তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান-১

রেডিও তেহরান

সূরা বাকারার ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"নিশ্চয়ইই মহান আল্লাহ মশা কিংবা তারচেয়ে বড় উপমা দিতে সংকোচ বোধ করেন নাসুতরাং যারা বিশ্বাসী তারা জানে যে, এ সত্য উপমা তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে এসেছে এবং যারা অবিশ্বাস করে তারা বলে এই উপমাতে আল্লাহর অভিপ্রায় কি? এর দ্বারা তিনি অনেককেই বিভ্রান্ত করেন, আবার বহু লোককে স পথে পরিচালিত করেনকিন্তু অস লোক ছাড়া তিনি কাউকে বিভ্রান্ত করেন না।"

ইসলামের বিরুদ্ধবাদী কাফেররা যখন পবিত্র কোরআনের অনুরুপ একটি গ্রন্থ রচনা করতে ব্যর্থ হলো, তখন তারা কোরআনের উপমাগুলোকে বাহানা হিসাবে ব্যবহার করতে লাগলতারা বললো, এ সব উপমা থেকে মহান সৃষ্টিকর্তার স্থান অনেক উর্ধ্বে সৃষ্টিকর্তা মশা, মাছি ও মাকড়সার মত তুচ্ছ উপমা দিতে পারেন না, এসব মানুষেরই কাজ আসলে ইসলামে অবিশ্বাসী কাফেররা আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তাকেই বিশ্বাস করতো নাএ সব কথা বলার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য ছিল কোরআন ও পয়গম্বরের উপর মুসলমানদের বিশ্বাসকে নড়বড়ে করে দেয়া এবং তাদের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়াতা ছাড়া পবিত্র কোরআনের সব উপমাই এ ধরণের নয়যেমন এর আগে মুনাফিক বা কপট ব্যক্তিদেরকে অন্ধকারে আলোহীন বিপদ সংকুল পথে আটকে পড়া পথিকের সাথে তুলনা করা হয়েছেআর উদাহরণ বা উপমা ব্যবহারের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাস্তব অবস্থাকে সুস্পষ্ট করে তোলাযখন কেউ দুর্বল প্রতিপক্ষের বর্ণনা দিতে চায়, তখন কোন দুর্বল বস্তু বা প্রাণীর উপমা দিয়ে তার বর্ণনা তুলে ধরেযেমন পবিত্র কোরআনের সুরা হজ্জ্বের ৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের উপাসনা কর তারা তো কখনও একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এমনকি এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্রিত হলেওএবং মাছি যদি কিছু নিয়ে চলে যায় তাও তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না।"
সূরা বাকারার ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"আল্লাহপাক মাছি বা তারচেয়ে ছোট প্রাণীকে উপমা হিসাবে ব্যবহার করতে সংকোচ বোধ করেন নাকেননা উপমাতো কেবল বাস্তব অবস্থাকে সুস্পষ্ট করে বোঝাবার জন্যতাই মানুষের জন্য অধিক বোধগম্য বিষয়কেই উপমা হিসাবে ব্যবহার করা উচিউপমা বা উদাহরণের ক্ষেত্রে মশা বা বিশাল হাতির মধ্যে কোন পার্থক্য নেইযেটা বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাই ব্যবহার করা উচিঅবশ্য পবিত্র কোরআনের উপমাগুলো সম্পর্কে দুই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন মানুষ দেখা যায়এর মধ্যে যারা সত্য সন্ধানী এবং কোরআনের উপমাগুলোর নিগূঢ় তত্ত্ব উপলদ্ধি করতে সক্ষম তারা এ সব উপমা থেকে সত্যের সন্ধান লাভ করেন এবং বস্তুজগতের নিগূঢ় তত্ত্ব তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়অপর দিকে যাদের অন্তর পবিত্র কোরআন ও ইসলামের মহান নবীর প্রতি হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতায় পূর্ণ তারা পবিত্র কোরআনের অর্থ উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হয় এবং কোরআন ও পয়গম্বরের ব্যাপারে দোদুল্যমনার কারণে ঐশী পথ নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে

এ আয়াত দুটি থেকে কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-কোন গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন বিষয় সব সময় সহজ ভাষায় বর্ণনা করা উচি যাতে সাধারণ মানুষও ভালো করে বুঝতে পারে এবং মহান আল্লাহর ক্ষেত্রেও এ কাজ দোষণীয় নয় পবিত্র কোরানে অত্যন্ত বাস্তব ভিত্তিক উপমা ব্যবহার করা হয়েছেএ জন্য কখনো কোন প্রাণীকে, আবার কখনো প্রকৃতির কোন ঘটনা যেমন বৃষ্টি ও বজ্রপাতকে উপমা হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছেগুনাহ বা পাপ মানুষকে সত্য উপলদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে এবং বিভ্রান্তি ও বিপথগামীতায় নিমজ্জিত করেমহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে সবই সত্য ও বাস্তব পথ প্রাপ্তি বা বিপথগামীতা ঐ মহা সত্যের ব্যাপারে মানুষের প্রতিক্রিয়ার ফল


(১৪ তম পর্ব)

কোরআনের আলো অনুষ্ঠানের এ পর্বে আমরা সূরা বাকারার ২৭ও ২৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবতো চলুন প্রথমেই সূরা বাকারার ২৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাকএ আয়াতে বলা হয়েছে-"যারা আল্লাহর অঙ্গীকারে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যা অক্ষুন্ন রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"
আগের আয়াতে ফাসেক লোকদের বিভ্রান্তির কথা বলা হয়েছিল, আর এ আয়াতে ফাসেকদের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে

প্রথমত: তারা আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এবং নিজেদের কামনা বাসনা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করেএ আয়াতে আল্লাহর অঙ্গীকার বলতে মানুষের অন্তরে ঐশী বিশেষ প্রেরণার কথা বোঝানো হয়েছেমহান আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে এই সহজতর ঐশী প্রবণতাসহ সৃষ্টি করেছেন এর মাধ্যমে মানুষ ভালো-মন্দ ও সত্য-মিথ্যা বিচার করতে পারে এবং নবীদের আহ্বানে সাড়া দিতে পারেদ্বিতীয়ত: মহান আল্লাহ যে সব অঙ্গীকার রক্ষা করতে বলেছেন ফাসেক ব্যক্তি তা ভঙ্গ করেএসব অঙ্গীকার নবী রাসূলদের সাথে ধর্মীয় অঙ্গীকারই হোক বা অপরাপর মুমিন ব্যক্তিদের সাথে সামাজিক কিংবা আত্মীয় স্বজনদের সাথে পারিবারিক প্রতিশ্রুতিই হোক মন্দ কাজও অনাচারের বি¯তৃতি ঘটায়তারা মনে করে তাদের পাপের প্রতিফল কেবল তারাই ভোগ করবে, অথচ তারা জানে না পাপের সামাজিক প্রভাব ব্যক্তিক প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশী পাপ ও অনাচার সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়এটা অত্যন্ত স্পষ্ট, যে ব্যক্তি এশী অঙ্গীকার এবং মানুষের সাথে তার প্রতিশ্রুতি ও সম্পর্কের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না এবং নিজের খেয়াল খুশীমত কাজ করে, সে নিজেরই ক্ষতি বয়ে আনেকারণ সে তার পার্থিব এবং ঐশী সম্পদ দুটিই হাত ছাড়া করে এবং পরিণামে অপমান ও অপদস্থ হয়সূরা বাকারার ২৭ নম্বর আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে-
প্রথমত: অঙ্গীকার ভঙ্গ করা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি অপছন্দনীয় কাজমুমিন ব্যক্তি কখনও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেনা, এমনকি কাফেরদের সাথেও সে তার অঙ্গীকার রক্ষার ব্যাপারে সচেষ্টআল্লাহর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার কথা সে চিন্তাও করেনা

দ্বিতীয়ত: বিচারবুদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তির রায়কে উপেক্ষা করলে মানুষ সাধারণতঃ পাপে লিপ্ত হয় এবং সমাজ পাপ-পঙ্কিলতায় ভরে ওঠে ইসলামের বিধি-বিধান ও সহজাত ঐশী প্রবণতাকে উপক্ষা করলে, মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়

সূরা বাকারার ১২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- " আমার প্রতিশ্রুতি, অত্যাচারীদের উপর পড়ে না।" এ আয়াত অনুযায়ী ঐশী নেতৃত্ব ও ইমামত হচ্ছে আল্লাহর অঙ্গীকারএ আয়াতে বলা হয়েছে ফাসেক লোকদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ ধরণের অঙ্গীকার ভঙ্গ করাইসলাম, মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বা বিভেদ চায় নাআর এ জন্যেই আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং বিশেষ করে পিতামাতার সাথে দেখা-সাক্ষা এবং সম্পর্ক জোরদার করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেনইসলাম পরিবার বা সমাজ থেকে দূরে থাকার বিরোধীইসলাম চায় মুসলমানরা দলদ্ধভাবে থাকুকএজন্য জুমার নামাজ এবং জামাতে নামাজ পড়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছেএ ছাড়া অসুস্থদের দেখতে যাওয়া দুঃস্থদের সাহায্য এবং প্রতিবেশীদের বিপদে আপদে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাওয়া, ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই পছন্দনীয় কাজইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছেএবারে এ প্রসঙ্গে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা যাকহাদীস শরীফে এসেছে, তোমরা আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা সাক্ষা করবেএতে করে দরিদ্রতা দূর হবে, জীবিকা বৃদ্ধি পাবে এবং জীবন হবে বরকতময়অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রক্তের সম্পর্ক রক্ষার জন্য আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা সাক্ষা করবে, যদিও তারা তোমাকে উপেক্ষা করে এবং সলোক না হয়

এ সম্পর্কে আরো কয়েকটি হাদীস হচ্ছে-প্রথমত: রক্তের সম্পর্ক রক্ষার জন্য এক বছর ধরে হাটার প্রয়োজন হলে কিংবা সালাম দেয়া অথবা পানি পান করাবার মত সামান্য সময়টুকু থাকলেও তা পালন কর দ্বিতীয়ত: যে ব্যক্তি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করবে মৃত্যু এবং পরকালের হিসাব তার জন্য সহজ হবে এবং বেহেশতে বিশেষ মর্যাদায় আসীন হবে

এবারে সূরা বাকারার ২৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাকএ আয়াতে বলা হয়েছে- " কিভাবে তোমরা আল্লাহকে অস্বীকার কর, অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনিই তোমাদের জীবিত করেছেন আবার তোমাদের নির্জীব করবেনপূনরায় তোমাদের জীবিত করবেন, অবশেষে তারই দিকে তোমরা ফিরে যাবে।"
আল্লাহকে চেনার সর্বোত্তম উপায় হলো বিশ্বজগত এবং মানব সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করাজীবন ও মৃত্যু নিয়ে চিন্তাভাবনার মাধ্যমে মানুষ এ সত্য উপলদ্ধি করতে পারে যে, আমি যদি নিজেই আমার স্রষ্টা হতাম তাহলে অবশ্যই চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী হতামকিন্তু একসময় আমরা ছিলাম না, পরে অস্তিত্ব লাভ করেছি এবং পূনরায় মৃত্যুবরণ করতে করতে হবেকাজেই এই প্রাণ বা জীবনই হচ্ছে আমাদের জন্য মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ বা নেয়ামতমানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে এত অগ্রসর হবার পরও এখন পর্যন্ত এই প্রাণের স্বরূপ উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেমানুষের জন্ম ও মৃত্যু পুরোপুরি আল্লাহর হাতেআমরা নিজের ইচ্ছায় আসিনি, কাজেই নিজ ইচ্ছায় যেতেও পারব নাস্রষ্টা আমাদের অস্তিত্ব দিয়েছেন এবং তিনিই আমাদের মৃত্যু ঘটাবেনআমল বা কাজই হচ্ছে আমাদের একমাত্র সম্বলসুতরাং যে স্রষ্টার হাতে আমাদের শুরু এবং শেষ, তার অস্তিত্বকে আমরা কিভাবে অস্বীকার করবো? অথবা মৃত্যুর পর মানুষের পুনরুত্থানকে আমরা কিভাবে অস্বীকার করবো? কেননা পুনরুত্থান বা মৃত্যুর পর পূনরায় জীবিত করা প্রথমবার সৃষ্টির করার চেয়ে অনেক সহজ কাজযে স্রষ্টা আমাদেরকে অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে, অস্তিত্ব বা প্রাণ দিয়েছেন, তিনি কি মৃত্যুর পর মানুষকে পূনরায় জীবিত করতে পরবেন না? এ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
প্রথমত: মানুষকে হেদায়েতের জন্য কুরআনের একটি বিশেষ পন্থা হচ্ছে, মানুষের বুদ্ধি বিবেক এবং সহজাত প্রবৃত্তির কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়াযাতে চিন্তার মাধ্যমে মানুষ সত্যকে উপলদ্ধি করতে পারে
দ্বিতীয়ত: মানুষের জীবন আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে, আর মৃত্যু পুনরুত্থান দিবসের ইঙ্গিত বহন করে
তৃতীয়ত: নিজেকে জানা, খোদাকে চেনারই ভূমিকা মাত্রআত্মপরিচয় লাভের মাধ্যমে মানুষ স্রষ্টাকেও চিনতে পারেকেননা সে বুঝতে পারে তার নিজস্ব বলতে কিছুই নেই, সব কিছু মহান আল্লাহর
চতুর্থত: মানুষের পূর্ণতার সর্বশেষ পর্যায় হচ্ছে, মহান প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করা
পঞ্চমত: মৃত্যুই মানব জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং এর মাধ্যমে নতুন জীবনের সুচনা হয়
ষষ্ঠত: মৃত্যুকে অস্বীকার করার পেছনে কাফেরদের কোন যুক্তি-প্রমাণ ছিলো নাতাই তারা মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করতোপবিত্র কোরআন মানুষের সর্বপ্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তাদের সব প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিয়েছে



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 next