মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি -১

ইন্টারনেট


মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি (১-২০ পর্ব)

 

 শ্বের সমৃদ্ধতম সভ্যতাগুলোর একটি হচ্ছে মুসলিম সভ্যতা। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে এই সভ্যতার উৎপত্তি হয়েছে। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সভ্যতা গড়ে উঠেছে যুক্তির উপর ভিত্তি করে। মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আরও বেশি আলোচনার লক্ষ্যে আমরা নতুন এই ধারাবাহিকের আয়োজন করেছি। এই ধারাবাহিকে মুসলিম সভ্যতার বিকাশ, চড়াই-উৎরাই এবং এ সভ্যতা বিকাশের পথ-পরিক্রমা সম্পর্কে আলোচনা স্থান পাবে।

প্রথম পর্ব

ইসলাম ধর্ম বিশ্বকে এমন এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থা উপহার দিয়েছে যা গোটা মানব জাতি বিশেষ করে মুসলমানদের চীর ঋণী করে রেখেছে। কিন্তু সমৃদ্ধ এই মুসলিম সভ্যতার অবদান সম্পর্কে বর্তমান তরুণ সমাজ খুব একটা অবহিত নয়। এ কারণে তরুণ সমাজসহ বিশ্বের জ্ঞান অন্বেষীদের জন্য মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে তুলে ধরার অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। নিজের অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাও প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। নিজের পূর্বসুরীরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে কোন পর্যায়ে এবং কোন অবস্থানে ছিলেন, সে সম্পর্কে জানতে পারলে সামনের দিকে পথচলা আরও সহজতর হয়। এছাড়া, নিজের অতীত সম্পর্কে তথ্য ও জ্ঞান নয়া প্রজন্মের মানুষের ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতি গঠনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপনিবেশবাদীরা গত দুই শতাব্দী ধরে সব সময় বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠী বিশেষকরে মুসলমানদের মৌলিকত্ব, মর্যাদা ও কর্মক্ষমতাকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। উপনিবেশবাদী পাশ্চাত্য, বিশ্ববাসীকে এটা বুঝানোর চেষ্টা করছে যে, পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকে ধারন করা ছাড়া অন্যদের আর কোন উপায় নেই।

প্রাচ্যের দেশগুলোর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করার পেছনে পাশ্চাত্যের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো, প্রাচ্যের দেশ ও জাতিগুলোর নানা অর্জনকে অস্বীকার করে তাদের সব উন্নয়ন, অগ্রগতি ও অর্জনকে নিজেদের অর্জন হিসেবে তুলে ধরা। পাশাপাশি মুসলমানদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি ঠেকানোও তাদের অশুভ উদ্দেশ্যের অংশ। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাফিয়ী সার্বেস্তানি মনে করেন, পশ্চিমারা বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ স্থাপন করে উন্নত প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এবং এখন তারা এই প্রযুক্তি ও শক্তি দিয়ে গোটা বিশ্বে নিজেদের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। পাশ্চাত্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে পাচ্যের উপর নিজেদের রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

পাশ্চাত্য নিজেদের ভূখণ্ডকে মানব সভ্যতার লালন ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি অন্যদের উপর নিজেদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তাদের এসব অপতৎপরতা মোকাবেলার জন্যে ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অত্যধিক। সভ্যতাগুলোর মধ্যে সংঘাতের তত্ত্ব প্রদানকারী মার্কিন তাত্ত্বিক স্যামুয়েল হান্টিংটন এটা স্বীকার করেছেন যে, পাশ্চাত্য, বিশ্বকে নয়া সমাজ ব্যবস্থার দিকে পরিচালিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন সভ্যতার মানুষকে পাশ্চাত্যপন্থী হিসেবে গড়ে তুলছে। তার মতে, এর ফলে তারা নিজেদের ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ, আচার-আচরণ ও অভ্যাস ত্যাগ করে পাশ্চাত্যকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করছে।

বর্তমানে পশ্চিমারা মুসলিম সভ্যতার উন্নতি ও উৎকর্ষ বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে রাজনৈতিক আধিপত্য সুসংহত করার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকেই পাশ্চাত্য বিশ্বের নেতৃত্ব পুরোপুরি করায়ত্ত করার নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে। কোন কোন দেশ ও জাতি এ ধরনের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে রাজনৈতিক আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করার কৌশল বেছে নেয়। বিশেষকরে তারা মুসলিম দেশগুলোতে সুকৌশলে ও ক্রমান্বয়ে পশ্চিমা-সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তারা এটা ভালো করেই জানে যে, সাংস্কৃতিক প্রভাব থাকলে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সহজতর হয়। মার্কিন গবেষক ও লেখক এডওয়ার্ড বার্মান বলেছেন, পশ্চিমারা, গণযোগাযোগ মাধ্যম, মিডিয়া এবং রকফেলার,কার্নেগি ও ফোর্ডের মতো বাহ্যত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে উন্নয়নশীল সমাজে বিশেষ ধরনের চিন্তা-বিশ্বাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা এর মাধ্যমে বিশ্ব পরিস্থিতি ও জীবন সম্পর্কে মানুষের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গীতে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে।

আমরা নতুন এই ধারাবাহিকে মূলত মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করবোকাজেই এখানে সংক্ষেপে মুসলিম সভ্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত হবার কারণ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা দরকার। মুসলিম সভ্যতা গড়ে উঠার ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মুসলিম সভ্যতা হচ্ছে জীবন্ত ও গতিময় এক সভ্যতা এবং এই সভ্যতা সময়ের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। আর এ ধরনের গতিময় সভ্যতা যে কোন কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। মুসলিম সভ্যতাও শুরু থেকে আজ পর্যন্ত নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এমনকি বারবার বিজাতীয় আগ্রাসনের শিকার হবার পরও কখনোই পাশ্চাত্যের কাছে নতিস্বীকার করেনি। তাছাড়া, ইরানি, মিশরীয় ও আরব সংস্কৃতির মতো বিভিন্ন স্থানীয় সংস্কৃতিকে টিকে থাকার সুযোগ দেবার কারণে মুসলিম সভ্যতা ক্রমেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্রে সমৃদ্ধ হয়েছে। অথচ পাশ্চাত্য সভ্যতা সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে ধ্বংস করে সকল সংস্কৃতিকে একীভুত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে এটা সুস্পষ্ট যে, এখানে সকল সংস্কৃতিই গুরুত্ব পেয়েছে এবং স্বকীয়তা বজায় রাখতে পেরেছে। মুসলিম সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রেও এই বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডোরান্ট সভ্যতা ও সভ্য সমাজের সংজ্ঞা তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন," সভ্যতা হলো সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতা, যা সামাজিক শৃঙ্খলা, আইনী শাসন ও তুলনামূলক জনকল্যাণের মধ্য দিয়ে অস্তিত্ব লাভ করে। সভ্যতা হচ্ছে জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সমুন্নিতর ফসল। আর যে সমাজ, সামাজিক শৃঙ্খলা সাধন করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন, অগ্রগতি ও মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধির কথা ভাবে, সেই সমাজই সভ্য সমাজ।"



1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 next