তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান-১

রেডিও তেহরান

( ৬ষ্ঠ পর্ব )

কোরআনের আলোর এ পর্বে আমরা সূরা বাকারার ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম আয়াত নিয়ে আলোচনা করবোএর আগের আয়াতগুলোয় মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছেসূরা বাকারার ৫ম আয়াতে বলা হয়েছে-"ঐ মুমিন ব্যক্তিরা তাদের প্রতিপালকের নির্দেশিত পথে রয়েছে এবং তারাই সফলকাম।" এই আয়াতে পরহেযগার ব্যক্তিদের পরিণাম "সফলতা" বলে বর্ণনা করা হয়েছেতারা আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলেই এ সফলতায় পৌঁছায়

সফলতা মানে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত হওয়া এবং নৈতিক উকর্ষ অর্জনআরবী ভাষায় কৃষককে বলা হয় "ফাল্লাহ্‌"কারণ কৃষক তার পরিশ্রমের মাধ্যমে মাটির তলদেশ থেকে বীজের অঙ্কুরোদ্‌গম এবং ফসল বেড়ে ওঠার ব্যবস্থা করে সফলতা মানুষের পূর্ণতার সর্বোচ্চ পর্যায়কারণ কোরআনের আয়াত অনুযায়ী সৃষ্টিজগত মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছেমানুষ এবাদতের জন্য এবং এবাদত হলো তাকওয়ায় পৌঁছার জন্যআর এ আয়াতে বলা হয়েছে মুত্তাকী ও পরহেযগার ব্যক্তিরা সফলকাম হবেনএ আয়াত আমাদেরকে দুটি প্রধান বিষয় শিক্ষা দেয়প্রথমত: কল্যাণ ও সৌভাগ্যবান হতে হলে আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুযায়ী চলতে হবেআর দ্বিতীয়ত: চেষ্টা ছাড়া কল্যাণ অর্জন সম্ভব নয়জ্ঞান ও বিশ্বাসের যেমন দরকার আছে তেমনি কাজ ও উত্তম আমলেরও প্রয়োজন আছে

সূরা বাকারার ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তুমি তাদেরকে সতর্ক কর বা না কর, তাদের পক্ষে উভয়ই সমানতারা ঈমান আনবে না।"মুত্তাকী ও পরহেযগার ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার পর এই আয়াতে কাফেরদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছেসত্য প্রত্যাখ্যানকারী কাফেররা বিরুদ্ধাচরণ করতে করতে এমন বিদ্বেষী হয়ে পড়ে যে সত্য কথা তাদের মধ্যে কোন প্রভাব ফেলে না এবং তারা ঈমান আনে নাআরবী ভাষায় কুফর' শব্দের অর্থ হলো ঢেকে ফেলা, উপেক্ষা করাসুতরাং কাফের মানে ঐ ব্যক্তি যে সত্য গোপন করে এবং সত্যকে উপেক্ষা করেআল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে সব মানুষ ঈমান আনতে বাধ্য হতোকিন্তু চাপিয়ে দেয়া বিশ্বাসের কোন মূল্য নেইআল্লাহই চান মানুষ যাতে স্বেচ্ছায় ঈমান আনেতাই সব মানুষ পরহেযগার, ঈমানদার ও মুত্তাকী হয়ে যাবে-এমনটি আশা করা আমাদের উচি নয়সূরা বাকারার ৬ নম্বর আয়াত থেকে আমরা যে কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করছি তা হলো-প্রথমত: কুফরী, বিদ্বেষ- মানুষকে পাথরের মত কঠিন করে ফেলেতাই কোন উপদেশ বা ভালো কথাও তার মধ্যে কোন প্রভাব ফেলেনাআর দ্বিতীয়ত: যদি মানুষ সত্য গ্রহণে ইচ্ছুক না হয় তাহলে নবীদের আহ্বান কাজে আসবে নানবীদের আহ্বান হলো বৃষ্টির মতযদি উর্বর মাটিতে পড়ে তাহলে ফুল ফোটে, আর যদি নোনা ও শক্ত মাটিতে পড়ে তাহলে জংলী আগাছা আর কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড় জন্মায়তৃতীয়ত: যদিও আমরা জানি যে কাফেররা ঈমান আনবে না, কিন্তু তবুও আমাদের দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে এবং তাদেরকে সদুপদেশ দিতে হবে

সূরা বাকারার ৭ম আয়াতে বলা হয়েছে-"আল্লাহ তাদের হৃদয় ও কান মোহর করে দিয়েছেনতাদের চোখের উপর আবরণ আছে এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।" মানুষ হিসাবে কাফেরদেরও বিবেক-বুদ্ধি, চোখ ও কান আছেকিন্তু খারাপ কাজ, অযৌক্তিক বিদ্বেষ, একগুঁয়ে ও হিংসার কারণে এমন পর্দা সৃষ্টি হয় যে তারা সত্য দেখা, শোনা ও উপলদ্ধির শক্তি হারিয়ে ফেলেএটি হলো দুনিয়াতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য নির্ধারিত শাস্তিআর তাছাড়া কেয়ামতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন শাস্তিএখানে একটি প্রশ্ন দেখা দেয়, আর তা হলো আল্লাহ যদি নিজেই কাফেরদের চোখ,কান বন্ধ করে দেয় তাহলে খোদাদ্রোহিতার ক্ষেত্রে তাদেরতো কোন দোষ নেই? কারণ তারা বাধ্য হয়েই কাফের হয়েছেনএ প্রশ্নের উত্তর খোদা কোরআনেই স্পষ্টভাবে দিয়েছেসূরা মুমিনের ৩৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও অত্যাচারী ব্যক্তির হৃদয় মোহর করে দেন।" সূরা নিসার ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"সত্য প্রত্যাখ্যানের জন্য আল্লাহ তাদের হৃদয় মোহর করে দিয়েছেনপ্রকৃত পক্ষে এসব আয়াতে মানুষ সম্পর্কে আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছেযদি মানুষ সত্যের সামনে ঔদ্ধত্য, গর্ব ও একগুঁয়েমি দেখায় তাহলে শেষ পর্যন্ত তার সত্যকে চেনার শক্তি লোপ পাবে, সত্যকে সে উল্টো দেখতে পাবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন পরিণতির শিকার হবে

সূরা বাকারার ৭ম আয়াতের দুটি প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হলো-কেউ জেনে শুনে সত্য প্রত্যাখ্যান করলে আল্লাহপাকও তার অন্তর্চক্ষু ঢেকে দেন এবং এটি আল্লাহর শাস্তিএছাড়াও জীব-জন্তুর উপর মানুষের মর্যাদার কারণ হলো তার বিবেক-বুদ্ধি, উপলদ্ধি ক্ষমতা এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গীকিন্তু মানুষ সত্য প্রত্যাখ্যান এবং আল্লাহ ও তার নিদর্শনাবলী অবিশ্বাসের মাধ্যমে এই মর্যাদা হারিয়ে ফেলে#

 

( ৭ম পর্ব )

কোরআনের আলো অনুষ্ঠানের এ পর্বে আমরা সূরা বাকারার ৮, ৯ ও ১০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবসূরা বাকারার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- "মানুষের মধ্যে এমন লোক আছে যারা বলে-আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসীঅথচ তারা বিশ্বাসী নয়।" হেদায়েত বা পথপ্রদর্শনের গ্রন্থ কোরআন আমাদের জন্য মুমিন, কাফের ও মুনাফেকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেযাতে আমরা নিজেদের সম্পর্কেও জানতে পারি যে, কোন দলে আছি এবং অন্যদেরকেও চিনতে পারিএ ভাবে সচেতনভাবে আমরা সমাজের সদস্যদের সাথে উপযুক্ত আচরণ করতে পারি

সূরা বাকারার প্রথম থেকে এ পর্যন্ত ৪টি আয়াতে মুমিনদের এবং দুটি আয়াতে কাফেরদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছেএ আয়াত এবং পরবর্তী আয়াতগুলোয় তৃতীয় একটি দলের পরিচয় বর্ণনা করা হয়েছেপ্রথম দলের সদস্যদের মধ্যে যে ঈমানী নূর রয়েছে তাও এ দলের সদস্যদের মধ্যে নেইআবার দ্বিতীয় দলের সদস্যদের মতো ঔদ্ধত্য এদের মধ্যে নেই এ তৃতীয় দলের সদস্যদের অন্তরে কোন ঈমান নেই এবং মুখেও এরা খোদাদ্রোহিতামূলক কিছু প্রকাশ করে নাএরা ভীতু মুনাফিক যারা কিনা অন্তরের অবিশ্বাস ও কুফরী গোপন করে রাখে এবং বাহ্যিকভাবে ইসলামের দাবী করে



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 next