ্যে যারা মারা এবং স্ত্রীদেরকে ছেড়ে যায়, তারা যেন স্ত্রীদের বহিষ্কার না করে এক বছর পর্যন্ত তাদের ভরণ পোষণের ওসিয় বা অন্তিম- উপদেশ দিয়ে যায়। কিন্তু তারা যদি নিজেরাই চলে যায় এবং নিজেদের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এর জন্য তোমাদের কোন দোষ নেই, আল্লাহ মহাপরাক্রন্ত বিজ্ঞানময়তালাক প্রাপ্তা নারীদের সম্মানজনক ভাবে ভরণ-পোষণ করা ধর্মভীরূ স্বামীদের কর্তব্য। এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শন স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার। এই আয়াতে পুনরায় পরিবার বিষয়ে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেসব স্ত্রীর স্বামী মারা গেছে বা তালাক প্রাপ্ত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে প্রথম নির্দেশ হ', যদি স্ত্রী মৃত স্বামীর সম্মানার্থে এক বছর পর্যন্ত বিয়ে না করে ও স্বামীর ঘরে থাকতে চায়, তাহলে তাকে উপযুক্ত পন্থায় ভরণ-পোষণ করতে হবে, এবং তাকে তার স্বামীর ঘর থেকে বের করে দেয়ার অধিকার কারো নেই। আর চারমাস দশদিন ইদ্দত বা বৈধব্য পালনের পর যদি স্ত্রী অন্য কোন পুরূষকে বিয়ে করতে চায়, তাহলে সেক্ষেত্রেও স্ত্রীকে বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই। বরং ইদ্দতের পর স্ত্রী তার নতুন স্বামী নির্বাচনে সম্পূর্ণ স্বাধীন। এরপর বলা হয়েছে, মুমিন স্বামীরা যেন বিচ্ছেদের সময় স্ত্রীকে মোহরানা দেয়া ছাড়াও তাকে নিজ সামর্থ অনুযায়ী অর্থ সাহায্য দেয় যাতে তার দুঃখ ও মানসিক তিক্ততা কিছুটা কমে যায়। এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখতে পারি তার সার সংক্ষেপ হ',
প্রথমত : ইসলাম পরিবারে নারীর অধিকার রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। স্বামীর মৃত্যুর পরও নারীর ভরণ-পোষণ এবং এমনকি তালাকের পরও ইসলাম সম্মানজনকভাবে নারীর ভরণ-পোষণ করাকে জরূরী বলে মনে করে।
দ্বিতীয়ত ; নারী তার উপযুক্ত স্বামী নির্বাচনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং পরিবারে মহিলাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
এবারে সুরা বাকারার ২৪৩ ও ২৪৪ নম্বর নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই দুই আয়াতের অর্থ হ', তুমি কি তাদেরকে দেখনি মৃত্যুর ভয়ে যারা হাজারে হাজারে ঘর ছেড়ে চলে
গিয়েছিল। আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেন তোমাদের মৃত্যু হোক। আর তাদের মৃত্যুর পর আল্লাহ তাদেরকে জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনা। তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর, এবং জেনে রাখ তিনি শ্রবণকারী- মহাজ্ঞানী। এই আয়াতে এমন একটি জাতির কাহিনী বলা হয়েছে যারা নিজেদের ধর্ম রক্ষার জন্য শত্রুদের মোকাবেলা করতে প্রস্তুত ছিলনা এবং মৃত্যুর ভয়ে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মৃত্যু যে শুধু যুদ্ধ ক্ষেত্রেই হয়না এটা যে কোন স্থানেই সম্ভব তা বোঝানোর জন্য আল্লাহ তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে পুনরায় জীবিত করেন, যাতে ভবিষ্যতে মানুষ এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়। এরপর মুসলমানদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নাও, মনে রেখ যুদ্ধ থেকে পালানোর অর্থ মৃত্যু থেকে পালানো নয়। বরং যুদ্ধ থেকে পালানোর কারণেই তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি বা মৃত্যু নেমে আসতে পারে। তাই আল্লাহর ধর্মের শত্রুদের বিরূদ্ধে সংগ্রাম কর। আর মনে রেখো, যুদ্ধের ফলে তোমাদের যেসব কষ্ট হয়, আল্লাহ তা জানেন এবং যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্থদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করবেন। এই দুই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তার সারাংশ হ',
প্রথমত : পরকালে মৃত মানুষকে জীবিত করা অসম্ভব কোন বিষয় নয়। আল্লাহ এ পৃথিবীতেই মৃত বিষয়কে অনেকবার জীবিত করেছেন।
দ্বিতীয়ত : ধর্ম যুদ্ধ থেকে হয়তো পালিয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করার চেষ্টা অর্থহীন।
তৃতীয়ত : আল্লাহর ধর্ম রক্ষার জন্য জিহাদ বা ইসলামী ধর্মীয় যুদ্ধের লক্ষ্য দেশের সীমান্ত বৃদ্ধি নয় বা শক্তি-প্রদর্শন কিংবা বলপূর্বক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাও নয়। #

কোরআনের আলো
(
৬৪তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা বাকারার ২৪৫ নম্বর থেকে ২৪৮ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখা নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমে ২৪৪ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হ', কে আল্লাহকে উত্তম ধন দেবে ? তিনি এটা তার জন্য বহুগুন বৃদ্বি করবেন। আল্লাহই মানুষের রিজিক বা আয় বাড়ান ও কমান এবং তাঁরই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে। পূর্ববর্তী আয়াতে জিহাদে অংশ নিতে মুমিনদের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। জিহাদের জন্য জীবন উসর্গ করা ছাড়াও জনগনের অর্থ সাহায্যের প্রয়োজন হয়। তাই এ আয়াতে মুমিনদেরকে আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়ে উসাহিত করার লক্ষ্যে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় হল আল্লাহকে উত্তম ধন দেয়ার। অবশ্য আল্লাহকে ধন দেয়া বলতে শুধু ধর্মযুদ্ধে অর্থ সাহায্য দেয়াকে বোঝায় না, একই সাথে সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিতদের যে কোন সাহায্য দেয়াও এই ধনের অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ দুনিয়ায় ও পরকালে মানুষকে এর বিনিময়ে অনেকগুণ বেশী প্রতিদান দেবেন। কারণ, আমাদের জীবিকার মালিক আল্লাহ । আর যা আমরা আল্লাহর রাস্তায় দান করব আল্লাহ তা হিসাবে রাখবেন এবং সময়মত এর প্রতিদান দেবেন। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হ', রিজিক বা জীবিকার হ্রাস-বৃদ্ধি আল্লাহর হাতে এ কথা মনে রাখলে আমরা খুব সহজেই আল্লাহর পথে দান-খয়রাত করতে পারব। অথবা অন্তত:পক্ষে অন্যকে ধন দিয়ে সাহায্য করতে পারব। কারণ, আমরা আল্লাহর কাছেই এর প্রতিদান পাব। এবারে সুরা বাকারার ২৪৬ ও ২৪৭ নম্বর নিয়ে আলোচনা করব। এই দুই আয়াতের মধ্যে প্রথম আয়াতের অর্থ হ', তুমি কি মুসার পরবর্তী ইসরাইল বংশীয় প্রধানদের পরিনতি দেখনি ? তারা নিজেদের নবীকে বলেছিল আমাদের জন্য একজন নেতা নিযুক্ত যাতে আমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করতে পারি, নবী বললেন এমন তো হতে পারে যে, যখন তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেয়া হবে তখন তোমরা যুদ্ধ করবেনা ? তারা বলেছিল, যখন আমরা আমাদের বাড়ী ঘর ও সন্তানদের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়েছি, তখন আমরা কেন আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবনা ? এরপর যখন তাদেরকে যুদ্ধ করতে বলা হ', তখন তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সবাই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। আল্লাহ অত্যাচারীদের কে ভালভাবেই জানেন।
এবার ২৪৭ নম্বরের অর্থ হ', বনী ইসরাইলদের নবী তাদেরকে বলেছিলেন আল্লাহ তালুতকে তোমাদের সর্দার করেছেন। তারা বলল: সে কিভাবে আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে যখন আমরা নিজেরাই শাসন কাজে তার চেয়ে বেশী যোগ্য এবং তার প্রচুর ধনসম্পদ ও নেই ? নবী বললেন, আল্লাহই তাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনে তাঁকে দৈহিক শক্তি ও জ্ঞানের দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও প্রজ্ঞাময়। হযরত মুসা (আঃ) যুগ শেষ হবার পর বনী ইসরাইলীরা আরাম আয়েশ প্রিয় হয়ে ওঠায় পূনরায় তাদের ওপর তাগুত বা জালেম শক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তারা তাদের ভূ-খন্ড থেকে বিতাড়িত হয়। ফলে তাদের মধ্যে কেউ কেউ উদ্ধাস্তর জীবন থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এ লক্ষ্যে তারা তকালীন নবীর কাছে তাদের জন্য এমন এক নেতা নির্বাচনের আহবান জানায় যে নেতার নেতৃত্বে তারা তাগুতি শ্বাসনের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করবে। যদি ও ঐ নবী বনী ইসরাইলীদের অতীত আচরণের আলোকে এটা জানতেন যে ইহুদীরা যুদ্ধ ও সংগ্রাম করার মত লোক নয়,তবুও তাদের অজুহাত তোলার পথ বন্ধের জন্য তালুত নামের এক দরিদ্র অখ্যাত রাখালকে তাদের সেনা অধিনায়ক করেন। বনী ইসরাইলীরা ভেবেছিল জাতির একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে এ পদে নিয়োগ করা হবে। কিন্তু তাদের এ আশা পূর্ণ না হওয়ায় তারা তালুতের সেনাপতিত্ব মেনে নেয়নি এবং এমনকি তারা তালুতের চেয়ে নিজেদেরকে যোগ্য বলে দাবী করে। অথচ যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও শারীরীক শক্তির দিক থেকে তালুত অন্যদের চেয়ে বেশী যোগ্য ছিল। আর এ কারণেই আল্লাহ তাকে সেনাপতি পদে মনোনীত করেন। এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হ',
প্রথমত : নিজেকে পরিবারকে বা দেশকে রক্ষার জন্য সংগ্রাম আল্লাহর পথে জিহাদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
দ্বিতীয়ত : ধর্ম রাজনীতি থেকে পৃথক নয়। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় আল্লাহর নবীগন মানুষকে অত্যাচারী শাসকদের নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
তৃতীয়ত : দায়িত্ব পালনের সঠিক মানদন্ড হ'ল শারীরিক ও জ্ঞানগত যোগ্যতা, অর্থ-বিত্ত, বংশ-গৌরব বা পদ নয় ।
এবারে সুরা বাকারার ২৪৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। এই আয়াতের অর্থ হ', বনী ইসরাইলীদের কে তাদের নবী বলেছিল, অধিনায়কত্বের জন্য তার যোগ্যতার নিশ্চিত নিদর্শন হ', তোমাদের কাছে একটি সিন্দুক আসবে যার মধ্যে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে শান্তি ও অন্যান্য বিষয়,যা মুসার ও হারুনের সম্প্রদায় ত্যাগ করে গেছে। ফেরেশতারা তা বহন করে আনবে, তোমরা যদি বিশ্বাস স্থাপনকারী হও তবে এর মধ্যে নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য নিদর্শন আছে। যখন অবাধ্য ও একগুঁয়ে বনী ইসরাইলীরা তালুতের নেতৃত্ব মেনে নিতে রাজী হল না, তখন তাদের নবী ইহুদীদেরকে আলাহর নির্দেশ মানতে বাধ্য করার জন্য বলেন। জেনে রাখ, আল্লাহ বনী ইসরাইলের পবিত্র সিন্দুককে তালুতের মাধ্যমে তোমাদের কাছে ফিরিয়ে আনবেন। এটা হ' সেই সিন্দুক বা বাক্স যাতে হযরত মুসা (আঃ)'র মা নবজাতক মুসাকে রেখেছিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে তা নীল দরিয়ায় ভাসিয়ে দেন। এভাবে আল্লাহ মুসাকে ফেরাউনের সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করেন। এরপর শিশু মুসা ফেরাউনের কাছে পৌঁছলে ফেরাউন ও তার স্ত্রীর হৃদয়ে মুসার প্রতি এত ভালবাসা জন্মায় যে তারা মুসাকে নিজেদের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে। এই সিন্দুকটিকে ফেরাউনের দরবারে রাখা হত এবং মুসা (আঃ) যখন নবুওত লাভ করেন তখন তাতে তাওরাত গ্রন্থ রাখা হয়। মুসা (আঃ)'র মৃত্যুর সময় এতে তাঁর বর্মও অন্যান্য স্মৃতি চিহৃ সংরক্ষণ করে তা বনী ইসরাইলের কাছে রাখা হয়। ইহুদীদের কাছে এই গ্রন্থ অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হত। যুদ্ধের সময় এই সিন্দুককে অগ্রভাগে রাখা হত যাতে সেনারা প্রশান্ত ও দৃঢ় চিত্তের অধিকারী হয়। কিন্তু সিন্দুকটি শত্রুদের হস্তগত হওয়ায় ইহুদীরা দু:খিত ও অসন্তুষ্ট ছিল। অবশেষে তালুতের যুগে আল্লাহর সাহায্যের ফলে ঐ সিন্দুকটি পুনরায় ইহুদীদের কাছে ফিরে আসে।সবশেষে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি আমরা যেন স্বদেশ ও নিজ ধর্ম রক্ষার জন্য জীবন ও সম্পদ ত্যাগ করতে দ্বিধান্বিত না হই।আর সমাজের নেতা নির্বাচনের জন্য আমরা যেন ব্যক্তির জ্ঞান ও যোগ্যতাকে সব সময় প্রাধান্য দেই। পার্থিবও ক্ষণস্থায়ী বিষয়কে যেন এক্ষেত্রে প্রাধাণ্য না দেই। #



1 2 3 next