সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

এবারে সূরা বাকারার ১৪৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "হে নবী, ঐশী নির্দেশের অপোয় বার বার আকাশের দিকে তোমার তাকানোকে লক্ষ্য করছি। সুতরাং আমি তোমাকে সেই কেবলামুখী করব যা তুমি ইচ্ছে কর। অতএব তুমি পবিত্রতম মসজিদের দিকে তোমার মুখ ফেরাও। হে মুসলমানরা, তোমরা যেখানেই থাক না কেন সেদিকে মুখ ফেরাও এবং যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তারা নিশ্চিতভাবে জানে যে এটা তাদের প্রতিপালকের সত্য। তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ বেখবর নন।"

ইহুদীরা যখন মুসলমানদের এই বলে বিদ্রুপ করছিল যে তাদের কোন স্বতন্ত্র কেবলা নেই, তখন হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ জোহরের নামাজের সময় আল্লাহর রাসূলের ওপর এ নির্দেশ অবতীর্ণ হয় এবং রাসূল (সাঃ) বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে মুখ ফিরিয়ে মক্কার দিকে মুখ করায় তার পেছনে জামাতে সমবেত মুসলমানরাও কাবামুখী হয়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো পূর্ববর্তী ঐশী গ্রন্থে একথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামের নবী দুই কেবলার দিকে মুখ করে নামাজ পড়বেন এবং ইসলামের নবীর অন্যতম এক নিদর্শন হবে এই ঘটনা। তাই এই আয়াতে আহলে কিতাবদের হুঁশিয়ার করে বলা হয়েছে তোমরাই যখন জান যে এই নির্দেশ সত্য তবুও কেন প্রতিবাদ করছ?

এবারে সূরা বাকারার ১৪৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "হে নবী জেনে রাখুন যাদের গ্রন্থ দেয়া হয়েছে আপনি যদি তাদের কাছে সমস্ত দলীল পেশ করেন তবুও তারা আপনার কেবলার অনুসারী হবে না এবং আপনিও তাদের কেবলার অনুসারী নন এবং যেমনটি তাদের কেউ কেউ অন্য কারো কেবলার অনুসারী হবে না। আপনার কাছে জ্ঞান আসার পরও আপনি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন, তবে নিশ্চয়ই আপনি হবেন অত্যাচারীদের অন্তর্ভূক্ত।"

এই আয়াতে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)কে সান্ত্বনা দিয়ে বলা হচ্ছে-যদি আহলে কিতাব আপনার কেবলাকে গ্রহণ না করে, তবে আপনি দুঃখিত হবেন না। কারণ হিংসা তাদেরকে সত্য গ্রহণের সুযোগ দেবে না। তাই আপনি যত যুক্তিই দেখান না কেন, তারা কিছুতেই যুক্তি গ্রহণ করবে না। কিন্তু তারা গ্রহণ না করলেও আপনি যেন আপনার কেবলা সম্পর্কে নীরব না হন বরং দৃঢ়তার সাথে এটা ঘোষণা করবেন যে, আমরা এসব হৈ-চৈ বা আপত্তিতে নত হব না এবং আমাদের অবস্থান থেকে মোটেই পিছু হটবো না। ইসলাম ধর্মে সবার জন্য একই বিধান থাকায় আল্লাহ তার নবীকেও হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, এমন কি যদি তুমিও তাদের প্রতি আকৃষ্ট হতে চাও এবং নিজের সঠিক কেবলার অনুসারী না হও তাহলে তুমিও নিজের উম্মতের ওপর বড় ধরণের জুলুম করার দোষে দোষী হবে।

এবারে সূরা বাকারার ১৪৬ ও ১৪৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ দুটি আয়াতে বলা হয়েছে, "আমি যাদেরকে গ্রন্থ দিয়েছি, তারা তাকে সেরূপ জানে, যেরূপ জানে আপন সন্তানগণকে এবং তাদের একদল জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে। সত্য তোমার প্রতিপালকের, সুতরাং তুমি সন্দিহানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।" তাওরাত ও ইঞ্জিল গ্রন্থে শেষ নবীর বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। আর তাই আহলে কিতাবগণ নবী (সাঃ) কে চিনতো কিন্তু বিদ্বেষ ও এক গুঁয়েমীর কারণে তারা এই সত্যকে অন্যদের কাছে গোপন রাখতো বা সত্যকে বিকৃত করতো। অবশ্য আহলে কিতাব রাসূল (সাঃ) এর বৈশিষ্ট্য দেখে তার প্রতি ঈমান এনেছিল। এইসব শারীরিক ও আত্মিক বৈশিষ্ট্য পূর্ববর্তী গ্রন্থে এমনভাবে উল্লেখিত হয়েছিল যে কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা নবী (সাঃ)কে নিজের সন্তানের মতই চিনতো। শেষের এই আয়াতে যে বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে জোর দেয়া হয়েছে তা হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজেল হয়েছে একমাত্র তাই সত্য। মানুষের বিরোধিতা এমনকি অধিকাংশ মানুষও যদি বিরোধিতা করে তাহলেও ঐশী নির্দেশের সত্যতার ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও সন্দিহান হওয়া উচিত নয়।

এবারে সূরা বাকারার ১৪৩ থেকে ১৪৭ নম্বর আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক।

প্রথমতঃ কেবলায় একদিকে যেমন রয়েছে স্বাধীনতার রহস্য, তেমনি এটি আত্মসমর্পনেরও নিদর্শন। স্বাধীনতা বলতে মুসলমানদের ওপর কর্তৃত্বকামী সকল ধর্ম ও জাতির কাছ থেকে স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য। আত্মসমর্পন বলতে বোঝায়, আল্লাহ যে নির্দেশই দেন না কেন নির্দ্বিধায় কোন প্রশ্ন ছাড়াই তা মেনে নেয়া।

দ্বিতীয়তঃ ইসলাম হলো ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী ধর্ম। যদি মুসলমানরা আল্লাহর নির্দেশিত সঠিক পথে চলে তাহলে তারা অন্যান্য জাতির জন্য আদর্শ ও তাদের জন্য সাক্ষী হতে পারে।

তৃতীয়তঃ গোঁয়ার্তুমী ও বিদ্বেষ সব ধরণের যুক্তি, বিদ্বেষ ও সত্য অনুসন্ধানের বিরোধী। আর তাই ধর্ম এই দাম্ভিক মনোভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।

চতুর্থতঃ যদি মানুষের আত্মা সত্য সন্ধানী না হয়, তাহলে শুধু জ্ঞান যথেষ্ট নয়। কারণ মানুষের অহংকার বা প্রবৃত্তি অনেক সময় জ্ঞানকে বিকৃত করে। #



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next