মহররম : তরবারির ওপর রক্তের বিজয়ের মাস

ইন্টারনেট

মহররম : তরবারির ওপর রক্তের বিজয়ের মাস

 

১ম পর্ব

 

কারবালার ঐতিহাসিক দিনগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যে আবারো আমাদের সামনে এসেছে মুহাররাম। মুহাররাম আমাদেরকে ত্যাগের শিক্ষা দেয়। একই ভাবে তা আমাদেরকে পার্থিব জগতের মোহ ভুলে কণ্টকাকীর্ণ সত্য-সঠিক পথে চলার দিক-নির্দেশনা দেয় এবং আমাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত ঈমানী দায়িত্ব পালনের জন্যে ভয়-ভীতিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সত্যের পতাকা ওড়ানোর শিক্ষা দেয়।

হিজরি ষাট সালের কথা। খুব বেশিদিন হয়নি ইয়াযিদ তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। দুঃখজনকভাবে ইয়াযিদ অট্টহাসি দিয়ে বেড়াচ্ছে, মদ পান করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তার দৃষ্টির গভীরে উদ্বেগের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। তার মনে পড়ে যায় পিতা মুয়াবিয়ার কথা। তাকে চার জনের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছিল। বলেছিলঃ ঐ চারজনের তিনজনকে ভয় দেখিয়ে, প্রতারণার মাধ্যমে কিংবা পদের লোভ দেখিয়ে হয়তো প্রতারিত করা যাবে অর্থাৎ তাদেরকে তাদের লক্ষ্যচ্যুত করা যাবে। কিন্তু হোসাইন ইবনে আলির সাথে তা করা যাবে না। কেননা হোসাইন রাসূলে খোদার আদর্শে বড়ো হয়েছে। তার বিশাল অন্তরাত্মার কাছে সম্মান এবং মর্যাদার গুরুত্ব বা মূল্যই দুনিয়াবি স্বার্থের তুলনায় সবচেয়ে বড়ো।

অন্য জায়গায় মদিনার গভর্নর ওয়ালিদ তার শাসনকার্য পরিচালনার কেন্দ্রে বসে বসে আরো উন্নত ও উচ্চ আসনে আসীন হবার স্বপ্ন দেখছে। হঠাৎ ইয়াযিদের একটি চিঠি পেয়ে সে সম্বিৎ ফিরে পায়ঃ
ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে মদিনার শাসক ওয়ালিদ ইবনে উৎবাকে জানানো যাচ্ছে যে মুয়াবিয়া মৃত্যুবরণ করেছে এবং আমাকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছে। এখন তোমার প্রথম কাজটি হলো লোভ দেখিয়ে হোক কিংবা শক্তি প্রদর্শন করেই হোক, মদিনাবাসী বিশেষ করে হোসাইন ইবনে আলির কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করো। যে বা যারা বাইয়াত করবে না তার গলা কেটে মাথাটা আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।'

ওয়ালিদ কিন্তু রাসূলের সন্তান হোসাইন (আ) কে ভালো করেই জানতো। তাই বিরুক্তির সাথে বললোঃ যদি মরে যেতাম এবং এই দৃশ্য যদি আমাকে দেখতে না হতো...কিন্তু তার এই দুঃখবোধ দ্রুতই উবে গেল। ইমাম হোসাইন (আ) ওয়ালিদের আমন্ত্রণে তার বাসায় গেলেন। ওয়ালিদ তাঁকে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর কথা জানায় এবং ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত করার বিষয়টি উত্থাপন করে। ইমাম হোসাইন (আ) তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেনঃ আমি জানি আমার পরোক্ষ বা গোপন বাইয়াতে তোমরা সন্তুষ্ট হবে না, তোমরা চাও আমি প্রকাশ্যে ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত করি।' ওয়ালিদ ভেবেছিল সে সফল হয়েছে। তাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললোঃ হ্যাঁ! ঠিক তাই। ইমাম হোসাইন (আ) বললেনঃ আগামিকাল আমার অপেক্ষায় থেকো, লোকজন নিয়ে তোমার কাছে আসবো। এমন সময় মদিনার সাবেক গভর্নর মারওয়ান ইবনে হাকাম-যে কিনা নবীবংশের প্রকাশ্য শত্রু-সে ওয়ালিদকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বললোঃ হোসাইনকে এই ঘর থেকে বের হতে দিয়ো না। এখানেই তার শিরোচ্ছেদ করো, নৈলে তাকে আর পাওয়া যাবে না।

হোসাইন (আ) বললেনঃ কে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে? শোনো! ইয়াযিদের মতো একজন ফাসেক এবং নষ্ট লোকের হাতে বাইয়াত করার মতো রাসূলের বংশের কাউকে পাওয়া যাবে না। ইয়াযিদ সম্পর্কে যে কথাটি এখন বলেছি সেই কথাটাই কাল সকালে লোকজনের সমাবেশে পুনরায় বলবো।-এই বলে ভয়ঙ্কর নিরবতার মধ্য দিয়ে ইমাম হোসাইন (আ) ধীর স্থিরভাবে দৃপ্ত পদভারে ওয়ালিদের ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

পরদিন ফজরের নামায তিনি আদায় করলেন নানা হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মাযারের পাশে। তাঁর মনে পড়ে যায় নবীজী তাদেঁর দু'ভাইকে দেখলেই খুশি হয়ে যেতেন এবং মিম্বারে বসে বলতেনঃ হাসান এবং হোসাইন হচ্ছে বেহেশতে যুবকের নেতা।' মদিনার দিকে শেষ দৃষ্টি দিয়ে তাকালেন। হিজরি ষাট সালের রজব মাসের ২৮ তারিখ, ইমাম হোসাইন (আ) পরিবার পরিজন নিয়ে মক্কার দিকে রওনা দিলেন। ইমাম তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানিফাকে একটি ওসিয়্যতনামা লেখেন :
বিসমিল্ল... .....রাহিম। এটি হোসাইন ইবনে আলির ওসিয়্যতনামা। আমি মদিনা থেকে চলে যাচ্ছি। আমার এই যাওয়া শান্তি সুখের সন্ধানে নয়, নয় কোনো ভয়-ভীতির কারণে। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে নানা মুহাম্মাদ (সা) এর দ্বীনের সংস্কার করা। আমি যেখানেই থাকি না কেন, জনগণকে কল্যাণের দিকে ডাকবো এবং মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবো....।'



1 2 3 4 5 6 next