সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

তৃতীয়তঃ পন্য ও যাত্রীবাহী জাহাজ অনেক ভারী ও বড় হওয়া সত্ত্বেও সাগরে ভেসে মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। এই সব জাহাজ সাগরে না ডুবে এবং বাতাসের প্রবাহে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়।

চতুর্থতঃ আল্লাহ আকাশ থেকে জমীনে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। এর ফলে মৃতপ্রায় শুষ্ক ভূ-পৃষ্ঠ সবুজ গাছ-পালা ও জীব- জন্তুতে সুশোভিত হয়। পানি হয় বিশুদ্ধ ও পরিস্কার এবং পরিবেশ ও বাতাস হয় সতেজ।

পঞ্চমতঃ বাতাসের গতি পরিবর্তন। এর ফলে শুধু জাহাজ চলে-তা নয়, একই সাথে উদ্ভিদের উন্মেষ, ফুলের পরাগায়ন, মেঘ-চালনা, ঠান্ডা ও গরম বাতাসের স্থান পরিবর্তন এবং শহরের দূষিত বাতাসকে বিশুদ্ধকরণ প্রভৃতি অনেক কাজ হয়।

ষষ্ঠতঃ মেঘমালা ব্যাপক পরিমাণে পানি বহন করে। কিন্তু মেঘমালা এতভারী হওয়া সত্ত্বেও আকাশ ও জমিনের দিকে আকৃষ্ট না হয়ে ভাসমান অবস্থায় পানিকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করে। এটা স্পষ্ট তারাই আল্লাহর এসব নিদর্শন থেকে তাঁর মতা ও একত্বের প্রমাণ উপলদ্ধি করতে পারবে,যারা এসব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং শুধু দেখেই ক্ষান্ত হয় না।

এবারে সূরা বাকারার ১৬৫ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য অনেক কিছুকে আল্লাহর সমান মনে করে এবং আল্লাহকে ভালোবাসার মতো তাদেরকে ভলোবাসে। কিন্তু যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা, মুশরিকদের খোদার প্রতি তাদের ভালোবাসার চেয়ে দৃঢ়তর।

যারা অত্যাচার করেছে, অর্থাৎ তারা যদি তাদের শাস্তি দেখতে পেত তবেই বুঝতো যে, সমস্ত শক্তিই আল্লাহর এবং নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।" আকাশ, জমীন, সাগর, উদ্ভিদ, প্রাণীকুল, ও অজৈব সব কিছু আল্লাহর একত্বের প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও-এসব নিদর্শন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা না করে অনেকে এসবকে শুধু বাহ্যিক উপকরণ হিসেবে দেখে এবং আল্লাহর পরিবর্তে এসবের উপাসনা করে। অনেকে তারকারাজিকে নিজেদের জীবনে প্রভাব সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে এটাকে তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক বলে মনে করে। কেউ কেউ গরুর মত জীব-জানোয়ারকে পবিত্র হিসেবে সম্মান ও ভক্তি করে। অনেক সময় নিজেরা কাঠ বা পাথর দিয়ে মূর্তি বানিয়ে তার সামনে নত হয় এবং নিজের সব ভক্তি শ্রদ্ধা তার জন্য উজাড় করে দেয়। অনেক সময় মানুষকেও খোদার আসনে বসিয়ে তাকে খোদার মত ভাগ্য নিয়ন্ত্রক বলে মনে করে-তার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়। এইসব বস্তুর প্রতি অত্যধিক ভালোবাসার কারণে তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে ঐসব নির্বাক ও নিস্ক্রিয় খোদাদের উপাসনা করে। অথচ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের জন্য যা দরকার তা হলো, সব কিছুর চেয়ে,আল্লাহর প্রতি মানুষের বেশী ও সুদৃঢ় ভালবাসা এবং সকল ভালবাসা, ভক্তি হতে হবে আল্লাহর জন্যেই আর এই প্রেম বা ভালবাসা জ্ঞানের মাধ্যমে অর্জিত হয়। মুশরিকরা তাদের খোদাদেরকে ভালবাসে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও খেয়ালীপনার ভিত্তিতে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার ভিত্তি সেরকম নয়। অবশ্য মুশরিকরাও যদি পরকাল ও পারলৌকিক শাস্তি দেখতে পেত, তাহলে তারাও বুঝতো যে সমস্ত শক্তি আল্লাহরই হাতে এবং তারা বুঝতো সম্মান ও শক্তি লাভের জন্যে তারা বৃথাই আল্লাহ ছাড়া অন্যদের দ্বারস্থ হয়েছে।

এবারে সূরা বাকারার ১৬৬ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, " কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসীরা যাদের উপাসনা করতো, সেই সব উপাস্যরাই তাদের উপাসকদেরকে অস্বীকার করবে, তখন তারা সবাই আল্লাহর শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে এবং তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে।"

এই আয়াতে মানুষকে বলা হচ্ছে ধীরস্থির হয়ে ভেবে দেখ কে তোমাদের প্রভু? কার অনুসরণ করছ এবং কাকে শ্রদ্ধা করছ? আমরা এমন কাউকে ভালবাসবো যিনি নিজের স্বার্থের জন্য আমাদের ভালবাসা চান না বা যাতে আমাদের ভালবাসার ফলে এ দুনিয়ায় তার স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হতে পারে। যেসব মানুষকে আমরা খোদার আসনে বসিয়ে ভালবাসবো তারাই কিয়ামতের দিন আমাদেরকে ঘৃণা করে আমাদের থেকে দূরে থাকবে। নেতা নির্বাচনেও আমাদেরকে সতর্ক হতে হবেকারণ পরকালে আমাদের ভাগ্যও তাদের সাথে যুক্ত। সে সময় প্রত্যেকে তাদের ভালবাসার পাত্র ও নেতা নেত্রীর সাথে একত্র করা হবে।

এবারে সূরা বাকারার ১৬৩ নম্বর থেকে ১৬৬ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা যাক।

প্রথমতঃ আল্লাহকে জানার বিভিন্ন পন্থার মধ্যে অন্যতম হলো, প্রকৃতিকে জানা। কারণ এ প্রকৃতি হলো আল্লাহর বিধান, ক্ষমতা ও জ্ঞানের প্রকাশ।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next