সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

এবারে সুরা বাকারার ২১৭ ও ২১৮ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো । এই আয়াতে বলা হয়েছে, হে নবী তারা আপনাকে হারাম মাসে যুদ্ধ করার বিষয়ে প্রশ্ন করে । আপনি বলুন : তাতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায় । কিন্তু আল্লাহর পথে বাধাদান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, পবিত্র মসজিদে বাধা দেয়া বা মসজিদুল হারামের অবমাননা করা এবং এর বাসিন্দাদের সেখান থেকে বহিস্কার করা, আল্লাহর কাছে আরো বড় বা গুরুতর অন্যায় । কারণ হত্যার চেয়ে অশান্তি গুরুতর। হে বিশ্বাসীরা , তোমরা জেনে রাখ, যদি তারা সম হয় তবে তারা তোমাদেরকে তাদের ধর্ম থেকে ফেরাতে না পারা পর্যন্ত তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত হবে না এবং তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজ ধর্ম থেকে ফিরে যায় এবং কাফের অবস্থায় মারা যায় তার ইহকাল ও পরকাল সবই ব্যর্থ হবে । তারাই দোযখের অধিবাসী এবং সেখানে তারা চিরকাল থাকবে । যারা ঈমান এনেছে এবং যারা আল্লাহর পথে স্বদেশ ত্যাগ করে এবং ধর্মযুদ্ধ করে, তারাই আল্লাহর রহমত বা অনুগ্রহ প্রত্যাশী এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াময়।

আমরা আগেই বলেছিলাম আরবদের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ)এর যুগ থেকে বছরের নির্দিষ্ট চারটি মাসে যুদ্ধ করা নিষিদ্ধ ছিল । ইসলাম এই সুন্দর প্রথাকে গ্রহণ করে । আর তাই রজব, জ্বিলকদ, জিলহজ্ব ও মহররম মাসে যুদ্ধ হারাম করা হয় । এ সম্পর্কে ইতিহাসে জানা যায় রাসুল (সঃ) বদর যুদ্ধের আগে শত্রুদের অবস্থা জানার জন্য ৮ ব্যক্তিকে মক্কায় যেতে বলেছিলেন , পথে এক কুরাইশ কাফেলার সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় । কাফেরদের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ঐ কাফেলায় ছিল । রাসূল (সঃ)র প্রতিনিধিরা রজব মাসে যুদ্ধ করা হারাম হওয়া সত্ত্বেও ঐ কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে কুরাইশ নেতাকে হত্যা করে এবং যুদ্ধ-লব্ধ মালামালসহ কয়েকজনকে বন্দী করে রাসূল (সঃ)'র কাছে নিয়ে আসে । রাসুল (সঃ) এই আচরণে দুঃখিত হয়ে বলেন : আমি তাদের ওপর হামলা করতে তো বলিনি, তাও আবার এই নিষিদ্ধ মাসে ! তাই তিনি গনীমত ও বন্দীদের গ্রহণ করেন নি । অন্যান্য মুসলমানরাও তাদের তিরস্কার করে । শত্রুরা এই অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে অপপ্রচার চালাতে লাগলো যে রাসুল (সঃ) নিষিদ্ধ মাসগুলোতে, যুদ্ধ, রক্তপাত ও বন্দী করাকে বৈধ বলে মনে করেন এবং অন্যান্য মুসলমানদেরকেও এই কাজে উৎসাহিত করছেন । শত্রুদের অপপ্রচারের জবাবে এই আয়াত নাজিল হয় । এই আয়াতে এটা বুঝানো হয়েছে যে নিষিদ্ধ মাসে য্দ্ধু হারাম হলেও এই কাজ রাসূল (সঃ) এর অনুমতি ছাড়াই করা হয়েছে । মুসলিম নেতৃবৃন্দ ইচ্ছা করে এমনটি করেন নি অথচ তোমরা দীর্ঘ অনেক বছর ধরে মুসলমানদের ওপর জুলুম নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছো । তাদেরকে ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছো এবং তাদের জন্য আল্লাহর ঘরের পথ বন্ধ করে দিয়েছো । আর এসব অপরাধ এই হত্যাকান্ডের চেয়ে অনেক বড় অপরাধ । এরপর মুসলমানদেরকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলা হয়েছে যে শত্রুরা তোমাদের ছেড়ে দিয়েছে এমনটি মনে করো না বরং তারা তোমাদের সবসময় ধর্মহীন করার চেষ্টা চালাচ্ছে । তাই জেনে রাখ যারা ঈমান বা বিশ্বাস হারাবে তাদের সব কাজ ব্যর্থ হবে এবং তারা হবে নরকের স্থায়ী বাসিন্দা । অন্যদিকে যেসব মুসলমান তাদের স্বগোত্রের বিধর্মী লোকদের ওপর হামলা চালিয়েছিল তারা আল্লাহর ধর্মের জন্য হিজরত ও জিহাদ করেছে। তাদের কোন পার্থিব উদ্দেশ্য ছিল না বলে আল্লাহহ তাদের ক্ষমা করেছেন । সুরা বাকারার ২১৮ নম্বর আয়াত তাঁদেরকে ক্ষমা ঘোষণা উপলে নাজিল করা হয়েছে । এই দুই আয়াত থেকে আমরা যা যা শিখলাম তা হলো,

প্রথমত : আমরা মুসলমানরা যেন আমাদের তৎপরতা ও আচরণে সতর্ক হই যাতে শত্রুরা আমাদের ভুল থেকে আমাদেরকেই আঘাত হানার সুযোগ না পায়।

দ্বিতীয়ত : যেকোন ঘটনার বিচারের ক্ষেত্রে মূলের দিকে নজর দিতে হবে বাহ্যিক দিক বা শাখা-প্রশাখার দিকে নয় । একজন ষড়যন্ত্রী বা কূটকৌশলী দাঙ্গাবাজ বাহ্যিকভাবে কাউকে হত্যা করে না, কিন্তু তার কাজের পরিণতিতে হত্যা ও সংঘাত সৃষ্টি হয় ।

 

কোরআনের আলো

( ৫৯ তম পর্ব )

কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা বাকারার ২১৯ ও ২২০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমেই এই আয়াত দুটির অর্থ করা যাক । এই আয়াতের অর্থ হ'ল-নবী, তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করছে বলুন এ দুই-ই মহাপাপ, যদিও মানুষের জন্যে কিছু উপকার রয়েছে। কিন্ত তাদের পাপ উপকারের চেয়ে বেশী। একই সাথে তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, কি তারা ব্যয় করবে? বলুনঃ যা উদ্বৃত্ত। এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শন তোমাদের কাছে ব্যক্ত করেন যাতে তোমরা চিন্তা কর। তারা ইহকাল ও পরকাল এবং এতিমদের সম্পর্কে আপনাকে প্রশ্ন করছে-আপনি বলুন- তাদের কল্যাণ সাধন করাই উত্তম। যদি তাদের সাথে তোমরা জীবন-যাপন কর তবে তাতে কোন বাধা নেই। তারা তোমাদের ভাই, আল্লাহ জানেন কে কল্যাণকারী ও কে অনিষ্টকারী। যদি আল্লাহ ইচ্ছে করতেন তবে তিনি তোমাদের বিপদে ফেলতেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রান্ত ও বিজ্ঞানময়। এই দুই আয়াতে তিনটি ভিন্ন বিষয়ে রাসূল (সঃ)'র কাছে উত্থাপিত মুসলমানদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছে, এভাবে রাসূল (সঃ) নিজে উত্তর না দিয়ে ঐশী প্রত্যাদেশ বা ওহীর মাধ্যমেই জবাব দিলেন। ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবদের মধ্যে যেসব নোংরা প্রথা চালু ছিল, সে সবের মধ্যে মদপান ও জুয়াখেলা ছিল অন্যতম। তাই অনেক মুসলমান মদ ও জুয়া সম্পর্কে রাসূল (সঃ)কে প্রশ্ন করে। রাসূল (সঃ) ওহীর মাধ্যমে তাদের জানিয়ে দেন যে,আঙ্গুরের চাষ ও তা থেকে মদ তৈরি ও বিক্রিতে কারো কারো অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে এবং জুয়া খেলাতেও কোন এক প বেশী অর্থ-লাভ করে। কিন্ত তা সত্ত্বেও এ দু'টি বিষয়ের অপবিত্রতা ও নোংরামী বা তির দিক বাহ্যিক লাভের চেয়ে অনেক বেশী। তাই এ দু'টি কাজ থেকে দূরে থাকা উচিত। মুসলমানদের অন্য একটি প্রশ্ন ছিল অন্যদের দান বা সাহায্যের পরিমান সম্পর্কিত অর্থাৎ কাদেরকে কোন জিনিষ কতটুকু দান করতে হবে। এই প্রশ্নের উত্তরও রাসূল (সঃ)নিজে না দিয়ে ঐশী প্রত্যাদেশের মাধ্যমে বর্ণনা করেন। রাসূল (সঃ) কে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন-এটা বলতে যে, যা কিছু প্রয়োজনের চেয়ে বেশী তা-ই যেন দান করা হয়। আর এমনভাবে দান কর যাতে নিজেও অভাবগ্রস্ত না হও এবং গরীবরাও উপেতি না হয়। অর্থাৎ মধ্যপস্থা অবলম্বন করতে হবে। রাসূল (সঃ)'র কাছে আরো একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল এতিমদের দেখা-শুনা সম্পর্কে। এতিমের সম্পদের সাথে নিজেদের সম্পদ মিশে যাবে-এই ভয়ে অনেকেই এতিমদের সম্পদ, এমনকি তাদের খাবার ও থালা-বাটিও আলাদা করে রাখতো। এরফলে এতিমদের জন্য অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়। রাসূলে খোদা ওহীর মাধ্যমে তাদের বলেন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ'ল এতিমের স্বার্থ। তাই এমনভাবে তাদের দেখা-শোনা ও তত্ত্বাবধান করতে হবে যাতে তাদের কল্যাণ হয়। এতিমদের সম্পদ ও মাল নিজেদের সম্পদের সাথে মিশে যাবে এই ভয়ে তাদেরকে পরিচালনার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কিংবা তাদেরকে একাকী ছেড়ে দেয়া ঠিক হবেনা। এতিমদের সাথে একত্রে জীবন-যাপনের ফলে যদি তাদের সম্পদের ধ্বংস সাধন না হয়-বা তাদের সম্পদ আত্মসাৎ বা অপব্যবহারের কুমতলব না থাকে তাহলে এতে কোন বাধা নেই আল্লাহ সবার কাজই লক্ষ্য করছেন-কারা এতিমের স্বার্থ চায় বা কারা দূর্নীতি করছে আল্লাহ তা বুঝতে পারেন। আল্লাহ মানুষকে এতিমের সম্পদ থেকে নিজেদের সম্পদ আলাদা করার নির্দেশ দিয়ে ঝামেলায় ফেলতে চাননা।

এই আয়াত থেকে আমরা যা যা শিখলাম তা হ'ল-

প্রথমতঃ পেশা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ল্য রাখতে হবে-মদ তৈরি ও বিক্রি বা জুয়াখেলার মত কাজ মানুষের মন ও আত্মার জন্য তিকর । যদিও এসবের মাধ্যমে অনেক অর্থ উপার্জন করা যায়।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next