তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান-১

রেডিও তেহরান


১৮ তম পর্ব

কোরআনের আলো অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছিআজকের পর্বে আমরা সূরা বাকারার ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবসূরা বাকারার ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"এরপর শয়তান, আদম ও তার স্ত্রীকে পথভ্রষ্ট করলো এবং তারা যে বেহেশতে ছিল সেখান থেকে তাদেরকে বহিস্কৃত করলসে সময় তাদেরকে বললাম তোমরা নীচে নেমে যাও একে অন্যের শত্র" হিসাবেপৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইলগত পর্বেও আমরা হজরত আদম(আঃ) এর সৃষ্টির ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছিতখন বলেছিলাম আল্লাহপাক হজরত আদম ও বিবি হাওয়ার জন্য বেহেশতের মত একটি বাগানে বসবাসের ব্যবস্থা করেছিলেনসেখানে তাদের জন্য সব ধরণের খাবার ও ফলমূলের ব্যবস্থা করা হয়শুধু নিষেধ করা হয় একটি বিশেষ গাছের ফল খেতেকারণ ঐ ফল ছিল তাদের জন্য ক্ষতিকর এবং তাদের আত্মার উপর জুলুমের শামিল

কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে শয়তান হযরত আদমকে সেজদা না করায় আল্লাহ তাকে তার দরবার থেকে বহিষ্কার করেনআর এজন্য শয়তান প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠেতার সব রোষ গিয়ে পড়ে হযরত আদম(আঃ)এর উপরশয়তান প্রতিশোধ নেয়ার চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেযেভাবেই হোক হযরত আদমকে শান্তিপূর্ণ ও আরামের স্থান থেকে বহিষ্কার করবে বলে ঠিক করলোযেমন ভাবা তেমন কাজশয়তান নানা কূটবুদ্ধি, ওয়াস-ওয়াসা ও চাল চেলে বুঝালো সে হযরত আদম আর বিবি হাওয়ার মঙ্গল চায়ঐ নিষিদ্ধ ফলের সীমাহীন প্রশংসা আর উপকারীতা বর্ণনার ফলে একসময় সত্যি সত্যিই হযরত আদম আর বিবি হাওয়া শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে ফেললেনশেষ পর্যন্ত শয়তানের কুমন্ত্রনায় তারা ঐ নিষিদ্ধ ফল খেলেনহযরত আদম(আঃ) এবং বিবি হাওয়ার অবশ্য আল্লাহর নির্দেশ আমান্য করার কোন উদ্দেশ্য ছিল নাকিন্তু তাদের অবস্থা ছিল অনেকটা ঐ শিশুর মত, যারা কিনা মিথ্যা, ধোকাবাজি ও কুটকৌশলের কোন অভিজ্ঞতাই নেইশিশু যেমন সবাইকে স সত্যবাদী মনে করে তেমনি সৃষ্টির প্রথম মানব হযরত আদম ও প্রথম মানবী বিবি হাওয়া শয়তানকে সত্যবদী ভেবে বসলশয়তান যখন কসমের পর কসম খেয়ে তাদেরকে নিষিদ্ধ করার ফলে উপকারীতা ও গুনাগুন বর্ণনা করলো তখন তারা তাকে সরল শিশুর মত বিশ্বাস করে ধোকা খেলআল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার ফলে তারা বেহেশত থেকে বহি®কৃত হলোআল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো তোমরা আল্লাহর দরবার থেকে নীচে নেমে যাওশয়তান ও তোমরা শত্র"তে পরিণত হয়েছো এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে পৃথিবীতে বসবাস করতে হবেআদমকে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীতে তার খেলাফত বা প্রতিনিধিত্ব করাতাই হযরত আদমকে পৃথিবীতে আসতেই হতোএজন্য আল্লাহপাক প্রথমে তার জন্য সমস্যামুক্ত শান্তিপূর্ণ একটি স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা করলেন, যাতে তিনি পৃথিবীতে আগমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পরেন পৃথিবীর অবস্থার সাথে পরিচিত হন এবং প্রকৃত শত্র" অর্থা শয়তানকে ভালোভাবে চিনতে পারেন
সূরা বাকারার ৩৬ নম্বর আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
প্রথমত:শয়তানের আনুগত্য মানুষকে শুধু আল্লাহর কাছ থেকেই দুরে সরিয়ে নেয়না, একই সাথে মানুষকে প্রকৃত শান্তি থেকেও বঞ্চিত করে এবং তাকে নানা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে ফেলেযেমনটি হযরত আদম ও বিবি হাওয়ার জীবনে লক্ষ্য করা যায়

দ্বিতীয়ত: মানুষের সাথে শয়তানের শত্রুতার ইতিহাস অতি প্রাচীন এবং সৃষ্টির সূচনা থেকে শুরু হয়ে এখনও তা চলছে

তৃতীয়ত: পৃথিবী মানুষের অস্থায়ী আবাসতাই বেহেশতে স্থায়ী আবাস গড়ার চিন্তায় ব্যস্ত থাকতে হবে
চতুর্থত: আল্লাহর দেয়া অশেষ যোগ্যতা ও প্রতিভার কারণে প্রত্যেক মানুষই বেহেশতীকিন্তু স্রষ্টার নির্দেশ অমান্য করার ফলে সে অতল গহ্বরে গিয়ে পড়ে

পঞ্চমত: কোন মানুষ পাপ ও ভ্রান্তি থেকে মুক্ত নয়যদি না আল্লাহ তাকে হেফাজত করেনযে আদম পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা এবং ফেরেশতাদের সাহচায লাভ করেছেন সেই হজরত আদম(আঃ) মুহূর্তের গাফলতীর জন্য আল্লাহর দরবার থেকে বহি®কৃত হন অবশ্য হজরত আদম(আঃ) এর এই ভুল ছিল তার নবুয়্যত লাভের আগের ঘটনা

এবারে সূরা বাকারার ৩৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাকএ সূরা বলা হয়েছে-"এরপর আদম তার প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু শিক্ষা লাভ করলএরপর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেননিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল দয়াময়।"
সেই শান্তিময় স্থান থেকে বহি
®কৃত হয়ে কষ্টকর পৃথিবীতে নেমে আসার পর আদম তার ভুল এবং শয়তানের ধোকা বুঝতে পারলেনতাই তিনি অনুশোচনা করতে লাগলেন এবং কিভাবে তওবা করা যায় সে পথ খূজতে লাগলেনএখানেও আল্লাহপাক হজরত আদমকে অসহায়ভাবে ছেড়ে দিলেন নাতিনি হজরত আদমকে তওবা এবং অনুশোচনা করার ভাষা শিক্ষা দিলেনসেই বাণী সূরা আরাফের ২৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছেবলা হয়েছে-"তারা বলল হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছিযদি তুমি আমাদের ক্ষমা না কর, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভক্ত হবো।"

এই ভাষা কেবল হযরত আদম(আঃ) এর তওবার জন্যেই নির্দিষ্ট নয় বরং হযরত ইউনুস ও হযরত মুসা(আঃ)এর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়যেমন কোরানে হযরত মুসা(আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে-"তিনি বললেন-হে আমার প্রতিপালক,আমি আমার নিজের উপর জুলুম করেছি তুমি আমায় ক্ষমা কর।"
অবশ্য হযরত আদম(আঃ) তার তওবা কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর শিখিয়ে দেয়া শাফায়াতকারীদের নাম উচ্চারন করেনএ সম্পর্কে বিখ্যাত আলেম আল্লামা সুয়ূতি(রঃ) তার লেখা দোরুল মানসুর তাফসীর গ্রন্থের প্রথম খন্ডের ৬০ পৃষ্ঠায় বেশ কিছু হাদীস উল্লেখ করেছেনসেসব হাদিসে এসেছে যে হযরত আদম(আঃ) আল্লাহর কাছে তার তওবা কবুল হওয়ার জন্য হযরত মোহাম্মদ(সাঃ) এবং তার বংশধরদেরকে উসিলা হিসাবে উপস্থাপন করেহজরত ইবনে আব্বাস(রঃ) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে-"আদম(আঃ) আল্লাহর কাছে হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) এবং তার আহলে বাইতকে উসিলা হিসাবে তুলে ধরেন যাতে তার তওবা কবুল হয়।" শাব্দিকভাবে তওবার অর্থ প্রত্যাবর্তনএ শব্দটি যখন মানুষ সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়, তখন তার অর্থ হলো পাপ কাজ থেকে প্রত্যাবর্তনআর যখন তওবা শব্দটি আল্লা সম্পর্কে ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হলো আল্লাহর দয়া ও রহমত ফিরে আসা
অর্থা মানুষের পাপ কাজের কারণে আল্লাহ তার দয়া ফিরিয়ে নেয়ার পর মানুষ যখন পাপ কাজ থেকে প্রত্যাবর্তন করে তখন আল্লাহ পুনরায় দয়া ফিরিয়ে দেনআল্লাহপাক নিজে তাওয়াব বা ক্ষমাশীলযেমন সূরা বাকারার ২২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"তাই আল্লাহর দয়া সম্পর্কে মানুষের নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেইতওবা ও ক্ষমা প্রার্থনাকারীরা থাকলে আল্লাহর দয়া করুণার ধারাও থাকবে অবিরাম
সূরা বাকারার ৩৭ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় করেকটি বিষয় হচ্ছে-
প্রথমত: মানুষের তওবা করার তওফিক যেমন আল্লাহর হাতে তেমনি কিভাবে তওবা করা উচিত সেই পথও পেতে হবে আল্লাহর কাছ থেকেতাই এ আয়াতে হজরত আদম(আঃ)এর তওবা সম্পর্কে বলা হয়েছে তওবার ভাষা ও শব্দ আল্লা তাকে শিখিয়েছেন

দ্বিতীয়ত: মানুষের তওবা যদি সত্যিকার তওবা হয় তাহলে আল্লাহ তা কবুল করবেনকারণ তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াময়

তৃতীয়ত: আল্লাহপাকের ক্ষমা হলো দয়া ও ভালোবাসায় সিক্তএতে নেই কোন অপমান এবং নেই কোন ভর্সনা
চতুর্থত: যদি আমরা কোন সময় তওবা করে তা ভঙ্গ করি এবং পুনরায় পাপে লিপ্ত হই, তারপরও আল্লাহর করুনা থেকে নিরাশ হতে নেইকারণ তিনি তাওয়াব বা তওবা গ্রহণকারীযদি আবারও আমরা তওবা করি তাহলে তিনি আমাদের তওবা কবুল করে নেবেন



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 next