সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

দান-খয়রাত ও জিহাদ সম্পর্কিত আয়াতের পর এবারে আমরা সূরা বাকারার হজ্ব সম্পর্কিত আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা করবো। প্রথমেই সূরা বাকারার ১৯৬ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব ও ওমরা পূর্ণ কর। কিন্তু যদি বাধা প্রাপ্ত হওয়ায় এহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করতে না পার তাহলে যা সহজ প্রাপ্য তা-ই কোরবাণী বা উৎসর্গ কর এবং এহরাম ছেড়ে দাও। আর বৈধস্থানে কোরবাণী না হওয়া পর্যন্ত তোমরা মাথা মুন্ডন করো না। তবে কেউ যদি অসুস্থ থাকে অথবা তার মাথায় যন্ত্রণা হওয়ায় শীঘ্রই মাথা মুড়াতে বাধ্য হয়, তাহলে সে রোজা বা সদকা কিংবা কোরবানী দিয়ে এর বিনিময় করবে। যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্বের সময় ওমরা থেকে লাভবান হতে চায়, সে সহজলভ্য কোরবানী করবে। কিন্তু যদি কেউ তা না পায়, তবে তাকে হজ্বের সময় তিন দিন এবং ঘরে ফেরার পর সাত দিন এই পূর্ণ দশ দিন রোজা পালন করতে হবে। এটা তাদের জন্য যাদের পরিজনবর্গ মসজিদুল হারামের বাসিন্দা নয়। আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে আল্লাহ মন্দ কাজের শাস্তি দানে কঠোর।" হজ্ব অনুষ্ঠানের প্রচলনকারী হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। তার যুগেই আরবদের মধ্যে হজ্ব প্রচলিত হয়। ইসলামও এই অনুষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেয়। প্রত্যেক স্বচ্ছল মুসলমানের জন্য সামর্থ থাকলে জীবনে একবার হজ্ব করা ফরজ। কিন্তু ওমরা বা জিয়ারত শুধু তার জন্যই ওয়াজেব হবে যে মক্কায় প্রবেশ করেছে এবং তাকে নামাজ পড়া ও আল্লাহর ঘর প্রদণি বা তাওয়াফসহ কিছু সংপ্তি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হবে। হজ্ব ও ওমরার নির্দেশ বর্ণনা করতে গিয়ে এক্ষেত্রে সম্ভাব্য কিছু সমস্যার ক্ষেত্রে সহজ বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায় আল্লাহ মানুষের শক্তি ও সামর্থের সীমা অনুযায়ী ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন। আল্লাহ মানুষের মতার বাইরে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু চাপিয়ে দিতে চান না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতির আলোকে ইসলাম বিভিন্ন নির্দেশ বা বিধান দিয়েছে। যারা হজ্বের অনুষ্ঠানাদি পালনে অক্ষম তারা সেক্ষেত্রে রোজা রাখতে পারেন অথবা সদকা দিতে পারেন কিংবা কোরবানীর গোশত গরীবদের মধ্যে বিতরণ করতে পারেন।

এবারে সূরা বাকারার ১৯৭ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এআয়াতে বলা হয়েছে, "হজ্বের মাসগুলো সুনির্ধারিত। যে কেউ এই মাসগুলোতে হজ্ব করা তার কর্তব্য বলে মনে করে, তার জন্য হজ্বের সময় স্ত্রী-গমন, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। তোমরা উত্তম কাজের যা কিছু কর, আল্লাহ তা জানেন। তাই তোমরা পাথেয়ের ব্যবস্থা কর। আত্ম সংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে বোধ সম্পন্ন মানুষ! তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।"

হজ্ব প্রতিবছর একবার এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। যারা হজ্বে যাবেন তাদেরকে প্রথম থেকেই পবিত্রতা ও আত্মসংযমকে এই আধ্যাত্মিক সফরের পাথেয় করতে হবে এবং শুধু সংকাজে লিপ্ত হলেই চলবে না অন্যায় ও দ্বন্দ্ব বিবাদ থেকেও দূরে থাকতে হবে। এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মক্কা হচ্ছে নিরাপত্তা, ঐক্য ও ইবাদতের স্থান। তাই হজ্বের সময় সবধরণের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অপরাধ, স্ত্রী গমণ প্রভৃতি থেকে দূরে থাকতে হবে যাতে আল্লাহমুখী পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

এবারে সূরা বাকারার ১৯৮ ও ১৯৯ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এতে বলা হয়েছে, "হজ্বের সময় ব্যবসা বাণিজ্য বৈধ এবং এ মাসে তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করাতে তোমাদের কোন পাপ নেই। যখন তোমরা আরাফাত থেকে দ্রুতগতিতে ফিরবে তখন মাশয়ারুল হারামে পৌঁছে আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তিনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন ঠিক সেভাবে তাকে স্মরণ করবে। যদিও আগে তোমরা বিভ্রান্তদের অন্তর্ভূক্ত ছিলে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন। এরপর অন্যান্য লোক যেখান থেকে দ্রুত গতিতে ফিরে আসে সেখানে থেকে তোমরাও দ্রুতগতিতে ফিরে আসবে। আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" আগের আয়াতে বলা হয়েছে, যেসব কাজে মুসলমানদের ঐক্য ও নিরাপত্তাকে হজ্বের সময় হুমকীগ্রস্ত বা বিপদাপন্ন করতে পারে সেগুলো করা নিষিদ্ধ। কিন্তু এই আয়াতে অজ্ঞতার যুগের আরবদের বিশ্বাসের বিপরীতে হজ্বের মর্যাদা ও বিকাশের জন্য দরকার এমনসব অর্থনৈতিক লেনদেন বা কাজকে শুধু বৈধই নয় একই সাথে জরুরী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর হজ্বের অন্য একটি বিধানকে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আরাফাত থেকে মাশয়ারুল হারাম নামক এলাকার দিকে যাওয়ার পথে প্রথমত: সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে এবং তিনি কিভাবে মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি দিয়ে সুপথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন, তা নিয়ে ভাবতে হবে। দ্বিতীয়ত: সবার সাথে দলবদ্ধ হয়ে যেতে হবে। নিজের জন্য কোন অগ্রাধিকার চর্চা করা যাবে না। এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে,

প্রথমতঃ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম এবং হজ্বের মত ইবাদতের পাশাপাশি জীবিকা অর্জন ও বৈষয়িক জীবনের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ হজ্বের সফরের সময় বস্তুগত নেয়ামত ভোগ করা যাবে, কিন্তু আল্লাহকে স্মরণের ক্ষেত্রে অবহেলা করা যাবে না।

তৃতীয়তঃ হজ্বের সময় ব্যক্তির পদ ও খ্যাতির ব্যবহার করা যাবে না। সবাইকে একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এ অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। #

 

কোরআনের আলো



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next