সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সূরা বাকারার ২২২ নম্বর আয়াত থেকে ২২৭ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমেই সুরা বাকারার ২২২ ও ২২৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক । এই দুই আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা হ'ল-"হে নবী তারা আপনাকে ঋতু বা হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে,বলুন তা অশুচি বা অপবিত্রতা। তাই ঐ সময় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশুদ্ব বা পবিত্র না হওয়া পযর্ন্ত তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ো না। যখন তারা ভালভাবে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে,তখন তাদের কাছে যেতে পারবে যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী ও শুদ্বাচারিগণকে ভালবাসেন। হে মুসলমান পুরুষ, তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য শস্য-ক্ষেত্রস্বরূপ। তাই তোমরা তোমাদের ক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমণ কর এবং নিজ জীবনের জন্য আগেই কিছু পাঠাও অর্থাৎ সৎ-সন্তানের বীজ বপন কর আর আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখীন হবে, হে নবী! মুমিনদেরকে সেই দিনের সুসংবাদ দিন। বিয়ের অন্যতম লক্ষ্য হ'ল-সন্তানের অধিকারী হওয়া এবং বংশ টিকিয়ে রাখা। আর এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু মানুষের স্রষ্টা সন্তান প্রতিপালনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সন্তানের জন্মের আগেই মায়ের ওপর অর্পণ করেছেন। পবিত্র কোরআন এক্ষেত্রে সুন্দর ও উপযুক্ত উপমা ব্যবহার করে স্ত্রীকে শস্যক্ষেত্রের সাথে তুলনা করেছে। পুরুষের ঔরস থেকে মায়ের গর্ভে নয় মাস ধরে সন্তানের বীজ প্রতিপালিত হবার পর সন্তান মাটি থেকে চারা গাছের মত বেরিয়ে এসে মানব-সমাজের গুলবাগিচায় স্থান করে নেয়। কিন্তু বীজ গ্রহণ ও প্রতিপালনের জন্য শস্যক্ষেতর প্রস্তুতি থাকা দরকার। মহিলাদের মাসিক বা ঋতুকাল হ'ল এই প্রস্তুতির সময়,তাই আল্লাহ মাসের কতগুলো নির্দিষ্ট দিনে স্ত্রীগমন, স্ত্রীদের মন ও শরীরের জন্য তিকর এবং এসময় তারা গর্ভবতী হবার জন্য প্রস্তুত থাকে না। তাই সৎ ও পবিত্র সন্তান তথা সমাজের গুলবাগিচায় সুগন্ধীফুল দানের চিন্তা করা উচিত। একই সাথে এটাও জেনে রাখা দরকার সন্তানের বাবা-মা হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে"। তাহলে এই দুই আয়াত থেকে আমরা যেসব শিক্ষা নিতে পারি তার সারমর্ম হ'ল-

প্রথমতঃ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম । মানুষের সমস্ত চাহিদা ও প্রশ্নের উত্তর এতে রয়েছে। যেমন পরিবার গঠন ও সন্তানের অধিকারী হবার বিষয়েও এই ধর্ম মানুষের জিজ্ঞাসা ও চাহিদার উপযুক্ত উত্তর ও সমাধান দেয়।

দ্বিতীয়তঃ ইসলাম ধর্মের বিধান সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই যেসব কাজ নিজের বা অন্যের জন্য তিকর, ইসলাম সে সবের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করাই এসব নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য

তৃতীয়তঃ মানুষের প্রবৃত্তিকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে এবং পরিবারের সুস্থতা বজায় রেখে ভোগ ও আরাম আয়েশ করতে হবে।

চতুর্থতঃ ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রী হ'ল বাগানের সমতুল্য, যা কিনা তার স্বামীকে প্রশান্তি দেয় এবং একই সাথে স্ত্রী হ'ল পবিত্র সন্তান প্রতিপালনের মাধ্যম।

এবার সুরা বাকারার ২২৪ ও ২২৫ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক । এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, "হে বিশ্বাসীগণ নিজেদের শপথের জন্য আল্লাহর নামকে লক্ষ্যবস্তু বানিওনা, যেই শপথের উদ্দেশ্য হ'ল-সৎকাজ,আত্মসংযম বা খোদাভীতি ও মানুষের মাঝে মীমাংসা করে দেয়া থেকে বিরত থাকা । আল্লাহ সবকিছু জানেন ও শোনেন। অবশ্য তোমাদের অর্থহীন শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদের দায়ী করবেন না। কিন্তু তোমাদের মনের সংকল্পের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে দায়ী করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু। বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থে এসেছে রাসুল (সঃ)'র কোন এক সাহাবীর কন্যা ও জামাতার মধ্যে মতভেদ দেখা দিলে জামাতা তাদের সংশোধনের জন্য কিছুই করবেন না বলে শপথ নেন । তখন এ আয়াত নাজিল হয় এবং এতে বলা হয় মানুষের সংশোধনের জন্য দায়িত্ব এড়িয়ে যেও না এবং অর্থহীন শপথের জন্য নিজেকে সৎ কাজ থেকে বঞ্চিত করোনা । আসলে এ ধরনের শপথের কোন মূল্য নেই এবং আল্লাহ এইসব শপথ ভঙ্গের জন্য তাদেরকে ধরবেন না । অমনযোগীতা, উদাসীনতা, চিন্তাভাবনা করা ছাড়া অনিচ্ছাকৃতভাবে যেসব শপথ নেয়া হয় সেসব শপথ ভঙ্গের জন্য আল্লাহ তাদের কোন শাস্তি না দিয়ে তাদেরকে ক্ষমা করবেন । এই দুই আয়াতের শিক্ষা হলো -

প্রথমত : সৎকাজের বাধা সৃষ্টির জন্য শপথ করা যাবে না । আল্লাহর পবিত্র নামকে সম্মান করতে হবে এবং আল্লাহর নামকে মূল্যহীন বা অনর্থক কাজের জন্য ব্যবহার করা যাবে না ।

দ্বিতীয়ত : মানুষ রাগের মাথায় অসাবধানতাবসত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন অপছন্দনীয় কথা বললে আমরা যেন তার প্রতিশোধ না নিয়ে আল্লাহর মতোই অন্যদেরকে মা করি

এবারে সূরা বাকারার ২২৬ ও ২২৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, "যারা নিজ স্ত্রীকে কষ্ট দেয়ার জন্য তাদের থেকে দুরে থাকার শপথ নেয়, তাদেরকে চারমাস অপেক্ষা করতে হবে । এরপর যদি তারা শপথ থেকে ফিরে আসে বা পরস্পর মিলমিশ করে নেয়, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু । আর যদি তারা তালাক দেয়ার সংকল্প করে, তবে আল্লাহ শ্রবণকারী-মহাজ্ঞানী । ইসলাম পূর্বযুগে আরবদের মধ্যে একটি নোংরা প্রথা চালু ছিল। প্রথাটি হলো অনেক স্বামী তাদের স্ত্রীদেরকে শারীরিক ও মানুষিক চাপের মধ্যে রাখার জন্য তাদের কাজ থেকে দুরে থাকার শপথ নিত । এইসব আরব তাদের স্ত্রীদেরকে তালাকও দিত না এবং তাদের সাথে বসবাসও না করে তাদেরকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখত। ইসলাম এই অপছন্দনীয় প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য ঘোষণা দেয় যে, যারা এরকম শপথ করে, তাদেরকে চারমাসের মধ্যেই ত্রীর ব্যাপারে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে অথবা শপথ প্রত্যাহার করে নিয়ে স্বামীর মত জীবন-যাপন করতে হবে। যদি তাদের মধ্যে বনিবনা হওয়ার সুযোগ না থাকে,তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তালাক দিতে হবে। এই দুই আয়াত থেকে আমরা যা যা শিখলাম সংক্ষেপে তা হলো--

প্রথমতঃ কূসংস্কার ও অজ্ঞতা প্রসূত প্রথাগুলো নির্মূল করা সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে নবীগণের অন্যতম দায়িত্ব।

দ্বিতীয়তঃ যদিও পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব স্বামীর। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বামী স্ত্রীকে উত্যক্ত করা ও কষ্ট দেয়ার কোন অধিকার রাখেনা।

তৃতীয়তঃ ইসলাম সমস্ত তিক্ততা সত্ত্বেও তালাককে স্বীকৃতি দেয়-কিন্তু স্ত্রীকে অস্পষ্ট অবস্থার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখাকে কোন অবস্থাতেই মেনে নেয়না অবশ্য ইসলাম এমন তালাককে গ্রহণ করে যা পরিবারের জন্য কল্যাণকর । স্বামী বা স্ত্রীর খামখেয়ালীপনা প্রসূত তালাককে ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না । এ ধরনের তালাকের জন্য কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে জবাবদীহি করতে হবে ।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28