তাফসীর বিষয়ক অনুষ্ঠান-১

রেডিও তেহরান

ষষ্ঠত: সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক হলো বিবেকএ আয়াতে বলা হয়েছে যে তোমাদের সমমনা লোকেরাও যদি সাক্ষী দেয় যে তোমাদের আনা বিষয়টি কোরআনের মত তাহলেও আমি তা মেনে নেবঅর্থা আল্লাহ স্বয়ং মানুষকেই বিচারক হিসেবে নির্ধারণ করেছেন

সপ্তমত: কোরআনের সত্যতা এত অকাট্য যে বিরুদ্ধবাদীরা কোরআনের মত একটি সূরাও যদি আনতে পারে তাহলে আমরা সেটিকে সমগ্র কোরআনের স্থলে গ্রহণ করে নেব

এবারে সূরা বাকারার ২৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাকএ আয়াতে বলা হয়েছে-"যদি তোমরা না আনো যা কিনা কখনই পারবেনা, তাহলে সেই আগুনকে ভয় করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথরসেই আগুন প্রস্তুত রয়েছে কাফেরদের জন্য।" এর আগের আয়াতে কোরআন বিরুদ্ধবাদীদেরকে একটি সূরা নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেআর এ আয়াতে বলছে এ কাজ কখনোই সম্ভব নয়যারা রাসূলের কথা ও বাচনভঙ্গীর সাথে পরিচিত এবং তার যুগে বসবাস করেছে তারা যেমন কোরআনের মত একটি সূরা তৈরী করতে পারবেনা, তেমনি ভবিষ্যতেও এ কাজ অসম্ভবএরপর কোরআন অবিশ্বাসীদেরকে দোজখের আগুনের ব্যাপারে হুশিয়ারী করে দিয়ে বলে জাহান্নামের আগুনের উপকরণ হিসাবে অপরাধীদের দেহ পাথরের পাশাপাশি জ্বলবেএ আয়াতেপাথর' বলতে পীট কয়লা বোঝানো হচ্ছে যা দোজখের আগুন সৃষ্টি করে, কিংবা পাথরের মূর্তি বোঝানো হচ্ছে যেসব মূর্তিকে রাসূলে খোদার দুশমনরা উপাসনা করতো, আল্লাহ তাদের অপরাধের প্রমাণ হিসাবে পাথরের ঐ মূর্তিগুলোকে কেয়ামতের সময় হাজির করবেনযাতে মূর্তি পূজকেরা তাদের কৃতকর্মের কথা অস্বীকার করতে না পারেসূরা বাকারার ২৪ নম্বর আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
প্রথমত: নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বিরুদ্ধবাদীদের সাথে দৃঢ়তার সাথে কথা বলতে হবে এবং ইসলামের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবেএ আয়াতে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে-তোমরা কোরআনের মত কোন সূরা আনতে পারোনি এবং কখনও তা পারবেও না

দ্বিতীয়ত: মানুষ অবিশ্বাসের ফলে পাথর ও জড় পদার্থের কাতারে গিয়ে ঠাঁই করে নেয়এ আয়াতে বলা হয়েছে-দোযখের আগুনের জ্বালানী হলো মানুষ ও পাথর

তৃতীয়ত: যে অন্তর পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে এবং কোরআনের বাণী গ্রহণ করে না, কেয়ামতের দিন সেই অন্তরের পুনরুত্থান হবে পাথরের সাথে

চতুর্থত: কোরআন কেবল রাসূলের যুগের জন্যেই মুজিযা নয় এবং এ আসমানী গ্রন্থ সব যুগের জন্য মুজিযাতাই বলা হয়েছে-"ভবিষ্যতেও কোরআনের মত কিছু রচনা করতে পারবে না


১৩ তম পর্ব

কোরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে আমরা সূরা বাকারার ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবসূরা বাকারার ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"যারা বিশ্বাস করে এবং স কাজ করে তাদের সুসংবাদ দাও যে তাদের জন্যই বেহেশত যার তলদেশে নদী প্রবাহিতযখনই তাদের তা হতে ফল-মূল খেতে দেওয়া হবে, তখনই তারা বলবে আমাদের পূর্বে জীবিকা হিসাবে যা দেওয়া হতো এতো তাই-ইতাদেরকে অনুরূপ ফলই দেয়া হবে এবং সেখানে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিনী রয়েছে, তারা সেখানে স্থায়ী হবে।" আগের আয়াতে কাফেরদেরকে জাহান্নামের আগুনের ভয় দেখানোর পর, এ আয়াতে মুমিনদের প্রতিফল বর্ণনা করা হয়েছে যাতে করে কাফের ও মুমিনদের পরিণতি যাচাইয়ের পর সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠেঅবশ্য ঈমান স কাজ ছাড়া ফলপ্রসূ হবে নাশুধু ঈমান বা শুধু ভালো কাজ কোনটিই একক ভাবে মানুষের সৌভাগ্য নিশ্চিত করতে পারে নাঈমান হচ্ছে গাছের মূল বা শিকড়ের মত আর ভালো কাজ হচ্ছে বৃক্ষের ফল স্বরুপগাছের সুমিষ্ট ও ভালো ফল, ঐ গাছের সুস্থ ও সবল মূলের প্রমাণ দেয়আর সবল ও সুস্থ মূলের গাছই ভালো ফল দিতে পারেঅবিশ্বাসী বা কাফেররাও অনেক সময় ভালো কাজ করে, কিন্তু তাদের অন্তরে ঈমানের মজবুত ভিত না থাকায়, সে সব কাজ স্থায়ী হয় নাকেয়ামত বা শেষ বিচারের দিন মুমিন ব্যক্তিদের স্থান হবে বেহেশত বেহেশতের বাগানগুলো চির সবুজ এবং ফলে-ফুলে ভরাকেননা সজীবতার উস পানির নহর গাছগুলোর নীচ দিয়ে সবসময় বয়ে যাচ্ছেবেহেশতের ফলগুলো দেখতে বাহ্যত: এ দুনিয়ার মতো যাতে বেহেশবাসীরা সেগুলো দেখেই চিনতে পারেফলগুলো যেন তাদের কাছে অদ্ভুত বা অপরিচিত মনে হয় নাতবে স্বাদ ও গন্ধের দিক থেকে সেগুলো অনেক ভিন্ন
বেহেশতে কেউ জন্ম গ্রহণ করে নাতবে মানুষ যেহেতু সঙ্গী বিহীন থাকতে পারে না তাই বেহেশতবাসীদের জন্য সেখানে সঙ্গীনীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছেপুত-পবিত্রতা তাদের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যযদিও পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে বস্তুগত অনেক নেয়ামত, যেমন বাগান, প্রাসাদ, সঙ্গীনী প্রভৃতির কথা উল্লেখ করা হয়েছেকিন্তু আবার অনেক আয়াতে এগুলোর সাথে বেহেশতে আধ্যাত্মিক নেয়ামতের কথাও বলা হয়েছেযেমন সূরা তওবার ৭২ নম্বর আয়াতে বেহেশতের বস্তুগত বা বৈষয়িক নেয়ামতের কথা উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে-"আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ"সূরা বায়্যেনার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-"মহান আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।" পবিত্র কোরানে বেহেশতী নেয়ামত ও ঐশ্বর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বেহেশতবাসীদের স্থান ও আবাসস্থল সম্পর্কে বলা হয়েছে- এটাই তাদের একমাত্র পুরস্কার নয়' এ ছাড়াও পয়গম্বর, ওলি-আউলিয়া এবং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ও স ব্যক্তিদের মাঝে অবস্থান তাদের আত্মিক প্রশান্তি বয়ে আনবে এবং এটা তাদের জন্য স্বর্গীয় উপহারএ আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
প্রথমত : সঠিক প্রশিক্ষণের জন্য হুমকি ও ভয়-ভীতি দেখানোর পাশাপাশি উসাহেরও প্রয়োজন আছেকাফেরদেরকে জাহান্নামের ভয় দেখানোর পর এ আয়াতে মুমিনদেরকে বেহেশতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে
দ্বিতীয়ত : ঈমানের বাহ্যিক রূপ হচ্ছে ভালো কাজএজন্য পবিত্র কোরানে এ দুটি
অর্থা ঈমান ও স কাজ সব সময় এক সাথে এসেছে

তৃতীয়ত : পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে ভালো কাজ সেটাই যা আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা হবেসুতরাং সামাজিক সেবা বা সম্পূর্ণ নিজস্ব ইচ্ছায় ভালো কাজ করলে সেটা কোরআনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়কেননা ঈমান আনার পর স কাজ করলে সেটাই কেবল গ্রহণযোগ্যএ দুনিয়ায় হালাল হারাম বাছতে গিয়ে মুমিন ব্যক্তিকে অনেক কিছু বর্জন করতে হয়তবে বেহেশতে এ সব কিছু পুষিয়ে দেয়া হবে
চতুর্থত : দুনিয়ার ঐশ্বর্য ও সুখ-সমৃদ্ধি ক্ষণিকের জন্যে এবং তা অস্থায়ীকাজেই মানুষ তা হাতছাড়া করলে দু:খ পায় এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েকিন্তু আখেরাত বা পরকালের ঐশ্বর্য ও সুখ-সমৃদ্ধি চিরন্তন ও তা সব সময় স্থায়ী থাকবেকাজেই তা হারাবার ভয় থাকবে নাআর এ জন্যেই এই আয়াতে বলা হয়েছে-বেহেশতবাসীরা সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করবে'


পঞ্চমত : উপযুক্ত সঙ্গীনী তাকেই বলা যায় যে সর্ব দিক থেকেই পবিত্র, বাহ্যিক কাজ-কর্ম ও অন্তরে যার কোন কলুষতা নেই



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 next