তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান-১

রেডিও তেহরান


( ১৫তম পর্ব )

কোরআনের আলো অনুষ্ঠানে আমরা সূরা বাকারার ২৯ ও ৩০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবোসূরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেনএরপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দেন এবং তা সপ্ত আকাশে বিন্যস্ত করেনতিনি সব বিষয়ে সবিশেষ অবহিতমহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করার পর, আমাদের আরাম আয়েশের জন্য সব উপকরণের ব্যবস্থা করেছেনতিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করে তা, মানুষের জন্য উসর্গ করেছেনকেননা মানুষই হচ্ছে খোদার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি কাজেই জমিন ও আসমানের সকল জীব-জন্তু, গাছপালা এবং সব জড় বস্তুকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছেআর এ জন্যই পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে-"এ ভূপৃষ্ঠের সব কিছুই মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।" এছাড়া সুরা জাসিয়ার ১৩ নম্বর আয়াতেও বলা হয়েছে-"মহান আল্লাহ আসমান ও জমিনের সমস্ত কিছু তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন।"

মহান আল্লাহর একত্ববাদের একটি অন্যতম দলিল হচ্ছে, আকাশের অত্যন্ত জটিল ও সুসমন্বিত গঠন প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা আকাশের এ জটিল সৃষ্টি রহস্য উদ্ঘাটনের ব্যাপারে অক্ষমতা প্রকাশ করেছেনএ ভূপৃষ্ঠ যেখানেই নানা রকম উদ্ভিদ, গাছপালা, জীব-জন্তু, হাজার রকমের ফল-ফলাদি ও বহু ঐশ্বর্যের সমাহার দেখা যায়, তা হচ্ছে অতি ক্ষুদ্র একটি গ্রহপবিত্র কোরআন এ ক্ষেত্রে এক বচন (আল আরদ্) শব্দটি ব্যবহার করেছেতবে আসমানের ক্ষেত্রে কোরআনের বহু আয়াতে বহু বচনের প্রয়োগ দেখা যায়যেমন একটি আয়াতে রয়েছে-"মহান আল্লাহ বিশেষ প্রজ্ঞা ও শক্তির মাধ্যমে সপ্ত আসমান সৃষ্টি করে, তা মানুষের অধীন করে দিয়েছেন।" পবিত্র কোরআনের মতে আকাশ হিসাবে মানুষ যা দেখতে পায় তা মূলত: আকাশের সবচেয়ে নীচের স্তরআকাশের অন্য একটি স্তর মানুষের নাগালের বাইরেএ আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হচ্ছে-
প্রথমত: মানুষ সৃষ্টির সেরা জীবএ বিশ্বজগত মূলত: মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে
দ্বিতীয়ত: মহান আল্লাহ এ সৃষ্টিজগতকে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন, কাজেই আমাদের উচিত একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য করা

তৃতীয়ত: এ বিশ্বপ্রকৃতির কোন কিছুই অযথা সৃষ্টি করা হয়নি বরং প্রতিটি বস্তুকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যদিও এর অনেক কিছুর উপকারীতা সম্পর্কে মানুষ এখনও অজ্ঞ
চতুর্থত: এ পৃথিবী মানুষের জন্যমানুষকে পৃথিবীর জন্য সৃষ্টি করা হয়নিএ পৃথিবী লক্ষ্যস্থল নয় বরং এটি অতিক্রম করার স্থান মাত্র

পঞ্চমত: প্রকৃতির যে কোন ঐশ্বর্যকে কাজে লাগাতে কোন বাধা নেইতবে ঐশী বিধান কিংবা মানুষের বিবেক বুদ্ধি যদি কোন কিছুকে মানুষের জন্য অকল্যাণকর মনে করে, তবে তা ব্যবহার করা বৈধ নয়

এবারে সূরা বাকারার ৩০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাকএ আয়াতে বলা হয়েছে-"যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন নিশ্চয়ইই আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করবো, তারা বললো আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যারা অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? আমরাইতো আপনার প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করিতিনি বললেন আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।"

আগের আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষের জন্য অফুরন্ত বস্তুগত ঐশ্বর্য্য প্রেরণার কথা বলেছেনআর এ আয়াতে মানুষ যে বিশেষ মর্যাদার কারণে এতসব নেয়াতম ও সুযোগ সুবিধার অধিকারী হয়েছে তা বর্ণনা করা হয়েছেমহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদেরকে আদমের বিশেষ মর্যাদা ও গুণাবলী সম্পর্কে অবহিত করে এবং জানায় যে মানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি করা হয়েছেকিন্তু এ কথা শুনে ফেরেশতারা উকণ্ঠা প্রকাশ করে বলে, যার সন্তানরা পৃথিবীতে রক্তপাত ঘটাবে এবং অশান্তি সৃষ্টি করবে, তাকে কিভাবে আল্লাহর প্রতিনিধি বানানো যাবে?

ফেরেশতাদের প্রস্তাব ছিল, মহান আল্লাহ যদি একান্তই পৃথিবীতে তার প্রতিনিধি পাঠাতে চায় তাহলে এমন একজনকে নির্বাচন করা উচি যে সব ধরণের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত এবং আল্লাহর একান্ত অনুগত হবেআর এ জন্যই আদম বা মানুষের কথা শুনে ফেরেশতারা বিষ্মিত হয়কারণ মানুষের প্রবণতা এবং সহজাত গুণাবলী সম্পর্কে তারা অবহিত ছিলআর এ কারণেই ফেরেশতারা যারা সর্বক্ষণ আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন তাদের পরিবর্তে কেন মানুষকে এ মর্যাদা দেয়া হলো, তারা তা জানতে চানফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তরে মহান আল্লাহ বলেন-"তোমরা কেবল দুর্বল দিকগুলো দেখেছো, মানুষের মর্যাদা ও বিশেষ গুণাবলী সম্পর্কে তোমরা অজ্ঞআমি যা জানি তোমরা তা জানো নাতোমরা ফেরেশতারা সর্বক্ষণ আমার ইবাদত ও প্রশংসায় মশগুল থাকার কারণে যদি নিজেদেরকে আমার প্রতিনিধি হবার যোগ্য মনে কর, তবে জেনে রাখো মানুষের মধ্যেও এমন অনেকে রয়েছেন যারা তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং মর্যাদা লাভের যোগ্য।"
তবে এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, প্রতিটি মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি নয়আল্লাহর প্রতিনিধি হবার অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহ যিনি মানুষের মধ্যে নিজ রুহ ফুঁকে দিয়েছেন, তাকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে আল্লাহর প্রতিনিধি হবার সব ধরণের যোগ্যতা ও সামর্থ রয়েছেএ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো নবী-রাসূল, ইমামগণ, শুহাদা এবং স ব্যক্তিরাএমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যারা এ ঐশী প্রেরণাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে, মানবতার সর্বনিু স্তরে গিয়ে পৌঁছায় পবিত্র কোরআন এ ধরণের লোকদের সম্পর্কে বলেছে-"তারা হচ্ছে চতুষ্পদ জন্তুর মতো, এমনকি তার চেয়ে নীচু ও নিকৃষ্টমানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে নির্ধারণ করার অর্থ এই নয় যে, মহান আল্লাহ এ পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে অক্ষম বরং এর মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে ওঠেমহান আল্লাহ নিজেই এ পৃথিবীর সকল কাজ পরিচালনা করতে সক্ষম হলেও তিনি বিভিন্ন সরঞ্জামের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করেন যেমন ফেরেশতাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে-"এ বিশ্বজগত পরিচালনার দায়িত্ব তাদের, অথচ মহান আল্লাহই হচ্ছেন প্রকৃত পরিচালক।" এ আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-

প্রথমত: সৃষ্টিজগতে মানুষের মর্যাদা এত উপরে যে মহান আল্লাহ মানুষের সৃষ্টি বা মানুষকে তার প্রতিনিধি বানাবার বিষয়টি ফেরেশতাদের কাছে উত্থাপন করেছেন

দ্বিতীয়ত: প্রতিনিধি নিয়োগের পুরো দায়িত্ব মহান আল্লাহর অন্য কারো নয়
তৃতীয়ত: কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থা হলো, প্রশ্ন উত্থাপন করা এবং পরে তার বর্ণনা দেয়ামহান আল্লাহ মানব সৃষ্টি এবং মানুষকে তার প্রতিনিধি বানাবার ক্ষেত্রে এ পন্থা প্রয়োগ করেছেন এবং এ সম্পর্কে ফেরেশতাদের অজ্ঞতা দূর করেছেন



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 next