সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

দ্বিতীয়ত : পারিবারিক ও সামাজিক বিষয়ে মতভেদ দূর করার সবচেয়ে ভালো পন্থা হল খোদায়ী বিধানের কাছে নিজেকে সমর্পন করা ।

এবারে সুরা বাকারার ২১৪ নম্বর আয়াতের অর্থ করা যাক : এই আয়াতের অর্থ হলো " হে বিশ্বাসীরা তোমারা কি মনে করেছ যে এমনিতেই বেহেশতে প্রবেশ করবে ? অথচ তোমরা এখনও তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা প্রাপ্ত হওনি ? বিপদ ও দুঃখ তাদের স্পর্শ করেছিল এবং তারা এত ভীত ও কম্পিত হয়েছিল যে রাসূল ও বিশ্বাসীরা বলে উঠেছিল আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে ? সতর্ক হও, নিশ্চই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী । পূর্ববর্তী আয়াতে মুক্তি ও সৌভাগ্যলাভে এবং মতভেদ মীমাংসার ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি ঈমানের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে । আর এই আয়াতের বলা হল শুধু বিশ্বাস বা ঈমানই যথেষ্ট নয় । বিপদে ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতেও আল্লাহর পথে চলা ত্যাগ করা যাবে না । কারণ, সমস্ত বিপদ- আপদ হল পরীক্ষার মাধ্যম । ব্যক্তির ঈমানের গভীরতা এসব পরীক্ষার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তা হলো-

সমস্ত মানুষকে পরীক্ষা করা আল্লাহরই রীতি যাতে প্রত্যেকেই তাদের প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে জানতে পারে । সবশেষে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি আমরা যেন অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর অনুগ্রহকে অস্বীকার না করি । শত্রুদের উপহাস ও বিদ্রুপকে যেন আমরা ধৈর্য দিয়ে মোকাবেলা করি । একইসাথে আমরা যেন আল্লাহর আইনের কাছে পুরোপুরি নিজেদেরকে সমর্পন করি এবং কোন কঠিন বিপদের কারণে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস যেন না হারাই ।

 

কোরআনের আলো

( ৫৮ তম পর্ব )

কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা ২১৫ ,২১৬ , ২১৭ ও ২১৮ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো । প্রথমে সুরা বাকারার ২১৫ নম্বর আয়াতের অর্থ করা যাক । এই আয়াতে বলা হয়েছে, " হে নবী, তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করছে, তারা কিভাবে ব্যয় করবে ? আপনি বলুন : তোমরা ধন-সম্পত্তি থেকে যা ব্যয় করবে তা পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, পিতৃহীন ও পর্যটকদের জন্য ব্যয় কর । তোমরা যেসব সৎকাজ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত আছেন " । বঞ্চিতদের সহায়তা করা ও তাদের দিকে লক্ষ্য রাখা মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যা কোরআনের বহু আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে । তাই ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা রাসূল (স:)র কাছে প্রশ্ন করেছিল কাকে ও কতটুকু দান করা যাবে ? দানের পরিমান ও ধরণ স্পষ্ট ও স্থির নয় বলে এটা নির্ভর করে মানুষের ক্ষমতা ও অভাবগ্রস্থের চাহিদার পরিমানের ওপর । তাই এ প্রশ্নের উত্তরে কোরআন বলেছে : দানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রয়োজনীয় ও লাভজনক বিষয় দান করা, তা যাকেই যত পরিমানেই দেয়া হোক না কেন এ ক্ষেত্রে সবার দিকেই লক্ষ রাখতে হবে বয়স্ক বাবা ও মা নিজ পরিবারের অভাবগ্রস্তসহ দরিদ্র আত্মীয় স্বজন এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেনীর লোক সাহায্য বা দানের মুখাপেক্ষী । আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে শুধু দান নয় অন্যদের জন্য কল্যাণকর যেকোন কাজ সম্পর্কে আল্লাহ অবহিত । তাই মানুষকে নিজের সৎকাজের বিষয় জানানোর চেষ্ঠা না করে গোপনে দান খয়রাতের চেষ্টা করাই বেশি আন্তরিকতার পরিচায়ক । তাহলে এই আয়াত থেকে আমরা এটা শিখলাম যে দান ও সাহায্যের ক্ষেত্রে বাবা-মা ও আত্মীয় স্বজন অন্যদের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে এবং সৎকাজের ফল কখনও নষ্ট হয়না তা কেউ জানুক বা নাজুক

এবারে সুরা বাকারার ২১৬ নম্বর আয়াতের অর্থ করা যাক । এই আয়াতে বলা হয়েছে, "তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেয়া হল যদিও তোমাদের কাছে এটা আনন্দদায়ক নয় । কিন্তু তোমরা যা পছন্দ করনা সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর । আল্লাহ যা জানেন তোমরা তা জাননা"। ধর্ম রার জন্য শত্রুদের সাথে লড়াই করা মুমিনদের জন্য ওয়াজিব । কিন্তু মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ পছন্দ করে এবং যুদ্ধকে মৃত্যু, আহত হওয়া, ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ বলে মনে করে । এই আয়াতে বলা হয়েছে যদিও শত্রুর সাথে মোকাবেলা করা কঠিন এবং যুদ্ধ আনন্দদায়ক নয় । কিন্তু মানুষের পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ রয়েছে এরই মধ্যে । তারা মানুষের প্রবৃত্তির আকাঙ্খার আলোকে যেন খোদার নির্দেশ ও বিধানকে মন্দ বা ক্ষতিকারক বলে মনে না করে । যেমন শিশুরা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ঔষধ দেয়াকে ভয় পায় বলে ইঞ্জেকশন নিতে আগ্রহী নয় অথচ তার সুস্থতা ও জীবন এর ওপর নির্ভর করে । অথচ শিশুটি হয়তো এমন এক সুস্বাদু খাবার পছন্দ করে যা অসুখের সময় তার জন্য তিকারক । তাই সব আনন্দই ভাল নয় এবং সব কষ্টই মন্দ নয় । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তা হলো,

প্রথমত : ভাল ও মন্দের মানদন্ড মানুষের প্রবৃত্তি নির্ভর হওয়া উচিত । একমাত্র আল্লাহর বিধান বা নির্দেশই মানুষের স্বার্থ ও কল্যাণের মানদন্ড

দ্বিতীয়ত : মানুষের জ্ঞান সীমিত এবং আল্লাহর জ্ঞান অসীম । তাই আল্লাহর বিধানের কাছে আমাদের আত্মসমর্পন করা উচিত । আমরা আল্লাহর নির্দেশনার উপকারীতা বুঝতে না পারলেও এবং আল্লাহর নির্দেশনার বাস্তবায়ন কঠিন হলেও আল্লাহর বিধানের কাছে আমাদের আত্মসমর্পন করতে হবে ।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next