সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

তৃতীয়তঃ আল্লাহর পরীক্ষায় শুধুমাত্র ধৈর্যশীলরাই জয়ী হয়। অন্যরাও পরীক্ষা থেকে পালাতে পারে না, কারণ আল্লাহর নেয়া পরীক্ষায় সবাই অংশ নিতে বাধ্য।

চতুর্থতঃ ধৈর্যের মূল রয়েছে আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের মধ্যেই। আর এ বিশ্বাসই মানুষের জন্য কষ্ট সহ্য করাকে সহজ করে দেয়। #

কোরআনের আলো

( ৪৫ তম পর্ব )

কোরআনের আলোর এবারের পর্বে আমরা সূরা বাকারার ১৫৮ থেকে ১৬২ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। সূরা বাকারার ১৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "নিশ্চই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। সুতরাং যে কেউ এই কাবা ঘরের হজ্ব ও ওমরা সম্পন্ন করে, এই দুটি প্রদক্ষীণ করলে তার কোন পাপ নেই এবং কেউ স্বেচ্ছায় সৎকাজ করলে, আল্লাহ পুরস্কার দাতা ও তিনি সর্বজ্ঞ।" হজ্ব অনুষ্ঠান হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর

যুগ থেকে প্রচলিত। দীর্ঘকাল ধরে অজ্ঞ ও মূর্তিপূজারী লোকেরা হজ্ব অনুষ্ঠানের সাথে অনেক কুসংস্কারকে জড়িয়ে ফেলে। ইসলাম এই মহান ও বৃহৎ ইবাদতের মূল দিকগুলো রার জন্য এর সংশোধন করে। হজ্বের একটি পালনীয় দিক হল, মসজিদুল হারামের পাশে অবস্থিত সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাঈ করা বা দ্রুত আসা-যাওয়া করা। কিন্তু মূর্তিপূজারীরা এই দুই পাহাড়ের ওপর মূর্তি স্থাপন করে এই মূর্তিগুলোর চারপাশে প্রদক্ষীণ করতো। তাই মুসলমানরা হজ্ব পালনের সময় সাঈ করতে আগ্রহী হত না এবং তারা মনে করতো এই দুই পাহাড়ের ওপর মূর্তি থাকায় সাঈ করা উচিত নয়। কিন্তু আল্লাহ এই আয়াত নাজেল করে স্মরণ করে দিলেন যে এই দুই পাহাড় আল্লাহর শক্তির নিদর্শন এবং হজ্ব অনুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর স্মৃতিবাহী। অজ্ঞ মানুষেরা এখানে শির্কের নিদর্শন প্রতিষ্ঠা করে শির্কে লিপ্ত হলেও তোমাদের মুসলমানদের উচিত হবে না, এ স্থানকে ছেড়ে যাওয়া। বরং সেখানে উপস্থিত থেকেই বিভ্রান্তদের কর্তৃত্ব ক্ষুন্ন করা উচিত। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যখন তার স্ত্রী ও সন্তান ইসমাইলকে নিয়ে মক্কায় আসেন তখন তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত দায়িত্ব পালনের জন্য তাদেরকে এই শুষ্ক প্রান্তরে রেখে চলে যান। ইসমাইলের মা বিবি হাজেরা পানির সন্ধানে এই দুই পাহাড়ের মাঝে ছুটাছুটি করেন। এ অবস্থায় নবজাতক ইসমাইলের পায়ের আঙ্গুলের নীচ দিয়ে ঝর্ণা বের হয় যা জমজম নামে পরিচিত লাভ করে। সেই তারিখ থেকেই আল্লাহর নির্দেশে যারাই আল্লাহর ঘর জিয়ারত করতে আসছেন তাদেরকে মা হাজেরার ত্যাগের মহিমান্বিত স্মৃতির সম্মানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে ছুটাছুটি করতে হয়সাঈ অনুষ্ঠান মা হাজেরার আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রতি আল্লাহর করুণার নিদর্শন। আর এ থেকে আমাদের বোঝানো হয়েছে যে, আমরা যেন মানুষের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা ও প্রতিফল-প্রতিদান পাবার আশা না করি। কারণ আল্লাহ মানুষের সৎকাজ সম্পর্কে অবহিত এবং তিনি সৎকাজের পুরস্কারও দিয়ে থাকেন

এবারে সূরা বাকারার ১৫৯ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "আমি মানুষের জন্য কিতাবে যে সকল স্পষ্ট যুক্তি বা নিদর্শন ও উপদেশ দিয়েছি-তা যারা গোপন করে আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের অভিশাপ দেন এবং অভিশাপকারীগণও তাদেরকে অভিশাপ দেন। এই আয়াতে ইহুদী ও খৃষ্টান পন্ডিতদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা ইসলামের নবীর আবির্ভাবের স্পষ্ট নিদর্শনগুলো তাদের গ্রন্থে পাবার পরও তা গোপন করেছে এবং এভাবে মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর নবীরা যেরকম কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাকে বিফল-বরবাদ করে দিচ্ছেকোন অজ্ঞ লোক যদি সত্যকে গোপন করে তাহলে সে অপেক্ষাকৃত কম শাস্তি পাবে। কিন্তু কোন জাতির শিক্ষিত, পন্ডিত বা বুদ্ধিজীবীরাও সত্য গোপন করে থাকে, তাহলে তা হবে খোদা, নবীগণ ও মানুষের ওপর বড় ধরণের জুলুম। এই আয়াতে পবিত্রদের প্রতি বন্ধুত্বের ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি অপবিত্রদের প্রতি ঘৃণা বিশেষ করে যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে তাদের প্রতি চরম ঘৃণা ও অভিশাপের বিষয় স্পষ্ট করেছে। অবশ্য আল্লাহ পরবর্তী আয়াতে ব্যতিক্রমী একটি দলের কথা উল্লেখ করেছেন, "কিন্তু যারা ক্ষমা প্রার্থনা করে ও সৎকাজের মাধ্যমে নিজেদের সংশোধন করে, আর যে সত্য গোপন করেছিল তা প্রকাশ করে আমি তাদের ক্ষমা করে দেই। আমিই ক্ষমাশীল, দয়াময়।" ইসলাম ধর্মে কোন স্থবিরতা বা অচলাবস্থা নেই। আল্লাহ প্রতিদিনই ওসব সময় মানুষের জন্য আশা' ও ফিরে আসার পথ খোলা রেখেছেন, যাতে এমনকি সবচেয়ে বেশী পাপী মানুষেরাও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়। এটা স্পষ্ট প্রত্যেক পাপের জন্য তওবা বা ক্ষমা লাভ এ পাপের প্রকৃতি ও পরিমাপের সাথে সম্পর্কযুক্ত। পাপের ফলে যে পরিমাণ ক্ষতি করা হয়েছে, ততটুকু সৎকাজ করেই তা পুষিয়ে দিতে হবে ক্ষমা লাভের জন্য। তাই যে সত্য গোপন করা হয়েছে তা জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে-যাতে মানুষ বিভ্রান্তির মধ্যে না থেকে সত্যকে জানতে পারে।

এবারে সূরা বাকারার ১৬১ ও ১৬২ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এতে বলা হয়েছে, "যারা কাফের হয়েছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে তাদের ওপর আল্লাহর, ফেরেশতাদের এবং সমগ্র মানব জাতির অভিশাপ। আল্লাহর রহমত থেকে তাদের দূরে থাকা ও অভিশপ্ত অবস্থা স্থায়ী হবে। তাদের শাস্তি কমানো হবে না এবং তাদের কোন অবকাশ দেয়া হবে না।"

পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছে-যদি সত্য গোপনকারীরা মানুষের কাছে সত্য প্রকাশ করে, তাহলে তারা আল্লাহর দয়া পাবে। এই আয়াতে পুনরায় হুমকী দিয়ে বলা হয়েছে, যদি সত্য গোপনকারীরা সত্যকে গোপনই রেখে যায়, তাহলে ফেরেশতা, মানুষ ও আল্লাহর অভিশাপ তাদের ওপর নেমে আসবে। কারণ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তওবা কার্যকরী হয়। মৃত্যুর জগতে আসার পর তওবা বা ক্ষমা প্রার্থনা করে কোন লাভ হবে না। ফেরাউনও নিশ্চিত মৃত্যুর সম্মুখীন হবার পর অর্থাৎ ডুবে যাবার সময় তওবা করেছিল কিন্তু সে তওবায় কোন কাজ হয়নি। এজন্যই আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও নবীরা এ দোয়া করতেন যে মৃত্যুর সময় যেন মুসলমান হয়ে মৃত্যুবরণ কর। কারণ কুফুরী বা অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যু এমন এক বিপদ যা থেকে রক্ষা পাবার কোন উপায় নেই। দুনিয়ায় ও পরকালে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া এমন এক শাস্তি যা সত্য গোপনকারীরা পেয়ে থাকে। সকল বিবেকবান মানুষ এই নোংরা অশুভ কাজকে ঘৃণা করেন। আল্লাহর শাস্তি ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা নির্ভর, এ ক্ষেত্রে তিনি প্রতিশোধ গ্রহণকারী ও জালেম নন। তাই যারা জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে, তাদের শাস্তি কমানো হবে না এবং তাদেরকে মুক্তির কোন সুযোগও দেয়া হবে না। কারণ তাদের মন্দ কাজের প্রভাব কমে না এবং ঐ প্রভাব কার্যকরী হতেও দেরী হয় না।

এবারে সূরা বাকারার ১৫৮ থেকে ১৬২ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরছি।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next