সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

সূরা বাকারার ২০৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "বিশ্বাসীদের প্রতি কপট বিশ্বাসীদের শত্রুতার লক্ষণ হলো, যখন তারা ক্ষমতা লাভ করে তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তুর বংশ নিপাতের চেষ্টা করে। অথচ আল্লাহ অশান্তি সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।" কিছু লোক আছে যারা সুন্দর সুন্দর কথা ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলে যে, যদি আমরা মতা পাই তাহলে আমরা সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে জনগণকে বেহেশতের সুখ পাইয়ে দেব। কিন্তু যখন তারা ক্ষমতা লাভ করে তখন তারা নিজেদের স্বার্থপূরণের জন্য জনগনের জীবনকে দূর্বিসহ করে তোলে। সমাজের অর্থনীতিকে ধ্বংসের পাশাপাশি তারা যুব প্রজন্মকেও বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দেয়। পবিত্র কোরআনের অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, "যখনই সৎ লোকেরা শাসন-ক্ষমতা লাভ করে, তারা জনগনের ধর্মীয় ও পার্থিব কুসংস্কার নির্মূলের চেষ্টা করে,তারা আল্লাহর সাথে সম্পর্কের সুন্দরতম মাধ্যম নামাজকে সমাজে জোরদার করে এবং জনগণ ও বঞ্চিতদের সম্পর্ক তথা জাকাতেরও প্রসার ঘটায়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, কারো সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে শুধু তাদের বক্তব্যের দিকে লক্ষ্য না করে তাদের কাজ কর্ম কেমন তাও লক্ষ্য রাখতে হবে। দেখতে হবে তারা কি সমাজের কল্যাণে কাজ করেছে? নাকি সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিচ্ছে। #

 

কোরআনের আলো

( ৫৬তম পর্ব )

কোরআনের আলোর এবারের পর্বে আমরা সূরা বাকারার ২০৬ থেকে ২১০ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমেই সূরা বাকারার ২০৬ ও ২০৭ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক। সূরা বাকারার ২০৬ থেকে ২১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "যখন অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বলা হয় তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং অশান্তি সৃষ্টি করো না, তখন তাদের একগুয়েমী বৃদ্ধি পায়। অহংকার ও বিদ্বেষ তাদেরকে পাপের দিকে আকৃষ্ট করে। দোযখের আগুন তাদের জন্য যথেষ্ট এবং নিশ্চয়ই তা নিকৃষ্ট আশ্রয়স্থল। কিন্তু মানুষের মধ্যে অনেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজেদের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে। আল্লাহ তার দাসদের প্রতি দয়াশীল।"

ধোঁকাবাজ মুনাফিকদের অশান্তি ও অত্যাচার সম্পর্কে পূর্ববর্তী আয়াতের সূত্র ধরে ২০৬ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের দম্ভ ও অহংকারের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, যদি কেউ তাদেরকে সতর্ক করতে যায় এবং অশ্লীল কাজ বন্ধ করতে বলে তাহলে তারা পরামর্শতো শুনেই না বরং তারা তাদের একগুঁয়েমীপনা ও অশ্লীলতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। এমনকি তারা যা খুশী তা-ই করতে প্রস্তুত হয়। অন্যদিকে এসব দুনিয়া পূজারী ও দাম্ভিক লোকদের বিপরীতে এমন অনেক পবিত্র মানুষ আছেন যারা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দেয়। বিভিন্ন তাফসীরে বলা হয়েছে যখন মক্কার মুশরিকরা রাতের বেলায় রাসূল (সাঃ) এর ঘরে হামলা করে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আল্লাহর রাসূল ওহীর মাধ্যমে তাদের ষড়যন্ত্র জেনে ফেলেন এবং মক্কা থেকে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। রাসূল তার ঘরে নেই এটা যাতে শত্রুরা বুঝতে না পারে সেজন্যে হযরত (আঃ) রাসূলকে রার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার উদ্যোগ নেন। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সূরা বাকারার ২০৭ নম্বর আয়াত নাজিল হয়। ইতিহাসে এই রাত লাইলাতুল মাবাইত বা উন্মুক্ত আকাশের নীচে রাত্রিযাপন নামে বিখ্যাত। এই আয়াত থেকে আমরা যা যা শিখলাম তা হলো-

প্রথমতঃ অপরাধ বা পাপের পুনরাবৃত্তির অন্যতম কারণ হল সত্যের মোকাবেলায় বিদ্বেষ, একগুয়েমী এবং অহংকার । ফলে মানুষ পাপের কারণে লজ্জিত ও মাপ্রার্থী না হয়ে আরো বেশী পাপ করতে থাকে ।

দ্বিতীয়ত : মুমিন হল কাজে বিশ্বাসী । মুমিন আল্লাহর সাথে লেন-দেন করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সচেষ্ট থাকে, কিন্তু মুনাফিকরা পার্থিব বিষয়ের সাথে লেন-দেন করে এবং তারা মানুষের সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় রয়েছে।

এবারে সুরা বাকারার ২০৮ ও ২০৯ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক । এই আয়াতের অর্থ হলো হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা পুরোপুরি ইসলাম গ্রহণ কর এবং শয়তানের পথ অনুসরণ করো না , নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। কিন্তু তোমাদের কাছে উজ্জল নিদর্শনাবলী আসার পরও যদি তোমরা পথভ্রষ্ট হও, তবে জেনে রাখ যে আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময় । এই আয়াতে সমস্ত মুমিনদের শান্তির দিকে আহবান জানানো হয়েছে যাতে ইসলামী সমাজ হয় ঐক্যবদ্ধ এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও একইসাথে এরফলে ইসলামী সমাজ থেকে যেন দ্বন্দ ও বিবাদ দূরীভূত হয় । কারন, দ্বন্দ্ব ও বিবাদ হলো শত্রুতা ও বিভেদ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য শয়তানের প্রধান অস্ত্র । মূলত : বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা ও সম্পদের মত বাহ্যিক পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো মানুষের মধ্যে কর্তৃত্ব সৃষ্টি ও বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যম । শূধু আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসই মানুষের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করতে পারে এবং এভাবে সমাজে ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে । বিবেক ও ঐশী নির্দেশনার সুস্পষ্ট যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতেই শয়তানের পদপেগুলো থেকে দূরে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে, তাই যেসব পদপে ইসলামী সমাজের নিরাপত্তা ও শান্তিকে বিঘ্ন করে তা ঈমান থেকে বিচ্যুতির লক্ষণ । যারা এ ধরনের তৎপরতা চালায় তাদের জানা উচিত যে তাদেরকে মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময় আল্লাহর মুখোমুখী হতে হবে । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখতে পারি তাহলো -



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next