তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান-১

রেডিও তেহরান

এ আয়াতের প্রথম শিক্ষণীয় দিক হলো-আমরা সৃষ্টি জগতে যে একটি ব্যবস্থা বিরাজ করছে তা স্বীকার করিতবে মনে করি এ হলো আল্লাহর প্রজ্ঞার নিদর্শন এবং এসব তারই ইচ্ছার অধীনতাই আমরা আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করি; প্রকৃতির হাতে বন্দী নইআর এমনকি বস্তুগত বিষয়েও তার সাহায্য প্রার্থনা করিএ আয়াত থেকে আরেকটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রত্যেক নামাজে যদি আমরা গভীর উপলদ্ধির সাথে বলি যে, আমরা কেবল তোমারই বান্দা; তাহলে আমাদের মধ্য থেকে গর্ব, অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য দূর হয়ে যাবে #

 

( ৩য় পর্ব )

কোরআনের আলোর গত দুই পর্বে আমরা সূরা হামদের এক থেকে ৫ম আয়াত নিয়ে আলোচনা করেছিতাতে আল্লাহপাক নিজেকে পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু, প্রতিপালক ও সব কিছুর মালিক বলে পরিচয় দিয়েছেন এবং তিনি আমাদের ভালো ও মন্দ কাজের উপযুক্ত প্রতিদান দেবেনআর আমরাও ঘোষণা দিয়েছি যে আমরা একমাত্র তাঁর কাছে মাথা নত করি, কেবল তাঁর উপর নির্ভর করি এবং তাঁরই উপর ভরসা করি

এবারে আমরা এ সূরার ৬ষ্ঠ ও ৭ম আয়াত নিয়ে আলোচনা করবোসূরা হামদের ছয় নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-অর্থা "হে আল্লাহ্‌! আমাদেরকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত কর।" মানুষের জীবন যাপনের জন্য বিভিন্ন পথ রয়েছেব্যক্তি তার নিজস্ব চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পথ বেছে নিতে পারেসমাজ ও জনগণের চলার পথ, পূর্বপুরুষদের অনুসৃত পথ, জনগণের জন্য অত্যাচারী শাসক ও তাগুতী শক্তির পক্ষ থেকে নির্ধারিত পথএকটি পথ হলো দুনিয়ার যাবতীয় রং, রুপ ও সৌন্দর্য উপভোগ করাআবার অন্য একটি পথ হলো সমাজ জীবন থেকে বেরিয়ে একাকিত্ব ও নি:সঙ্গতা বেছে নেয়াএত সব পথের মধ্যে সঠিক পথ বেছে নেয়ার জন্য মানুষের কি পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন নেই? আল্লাহ পাক মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য নবী রাসূল ও আসমানী কিতাব পাঠিয়েছেনতাই মানুষ যদি পবিত্র কোরআন, রাসূলে খোদা(সা:) ও আহলে বাইতের অনুসরণ করে তাহলে সঠিক পথের সন্ধান পাবেতাইতো আমরা প্রত্যেক নামাজে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যাতে তিনি আমাদেরকে সরল, সঠিক পথে পরিচালিত করেন যে পথে কোন ক্ষতি ও বিভ্রান্তি নেই, তিনি যাতে ঐ পথে আমাদেরকে পরিচালিত করেনসরল পথ হলো মধ্যম পথসরল পথ মানে সব কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বন এবং যেকোন ধরনের বাড়াবাড়ি বর্জন অনেকে মূলনীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শীকার হয় এবং অনেকে কর্মক্ষেত্রে ও নৈতিক ক্ষেত্রে ভুল পথে চলে যায়অনেকে আবার সব কাজের জন্য আল্লাহকে দায়ী করে; যেন পরিণতির ব্যাপারে মানুষের কোন হাত নেইকেউ আবার সব কাজে নিজের ক্ষমতাকে চূড়ান্ত মনে করে যেন সৃষ্টি জগতের কাজ-কর্মে আল্লাহর কোন হাত নেইঅনেক কাফের আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ নবী-রাসূলদেরকে সাধারণ মানুষ এমনকি পাগল বলেও আখ্যায়িত করেছিলঅনেক বিশ্বাসী ব্যক্তি আবার হজরত ঈসা(আ:)এর মত নবীকে খোদার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলএ ধরনের চিন্তা ও আচরণের অর্থ হলো রাসূল এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যূত হওয়াপবিত্র কোরআন আমাদেরকে আর্থ-সামাজিক কাজ-কর্ম ও এবাদতের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেযেমন সূরা আঁরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঅর্থা "তোমরা খাও এবং পান করোতবে অপব্যয় করোনা।" সূরা আসরা বা বনী ইসরাইলের ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে অর্থা "নামাজে স্বর উঁচুও করো না আবার অতিশয় ক্ষীণও করো নাবরং এ দুইয়ের মধ্য পন্থা অবলম্বন করএকই ভাবে সূরা ফুরকানের ৬৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থা "মুমিন ব্যক্তিরা যখন দান করে তখন তারা অপব্যয় করে না আবার কার্পণ্যও করে নাবরং তারা এ দুইয়ের মধ্যপন্থা অবলম্বন করেইসলাম ধর্মে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের উপর অত্যন্ত জোর দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, "পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করো।" আবার সেখানে এও বলা হয়েছে যে, "তারা যদি তোমাকে মিথ্যা পথে পরিচালিত করতে চায় তবে তাদের আনুগত্য করবে না।" যারা কেবল সমাজ থেকে বেরিয়ে একাকি এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হয় কিংবা শুধু মানব সেবাকে এবাদত বলে, তাদের ধারনার জবাবে পবিত্র কোরআন নামাজ ও জাকাতকে পাশাপাশি বর্ণনা দিয়ে বলেছে, " তোমরা নামাজ কায়েম কর এবং জাকাত আদায় কর।" এর একটি স্রষ্টার সাথে সম্পর্কিত এবং অন্যটি মানুষের সাথে সম্পর্কিত এবাদতপ্রকৃত মুমিন হলো তারা- যাদের আকর্ষণও রয়েছে এবং বিকর্ষণও রয়েছেসূরা ফাতেহার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, "মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা:) এবং তাঁর অনুসারীরা সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীলসূরা ফাতেহার ৬ নম্বর আয়াত থেকে যে বিষয়গুলো শিক্ষণীয় রয়েছে , তাহলো-সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথই হলো কল্যাণের পথকারণ আল্লাহর সরল পথ অপরিবর্তনিয় কিন্তু মানব রচিত পথগুলো প্রতিদিন পরিবর্তীত হয়অন্যদিকে দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে নিকটবর্তী পথ হলো সরল পথ এবং এই পথ একাধিক নয়সরল সোজা পথে কোন বাঁক নেই এবং সবচেয়ে কম সময়ে এ পথ তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেআর সুরা "হামদ" এর ৬ নম্বর আয়াতের শেষ শিক্ষা হলো-সরল সঠিক পথ নির্বাচন এবং এ পথে টিকে থাকার জন্য আল্লার কাছে সাহায্য চাওয়াকারণ আমরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে পারিএ যাবত জীবন চলার পথে কোন বিভ্রান্তির মধ্যে না পড়লেও এটা কখনোই ভাবা ঠিক নয় যে পরবর্তী জীবনেও সঠিক চলতে পারবোআমাদের মধ্যে এমন কত লোকই না আছে যারা সারা জীবন মুমিন ছিলেন কিন্তু যখন অর্থ-সম্পদ বা কোন পদ লাভ করেছেন তখন খোদাকে ভুলে গেছেসরল সঠিক পথ চেনা কঠিন কাজতাই পরবর্তী আয়াতে এ পথের বাস্তব আদর্শ এবং যারা ঐ পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে তাদের পরিচয় আমাদের সামনে তুলে ধরেসূরা ফাতেহার ৭ম আয়াত হলো- হে আল্লাহ! আমাদেরকে ঐ ব্যক্তিদের পথে পরিচালিত কর, যাদের তুমি অনুগ্রহ দান করেছোতাদের পথে নয় যারা ক্রোধের শিকার এবং পথভ্রষ্ট

জীবন চলার পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে মানুষ ৩টি দলে বিভক্তএক দল আল্লাহর পথ বেছে নেয় এবং আল্লাহর দেয়া জীবন-বিধান অনুযায়ী নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করেএ দল সবসময় আল্লাহর রহমত, অনুগ্রহ ও দয়া লাভ করেপ্রথম দলের বিপরীতে আরেকটি দল রয়েছে যারা সত্য চেনার পরও আল্লাহকে ছেড়ে গায়রুল্লাহকে বেছে নিয়েছে এবং নিজের কামনা-বাসনা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজন ও সমাজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার উপর প্রাধান্য দেয়এ দলের লোকদের মধ্যে তাদের কৃতকর্মের প্রভাব ধীরে ধীরে গেঁড়ে বসে এবং তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়তারা আল্লাহর সান্নিধ্য এবং দয়া লাভের পরিবর্তে ধ্বংসের অতল গহ্বরে পতিত হয়, আর আল্লাহর গজবের মধ্যে পড়েএই আয়াতে এ দলকে "মাগদুবি আলাইহিম" বা ক্রোধ নিপতিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছেতৃতীয় আরেকটি দল রয়েছে যাদের কোন সুনির্দিষ্ট পথ নেই এবং কোন্‌ পথে চলবে তা ঠিক করতে পারেনিতারা দিকভ্রান্ত এবং বিভ্রান্ত এ আয়াতে তাদেরকে "দা'ল্লিন" বা পথভ্রষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছেতারা প্রতিদিন একেক পথ বেছে নেয় কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছতে পারে নাআমরা প্রত্যেক নামাজে যে বলি- "হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন কর, তাদের পথ যাদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করেছোনবী-রসূল, ওলী-আওলীয়া ও স কর্মশীলদের পথেতাদের পথে আমাদেরকে পরিচালিত করোনা যারা মানবতা থেকে দূরে সরে গেছে, তোমার ক্রোধের শিকার, দিক-ভ্রান্ত এবং একেক দিন একেক রুপ ধারণ করেএখানে একটি প্রশ্ন জাগে, তাহলো-ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট কারা? এর উত্তর হলো পবিত্র কোরআনে বহু দল ও ব্যক্তিকে পথভ্রষ্ট ও ক্রোধের শিকার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছেআমরা এখানে একটি স্পষ্ট উদাহরণ পেশ করবো

কোরআনে বনি ইসরাইলের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে এবং হজরত মূসা(আ:) কিভাবে তাদেরকে ফেরাউনের নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন তারও বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছেবনী ইসরাইল বংশের লোকেরা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলায় আল্লাহ তাদেরকে ঐ যুগের সব মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেনএ সম্পর্কে সূরা বাকারার ৪৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"আমি তোমাদেরকে বিশ্বে সবার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।" কিন্তু এই বনী ইসরাইল জাতিই তাদের আচরণের জন্য আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে- "তারা আল্লাহর গজবের শিকার হয়েছে"কারণ ইহুদী পুরোহিতরা আসমানী গ্রন্থ তৌরাতের বিধান বিকৃত করেছিলতাদের মধ্যে যারা ব্যবসায়ী ও ধনী তারা সুদ গ্রহণ ও হারাম ব্যবসায় নিয়োজিত হয়েছিলএত সব বিকৃতি ও অন্যায় সত্ত্বেও বনী ইসরাইল জাতির ভালো লোকেরা নিরবতা অবলম্বন করে এবং কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় নাতাই শেষ পর্যন্ত এ জাতি সম্মান ও মর্যাদার শীর্ষ থেকে অপমান ও ধ্বংসের মধ্যে পতিত হয়#

 

(৪র্থ পর্ব ) সূরা বাকারা

কোরআনের আলোর গত কয়েক পর্বে আমরা পবিত্র কোরআনের সূরা ফাতেহা নিয়ে আলোচনা করেছিলামএবারে পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় সূরা বাকারা নিয়ে আলোচনা করা যাক



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 next