সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

পবিত্র কোরআন এক স্পষ্ট দিক নির্দেশনাকারী মহা গ্রন্থ। এটি এমন এক প্রাণসঞ্জীবনী ঝর্ণা যা প্রত্যেক মানুষকে তার তৃষ্ণা ও আগ্রহ অনুসারে চাহিদা মিটিয়ে থাকে। কোরআনের আলোর এবারের পর্বে সূরা বাকারার ১৫৩ থেকে ১৫৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। ১৫৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "হে বিশ্বাসীগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গী"। মানুষ তার দীর্ঘজীবনে বহু সংকট ও সমস্যার মুখোমুখী হয়। যদি সেগুলো মোকাবেলা করার শক্তি তার না থাকে তাহলে সে ব্যর্থতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ঈমানদার মানুষেরা এইসব বাধা বিপত্তির মোকাবেলায় দুটি কাজ করে। এ দুটি কাজ হলো ধৈর্য ও প্রতিরোধ এবং নামাজ ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক। অর্থাৎ ঈমানদার নিজের ভেতরের শক্তি ও পাশাপাশি আল্লাহর অসীম শক্তির ওপর নির্ভর করে বিপদ মোকাবেলা করে। আল্লাহও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি ধৈর্যশীল নামাজীদের সহায়তা করবেন এবং সর্বাবস্থায় তিনি তাদের সাথে থাকবেন। আর আল্লাহর সাহায্য বিপদ মোকাবেলায় মানুষের জন্যে সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক।

এবারে সূরা বাকারার ১৫৪ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "আল্লাহর পথে যারা নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝতে পার না।"

আগের আয়াতে ধৈর্য ও প্রতিরোধের কথা বলার পর এই আয়াতে আল্লাহর পথে জিহাদ ও শাহাদত সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়ে বলা হল যে, আর্থিক ও জীবনের ওপর অনেক সংকট আসবে। আর এসব ক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও ধৈর্যের প্রয়োজন রয়েছে। অনেক অজ্ঞ ও বিদ্বেষপরায়ন লোক জিহাদ প্রতিরক্ষায় অংশ তো নেয়ই না, বরং মানুষকে এ কাজে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে এই মহান প্রচেষ্টাকে অর্থহীন বলে উল্লেখ করে। তারা মুখে ও চেহারায় সহানুভূতির রেশ মাখিয়ে-যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে, তাদের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে এবং বলে আহা! অমুক বেচারা অনর্থক তার জীবনটা দিল। বদরের যুদ্ধে ১৪ জন মুসলমান শহীদ হয়েছিল। অনেক মানুষ তাদের মৃত বলে উল্লেখ করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তাদের ধারণাকে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কারণ শহীদরা জীবিত এবং তারা এক ধরণের জীবনের অধিকারী, কিন্তু আমরা তা উপলদ্ধির ক্ষমতা রাখি না।

এবারে সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "জেনে রাখ নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে ভয়, ক্ষধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-শস্যের অভাবের কোন একটি দিয়ে পরীক্ষা করবো। হে নবী, আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।" পরীক্ষা হলো আল্লাহর এমন এক বিধান, যাতে সব মানুষকে অংশ নিতে হয়। কিন্তু সব মানুষের পরীক্ষা এক ধরণের নয়। বরং যে যত সুবিধে ও প্রতিভার অধিকারী তারই আলোকে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়। কারো কারো জন্য অর্থনৈতিক সংকট পরীক্ষার মাপকাঠি। অর্থনৈতিক সংকটে মানুষ কি করে সেটার ওপর পরীক্ষার ফলাফল নির্ভর করবে। কারো কারো জন্যে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হওয়াটা পরীক্ষার মানদন্ড হিসেবে বিবেচিত হবে-যাতে বোঝা যায় যুদ্ধের জন্যে তারা কতটুকু প্রস্তুত। অবশ্য আল্লাহ আমাদেরকে জানার উদ্দেশ্যে পরীক্ষা নিচ্ছেন এমনটি ভাবা ঠিক নয়। কারণ আল্লাহ আমাদের অবস্থা আমাদের নিজেদের চেয়ে এবং অন্য সবার চেয়ে ভালোভাবেই জানেন। আমরা যেন নিজেরা নিজেদের অবস্থা বুঝতে পারি-সেটাই হলো পরীক্ষার উদ্দেশ্য। পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা আমাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে ঐশী পুরস্কার লাভের অথবা প্রতিভার বিকাশকে ইচ্ছাকৃতভাবে রুদ্ধ করে ঐশী শাস্তি লাভের ক্ষেত্রে তৈরী করতে পারি। মানুষের বহু কল্যাণকর গুণ যেমন ধৈর্য, সন্তুষ্টি, খোদাভীরুতা ও ত্যাগ প্রভৃতি সংকটের সময়ই প্রকাশ পায়। আর এতে করে মানুষের আত্মা শক্তিশালী এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়।

এবারে সূরা বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "ধৈর্যশীলরা যখন বিপদের মুখোমুখী হয় তখন তারা বলে, আমরা আল্লাহরই এবং আমরা নিশ্চিতভাবে তাঁরই দিকে ফিরে যাব।" আগের আয়াতে ধৈর্যশীলদের পুরস্কার দেয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে ধৈর্যশীলদের পরিচয় দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, সে-ই প্রকৃত ধৈর্যশীল যারা সংকট ও বিপদের সময় নিজেদেরকে হারিয়ে না ফেলে ও হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্যের ওপর আস্থা রাখে। যে তার নিজের সৃষ্টির শুরু ও পূর্ণতাকে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তার সৃষ্টিকে অনুগ্রহ ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে পরিচালনা করেন- তার দৃষ্টিতে সব কিছুই সুন্দর এবং বিশ্বের প্রতি সে ভালো মনোভাব রাখে। মূলত: পৃথিবী স্থায়ী বাসস্থান নয় এবং এটা ঘুমানো ও বিশ্রামের জায়গা নয়। পৃথিবী হল-পরীক্ষার ময়দান।

এখানে কষ্ট ও দুঃখ হল পরীক্ষার উপকরণ এবং অপ্রিয় অবস্থা আল্লাহর দয়াহীনতার লণ নয় বরং গতি ও পরিশ্রমের মাধ্যম। কিন্তু মানুষ সমস্যা ও বিপদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের আচরণ করে। একদল লোক অত্যন্ত কম ধৈর্যের অধিকারী । তারা বিপদে পড়লে হা-হুতাশ ছাড়া অন্য কিছু করে না। অন্যদল বিপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং কুফরী মূলক বাক্য উচ্চারণ না করে ও আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুলে আল্লাহর আশ্রয় চায়। অন্য একটি দল বিপদে শুধু ধৈর্যই ধারণ করে না তারা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করে। কারণ তারা বিপদ-সংকটকে নিজেদের আত্মাকে শক্তিশালী করার মাধ্যম বলে মনে করেন।

এবারে সূরা বাকারার ১৫৭ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতে বলা হয়েছে, "এইসব ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও করুণা এবং এরাই সুপথ প্রাপ্ত।" এই আয়াতটিতে ধৈর্যশীলদের জন্য বড় পুরস্কার হিসেবে আল্লাহর প থেকে বরকত বা প্রাচুর্য ও ঐশী শান্তি দেয়ার কথা বলা হয়েছে-যা ধৈর্যশীলদেরকে সব ধরণের বিচ্যুতি ও ভুল থেকে রক্ষা এবং তাদেরকে প্রকৃত পথ প্রদর্শন করছে। যদিও সমস্ত অস্তিত্বের জগত আল্লাহর রহমত ও দয়া পাচ্ছে, কিন্তু আল্লাহর এই বিশেষ দয়া ও শান্তি শুধুমাত্র ধৈর্যশীলদের প্রাপ্য। আর এই করুণার ফলে তারা নিশ্চিতভাবে সুপথ পাবে।

এবারে সূরা বাকারার ১৫৩ থেকে ১৫৭ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো তুলে ধরা যাক।

প্রথমতঃ নামাজ কোন বোঝা নয় বরং বিপদকালে মুক্তি পাবার উপায়। তাই আল্লাহ নামাজ ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছেন-যা সীমিত শক্তির মানুষকে অসীম শক্তির আল্লাহর সাথে যুক্ত করে।

দ্বিতীয়তঃ মৃত্যুর পর মানুষ আত্মিক জীবনে ফিরে গেলেও শহীদরা মৃতদে জীবনের চেয়ে ভিন্ন ধরণের জীবন লাভ করে।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next