তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান-১

রেডিও তেহরান


এবারে সূরা বাকারার ৩৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাকএ আয়াতে বলা হয়েছে-"মহান আল্লাহ বললেন হে আদম! এদের সবার নাম বলে দাওযখন সে তাদের এসব নাম বলে দিল, তিনি বললেন-আমি কি তোমাদের বলিনি যে নিশ্চয়ই আমি আকাশ ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ে অবগত আছি এবং তোমরা যা প্রকাশ কর ও গোপন কর তাও আমি জানি।"

আল্লাহর পরীক্ষায় আদম সফলভাবে উত্তীর্ণ হলেন এবং ঐশী শিক্ষার আলোকে সৃষ্টিজগতের সকল রহস্য ফেরেশতাদের কাছে বর্ণনা করলেনফলে ফেরেশতারা বুঝতে পারলেন যে, মহান আল্লাহ মানুষকে শিক্ষার যোগ্যতা ও ক্ষমতা দিয়েছেন, আর তারা এ যোগ্যতা থেকে বঞ্চিতএ পরীক্ষা শেষ হবার পর, মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা ভেবেছিলে ঐশী প্রতিনিধিত্ব পাবার পুরোপুরি যোগ্য কেবল তোমরাইতোমরা এ ধারণা মনের মধ্যে লালন করছিলেকিন্তু কখনও তা প্রকাশ করোনিজেনে রাখো মহান আল্লাহ যেমনিভাবে তোমাদের প্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে জানেন, তেমনি তোমাদের অন্তরের কথাও তিনি জানেন সৃষ্টি জগতের সব কিছুই তারই আওতাধীনমহান আল্লাহ মানুষ ও প্রতিটি বস্তুর প্রকাশ্য ও গোপন দিক সম্পর্কে ভালোভাবে অবগতএ আয়াতে এ বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ যেহেতু বিশ্ব প্রকৃতির গূঢ় রহস্য সম্পর্কে অবহিত নয় এবং শুধু মাত্র বাহ্যিক দিকটিই দেখতে পায় কাজেই আল্লাহর সিদ্ধান্তে সে যেন অযথা বিচলিত না হয় এবং কোন বিরুপ মনোভাব পোষণ না করেকেননা মহান আল্লাহ সীমাহীন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী এবং সে মোতাবেক প্রতিটি কাজ করেনএ বিশ্ব জগতের কোথাও যদি মানুষের কাছে কোন কিছু অসামঞ্জস্য মনে হয়, তা মূলত মানুষের অজ্ঞতা প্রসূতআল্লাহর কাজে কোন খুঁত নেইএ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-

প্রথমত: মানুষ জ্ঞান ও শিক্ষার দিক থেকে ফেরেশতাদের উর্ধ্বেমানুষের শেখার ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু ফেরেশতাদের এ বৈশিষ্ট্য নেইফলে আদম(আঃ) যে সব কথা বলতে পেরেছিলেন, ফেরেশতারা তা বলতে পারেননি
দ্বিতীয়ত: যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রমাণের জন্য পরীক্ষার প্রয়োজনমহান আল্লাহ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও মানুষের কাছে তা প্রমাণ করার জন্য পরীক্ষার আয়োজন করেছেন
তৃতীয়ত: ফেরেশতারা অদৃশ্য জগত সম্পর্কে ঠিক ততটুকুই জানেন, মহান আল্লাহ তাদের যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেনকেননা আগের একটি আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-"আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।" আর এ আয়াতে বলেছেন-"আমি পৃথিবী ও আকাশের অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছি
চতুর্থত: মানুষের প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র তৈরী করা উচিতমহান আল্লাহ পরীক্ষার আয়োজন করে আদম(আঃ)এর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন যাতে মানুষ তার যোগ্যতা সম্পর্কে অবগত হয় এবং অন্যরাও তা বুঝতে পারে


১৭তম পর্ব

কোরআনের আলো অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছিআজ আমরা সূরা বাকারার ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবসূরা বাকারার ৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"যখন ফেরেশতাদেরকে বললাম তোমরা আদমের প্রতি সিজদা কর, ইবলিশ ছাড়া সবাই সিজদা করলো, সে অমান্য ও অহংকার করলো এবং অবিশ্বাসীদের অন্তর্ভূক্ত হল।"

আগের আয়াতগুলোতে মানুষের প্রতি মহান আল্লাহর বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক নেয়ামত এবং সুযোগ সুবিধার কথা এক এক করে উল্লেখ করা হয়েছেবলা হয়েছে মানুষের বিশেষ মর্যাদার করণেই তাকে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব দেয়া হয়েছেআর এ আয়াতে মানুষের জন্য একটি মর্যাদা বা শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছেআর সেটা হচ্ছে আদমের প্রতি ফেরেশতাদের সিজদার বিষয়টি যেমনটি সূরা স্বোয়াদ এবং সূরা হেজরে রয়েছে, মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির সময় ফেরেশতাদের সম্বোধন করে বলেছেন-"যখন আমি মানুষকে সুগঠিত করবো, তখন তার মধ্যে স্বীয় প্রাণ সঞ্চার করবোএরপর তোমরা তার সামনে সেজদাকারীরূপে প্রণত হইওকাজেই বোঝা যাচ্ছে, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের জন্য ফেরেশতারা মানুষকে সেজদা করেননি, বরং মানব হিসাবে সৃষ্টির কারণেই তাকে সিজদা করেছিলেনআদমের উপর ঐশী প্রতিনিধিত্ব অর্পন করার পর যদি মহান আল্লাহ সেজদার নির্দেশ দিতেন তাহলে সেটা ফেরেশতাদের জন্য গৌরবের কারণ হতো নাকারণ তখন তারা আদমের বিশেষ মর্যাদার কারণেই তার সামনে মস্তক অবনত করতেনআল্লাহর নির্দেশ পালন করাটা তাদের জন্য মূখ্য হয়ে উঠতো নাসূরা কাহাফের ৫০ নম্বর আয়াতের আলোকে বলা যায়, জ্বীন সম্প্রদায়ের ইবলিস একনিষ্ঠ ইবাদতের কারণেই ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছিলকিন্তু অহংকার ও আত্মম্ভরীতার কারণে সে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেসে ভেবেছিলো সৃষ্টির দিক থেকে সে আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা মর্যাদাবানকাজেই আদমকে সেজদা করা তার জন্য মোটেই শোভনীয় নয় বরং আদমের উচিত তাকে সেজদা করাইবলিস কেবল কাজের ক্ষেত্রেই আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে পাপ করেনি বরং ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকেও সে আল্লাহর নির্দেশকে ইনসাফহীন ও অবিবেচনা প্রসূত ভেবে কুফরী করেছে এবং ইমান হাতছাড়া করেছেফেরেশতারা উপাসনার উদ্দেশ্যে আদমকে সিজদা করেননিকারণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করা বৈধ নয়বরং তারা আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য আদমের সম্মানার্থে সিজদা করেছেনকাজেই ফেরেশতারা মূলত আল্লাহকেই সেজদা করেছেনএবারে সূরা বাকারার ৩৪ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো তুলে ধরছি
প্রথমত: আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য কোন কাজ করাই প্রকৃত ইবাদতআল্লাহর যে নির্দেশ বা বিধান মানুষের মনপুত: হবে, তা পালনের মাধ্যমে ইবাদত সম্পন্ন হয় না ইবলিস কয়েক শতাব্দী ধরে আল্লাহর সামনে মস্তক অবনত করতে প্রস্তুত ছিলো, কিন্তু আদমের সামনে মূহুর্তের জন্যও সেজদা করতে রাজি হয়নি
দ্বিতীয়ত: সমস্ত ফেরেশতা মানুষকে সিজদা করবে অথচ মানুষ আল্লার সামনে সেজদা করবে না, এটা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়

তৃতীয়ত: স্রষ্টার সামনে অহঙ্কার ও আত্যম্ভরীতা করলে মানুষ বেঈমান ও ধর্মহীন হয়ে পড়ে
চতুর্থত: আল্লাহর নির্দেশে অন্য কারো সামনে সেজদা করা শিরক তো নয়ই বরং ইবাদতের শামিল
পঞ্চমত: বয়স এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার চেয়ে যোগ্যতা ও ক্ষমতা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ফেরেশতারা যুগ বা কালের দিক থেকে অনেক পুরনো হওয়া সত্ত্বেও আদমকে সিজদা করেছেন
ষষ্ঠত: আদমকে সেজদার উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তি আদমকে সেজদা করা নয় বরং মানব জাতির সামনে নত হওয়াযেমন সূরা আরাফের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের রূপদান করি, অতপর ফেরেশতাদের বলেছিলাম আদমকে সেজদা কর।"

এবারে সূরা বাকারার ৩৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"আমি বললাম হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং সেখান থেকে যা ইচ্ছা তাই খাওকিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়োনা, অন্যথায় তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেমহান আল্লাহ পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধিত্বের জন্য মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীতে জীবন ধারণের জন্য প্রথমেই তার জন্য সঙ্গিনীও সৃষ্টি করেনযাতে আদমের প্রশান্তির পাশাপাশি পৃথিবীতে মানবজাতির বংশ বিস্তার ঘটেতিনি তাদের জন্য সুন্দর দুটি বাগানও তৈরী করেন, যাতে সেখানে তারা বসবাস করতে পারেন এবং নানা রকম খাদ্যেরও সংস্থান হয়এভাবে মহান প্রতিপালক হযরত আদমের জন্য পৃথিবীতে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করেন যাতে ধীরে ধীরে তারা এসবের ব্যবহার করতে শেখেসব খাবার দাবারই মানুষের জন্য উপকারী নয়তাই মহান আল্লাহ, বিশেষ কিছু খাবার দাবার বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেনকেননা এসব ফল-মূল বা খাবার খেলে দেহের ক্ষতির পাশাপাশি, মানুষের আত্মারও ক্ষতির আশঙ্কা ছিলএমনকি বেহেশত থেকে বহিস্কারের সম্ভাবনা ছিলকাজেই বোঝা যাচ্ছে হযরত আদম যে বেহেশতে ছিলেন সেটা পরকালের প্রতিশ্রুত বেহেশত নয়কেননা ঐ বেহেশত মূলত: ভলো কাজের প্রতিদান দেবার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছেআর তাছাড়া হযরত আদম(আ:) তখনও কোন ভালো কাজ করেননি তাই প্রতিদান পাওয়ার অর্থই হয়নাযেমন সূরা আল ইমরানের ১৪২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-"তোমরা কি মনে কর যে তোমরাই বেহেশতে প্রবেশ করবে এবং যারা জিহাদ করে এবং যারা ধৈর্যশীল, আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে এখনও তাদেরকে প্রকাশ করেননি?"
যারা প্রতিশ্রুত বেহেশতে প্রবেশ করবেন তারা সেখান থেকে বহিস্কৃত হবেন নাযেমনটি সূরা হিজরের ৪৮ নম্বর আয়াতে রয়েছে-"তারা জান্নাত থেকে বহিস্কৃত হবেন না।" এছাড়া প্রতিশ্রুত বেহেশতে নিষিদ্ধ গাছের কোন অস্তিত্ব নেই সেখানকার সবকিছু হালাল এবং বৈধপৃথিবীর বিভিন্ন সবুজ শ্যামল বাগানের ক্ষেত্রেও মহান আল্লাহ জান্নাত' শব্দটি ব্যবহার করেছেনকাজেই কেবলমাত্র পরকালের প্রতিশ্রুত বেহেশতের জন্যই জান্নাত' শব্দটির ব্যবহার হয়নাসূরা ক্বালামের ১৭ নম্বর আয়াতে রয়েছে-"আমি ওদের পরীক্ষা করবো, যেভাবে পরীক্ষা করেছিলাম উদ্যান অধিপতিদেরকে" সূরা বাকারার ৩৫ নম্বর আয়াতের শিক্ষনীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
প্রথমত: স্ত্রী, বাসস্থান, ও খাদ্য হচ্ছে পৃথিবীতে মানুষের আরাম-আয়েশ ও প্রশান্তির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত স্বরূপ

দ্বিতীয়ত: গৃহে নারী, পুরুষের অধীনএ আয়াতে সব ক্ষেত্রে হযরত আদম ও হাওয়াকে উদ্দেশ্য করে সব কিছু বলা হয়েছেকিন্তু বাসস্থানের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র হযরত আদমকে সম্বোধন করা হয়েছে, আর তার স্ত্রী হাওয়াকে তার সাথে উল্লেখ করা হয়েছেযেমন বলা হয়েছে, হে আদম আপনি নিজ সহধর্মিনীর সাথে জান্নাতে বসবাস করুণ

তৃতীয়ত: কোন জিনিস নিষিদ্ধ ঘোষণা করার আগে সেই প্রয়োজন মেটাবার সঠিক পথ দেখিয়ে দিতে হবেমানুষের খাদ্যের প্রয়োজনএজন্যই মহান আল্লাহ প্রথমে হযরত আদম ও বিবি হাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের ব্যবস্থা করার পর তাদেরকে একটি বিশেষ বৃক্ষের ফল গ্রহণ করতে নিষেধ করেন
চতুর্থত: গুনাহ বা পাপ এত বিপদ জনক যে, তা থেকে দূরে থাকা উচিতআর এজন্যই মহান আল্লাহ, এ বিশেষ বৃক্ষটি খেয়োনা এর পরিবর্তে বলেন
অর্থা এ বৃক্ষের কাছে যেয়ো না
পঞ্চমত: আল্লাহর নিষিদ্ধ কোন কাজ করলে তার ক্ষতি মূলত: মানুষেরই হয়আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা নিজের উপর জুলুম করারই শামিলএর ফলে মানুষকে আল্লাহর নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হতে হয়
ষষ্ঠত: খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষকে পুরোপুরি আল্লাহর অনুগত হতে হবেআল্লাহ যেসব খাবার মানুষের জন্য উপকারী ও বৈধ করেছেন তাই খাওয়া উচিতআর যেসব খাবার নিষিদ্ধ করেছেন, সেসব বর্জন করা উচিত#



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 next