সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

প্রথমতঃ একমাত্র আল্লাহর প্রতি প্রকৃত ঈমানের মাধ্যমেই শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব । আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ছাড়া মানুষের গড়া আইনের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর মানুষ যুদ্ধ ও অশান্তি থেকে রেহাই পাবে না ।

দ্বিতীয়তঃ শয়তান ঐক্যের শত্রু । যেকোন ধরনের বিচ্ছিন্নতার আহবান শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে উদ্ভূত ।

এবারে সুরা বাকারার ২১০ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক। এই আয়াতের অর্থ হল তারা কি এজন্যেই অপেক্ষা করছে যে এতসব সুস্পষ্ট নিদর্শন থাকা সত্ত্বে ও আল্লাহ মেঘের ছায়ায় ফেরেশতাসহ তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে নতুন প্রমাণও নিদর্শন দেখাবেন ? অথচ আল্লাহ পথ-প্রদর্শনের কাজ সম্পন্ন করেছেন । আর সব কিছু আল্লাহরই কাছে ফিরে যাবে । অনেক মানুষেরই আশা যে তারা আল্লাহ ও ফেরেশতাদের দেখবেন এবং তাঁদের কথা শুনে ঈমান আনবেন ! অথচ এটা অসম্ভব এক বিষয়। আল্লাহ ও ফেরেশতা শরীরধারী কেউ নন যে তাঁদের দেখা যাবে । আল্লাহ মানুষকে বিবেক দেয়া ছাড়াও তাদের জন্য কোরআন নাজেল করেছেন । এভাবে মানুষকে সুপথ দেখানোর কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন । তাই স্থুল বুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষের অদ্ভুত আব্দার বাস্তবায়নের কোন প্রয়োজন নেই। এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখতে পারি তা হলো ইন্দ্রিয় অনুভূতি দিয়ে আল্লাহকে দেখার ইচ্ছা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য । আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস বা ঈমানের তখনই মূল্য থাকে যখন তা যুক্তি ও মানুষের প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত হয়। আল্লাহ আমাদেরকে প্রকৃত ঈমানদার হবার তৌফিক দিন ।

কোরআনের আলো

( ৫৭ তম পর্ব )

কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা বাকারার ২১১ নম্বর আয়াত থেকে ২১৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো । প্রথমে সুরা বাকারার ২১১ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক । এই আয়াতের অর্থ হলো " হে নবী, ইসরাইল বংশধরদের জিজ্ঞাসা করুন আমি তোমাদেরকে কত প্রকাশ্য বা স্পষ্ট নিদর্শন দান করেছি এবং যে কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ আসার পর তার পরিবর্তন করলে আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর । ইতিহাস, শিক্ষা বা অভিজ্ঞতালাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম । আল্লাহ বনী ইসরাইল জাতিকে অনেক আধ্যাত্মিক ও বৈষয়কি নেয়ামত দিয়েছেন । আল্লাহ, ইহুদীদের জন্য মূসা ( আঃ) এর মত ত্রানকর্তা পাঠিয়েছিলেন

যিনি ইহুদিদেরকে ফেরাউনের উৎপীড়ন থেকে মুক্তি দেন । একইসাথে ইহুদিরা পার্থিব জীবনযাপনের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল । কিন্তু আল্লাহর দেয়া সুযোগ সুবিধা ও অনুগ্রহকে তারা নিজেদের বিচ্যুতি ও পাপের সাথে ব্যয় করেছে । তারা আল্লাহর ইবাদতের পরিবর্তে বাছুর পুজা শুরু করেছিল এবং তারা মুসা(আঃ)র কাছে না গিয়ে সামেরীর কাছে গিয়েছিল । আর তাই, আল্লাহ তাদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তারা এ পৃথিবীতেই বিপর্যস্ত হয় । বর্তমানেও শিল্প-সমৃদ্ধ বিশ্বে মানুষ অনেক সূযোগ-সুবিধার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে থাকায় তারা পাপ, আত্মহনন ও বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে।

এবারে সুরা বাকারার ২১২ নম্বর আয়াতের অর্থ করা যাক । "যারা অবিশ্বাস করছে, তাদের পার্থিব জীবন সু-শোভিত করা হয়েছে এবং এজন্যে তারা বিশ্বাসীদেরকে ঠাট্টা করে থাকে । অথচ কিয়ামতে বা উত্থান দিবসে তাদের সমুন্নত করা হবে । আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করেন । দুনিয়ার চাকচিক্য কাফেরদের কাছে কত মোহনীয় যে তারা এজন্যে অহংকারী হয়ে পড়ে এবং বিশ্বাসীরা দুনিয়ার চাকচিক্যকে নির্বোধ বা বোকা বলে ঠাট্টা করে । অথচ মানুষের মর্যাদার মাধ্যম হলো ঈমান ও খোদাভীতির মত আধ্যাত্মিক ও ঐশী মূল্যবোধ । " এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তাহলো দুনিয়ার প্রীতি বা দুনিয়া পুজার ফলে মানুষ নিজেকে বড় ভাবতে শিখে এবং অন্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে অন্যদিকে খোদাভীরুতা ও আল্লাহর প্রেম দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্য লাভের মাধ্যম এবং আল্লাহর অশেষ দয়া লাভের পাথেয় ।

এবারে সুরা বাকারার ২১৩ নম্বর আয়াতের অর্থ করা যাক । এই আয়াতে আল্লাহ বলেছেন মানবজাতি শুরুতে একই সম্প্রদায়ভূক্ত ছিল । এরপর তাদের মধ্যে বিভিন্ন সমাজ ও মতভেদ সৃষ্টি হলে আল্লাহ নবীদেরকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠান । মানুষের মধ্যে যে বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল তার মীমাংসার জন্য তিনি তাদের সাথে সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেন এবং যাদের তা দেয়া হয়েছিল, প্রকাশ্য নিদর্শন তাদের কাছে আসার পর তারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশত: বিরোধীতা করতো । যারা বিশ্বাস করে, তারা যে বিষয়ে ভিন্নমত পোষন করতো, আল্লাহ তাদের সে বিষয়ে নিজ অনুগ্রহে সত্যপথে পরিচালিত করেন, আর অবিশ্বাসীরা বিভ্রান্তি ও বির্তকে ডুবে রইল । আল্লাহ যাকে ইচ্ছে সরল পথে পরিচালিত করেন । এই আয়াতে মানব-সমাজ পরিচালনায় ধর্ম ও ঐশী আইনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে মানুষ প্রথমদিকে সহজসরল ও স্বল্প পরিসরের জীবন যাপন করত। কিন্তু মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জাতি ও গোত্র সৃষ্টির পর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে মতভেদ ও বিরোধ দেখা দেয় । ফলে মানুষের জন্য শাসক ও আইনের প্রয়োজন দেখা দেয় । ঠিক এ কারণেই মানুষকে পথ প্রদর্শন ও মুক্তি দেয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী বা পয়গম্বর পাঠানো হয়েছে। তাঁরা আল্লাহর কিতাব বা আইন অনুযায়ী বিচার ও শাসন পরিচালনা করতেন । যদিও তাঁরা সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাতেন, কিন্তু বহু মানুষ হিংসা ও বিদ্বেষবশত: নবীদের মোকাবেলায় গোয়ার্তুমী করত এবং তারা সত্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত হত না । অন্যদিকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মানুষেরা পরকাল ও নবীর প্রতি বিশ্বাসের কারণে ঐক্যবদ্ধভাবে ও শান্তিতে থাকতো এবং সত্য ও মুক্তির পথে চলতো । আর অবিশ্বাসীরা পার্থিব বিষয়ে মতভেদের কারনেই বিচ্যুতি বা বিভ্রান্তি থেকে কখনও মুক্তি পায় নি । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখতে পারি তা হলো :

প্রথমত : সমাজ আইন ও শাসকের মুখাপেক্ষী । আর সবচেয়ে ভালো আইন হলো ধর্মীয় গ্রন্থের আইন এবং শ্রেষ্ঠ শাসক হলেন নবী ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next