সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

এবারে এ আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা যাক।

প্রথমতঃ আল্লাহ সমস্ত মানুষের এবং সব কিছুরই আল্লাহ। তিনি কোন বিশেষ ধর্ম বা জাতির একক খোদা নন। কোন ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী তার কাছে বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত নন। শুধুমাত্র মানুষের নিজের কাজই তাকে আল্লাহর কাছে বা দূরে সরিয়ে নেয়।

দ্বিতীয়তঃ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা বিকৃত করা মানব প্রজন্মের প্রতি সাংস্কৃতিক জুলুম। পবিত্র কোরআনে এই অত্যাচারকে বৃহত্তম অত্যাচার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয়তঃ নিজের অবদান বা কাজ নিয়ে চিন্তা করা উচিত। অতীতের পূর্ব পুরুষদের নিয়ে গর্ব অহঙ্কার করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। কারণ তাদের ভালো কাজের জন্য আমরা যেমন কোন পুরস্কার পাব না, তেমনি তাদের অন্যায়ের জন্যেও আমরা শাস্তিও পাব না।

চতুর্থতঃ আল্লাহ যেদিকে ফিরে ইবাদত করার নির্দেশ দিবেন সেদিকেই কেবলা করবো। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ সেদিকেই আছেন। তাই অতীতে বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে ফিরে ইবাদত করা ও পরে কাবার দিকে ফিরে ইবাদত করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কারণ আল্লাহর নির্দেশেই এ দুই স্থানকে কেবলা করা হয়েছে-আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নয়। #

কোরআনের আলো

( ৪২তম পর্ব )

কোরআনের আলোর এবারের পর্বে সূরা বাকারার ১৪৩ থেকে ১৪৭ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। ১৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "এভাবেই তোমাদেরকে মধ্যপন্থী এক আদর্শ জাতিরুপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষী স্বরুপ হতে পার এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পারে। (হে রাসূল) তুমি এ যাবত যে কেবলা অনুসরণ করেছিলে, তাকে এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম-যাতে জানতে পারি কে রাসূলের অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়। আল্লাহ যাদের সৎ পথে পরিচালিত করেছেন তারা ব্যতীত অপরের নিকট তা নিশ্চয় কঠিন। আল্লাহ এরূপ নন যে তোমাদের বিশ্বাসকে ব্যর্থ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি স্নেহশীল দয়াময়। "

গত পর্বে কেবলা পরিবর্তন সম্পর্কে ইহুদীদের আপত্তিগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তখন আপনারা জেনেছেন যে, আল্লাহ কিভাবে এসব আপত্তির জবাব দিয়েছেন। আল্লাহ এ আপত্তির জবাবে বলেছেন, পূর্ব পশ্চিম আল্লাহরই মালিকানাধীন। আল্লাহর নির্দেশিত সরল পথে চলার মধ্যেই রয়েছে মুক্তি বা সুপথ। এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই যে আল্লাহ পূর্বে অথবা পশ্চিমে বিরাজ করছেন এবং শুধু সেদিকেই মুখ ফেরাতে হবে। এই আয়াতে মুসলিম জাতিকে সব ধরণের চরম পন্থা থেকে মুক্ত মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলিম জাতি জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে বস্তুগত,অর্থনৈতিক, আধ্যাত্মিক, বিশ্বাসগত প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্যের সীমানার মধ্যে রয়েছে। এ আদর্শ সমগ্র মানবজাতির জন্য উপযোগী। এটা স্পষ্ট সমস্ত মুসলমান এরকম নয় এবং মুসলমানদের অনেকেই চিন্তা অথবা কাজে চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ির মধ্যে রয়েছে। তাহলে এ আয়াতের মূল উদ্দেশ্য কি?

এই আয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো এটা বোঝানো যে ইসলামী বিধান বা ধর্ম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী ধর্ম। কেউ যদি ইসলামের সমস্ত বিধান মেনে চলে, তাহলে একমাত্র সেই এমন অবস্থানে উপনীত হবে যে আল্লাহ তাকে মানুষের জন্য তার নিজের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করবেন। যেমনটি রাসূল (সাঃ)এর আহলে বাইতগণ ঐশী নির্দেশনাবলীর প্রথম বাস্তবায়নকারী ও বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং সত্যিকারের মুসলিম জাতির পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী বা আদর্শ ছিলেন। তারা বলেছেন, মধ্যপন্থী জাতি বলে আল্লাহ যাদেরকে মানুষের ওপর তার নিজের সাক্ষী বলে ঘোষণা করেছেন, আমরাই হলাম সেই জাতি। এই আয়াতের পরবর্তী অংশে অন্য যে গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলো কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ আল্লাহর অন্যান্য নির্দেশের মতই একটি নির্দেশ ও পরীক্ষা-যাতে এটা জানা যায় যে কারা আল্লাহর অনুগত এবং কারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুগত। আর এ জন্যেই যারা আল্লাহর পথ নির্দেশনা বা হেদায়াত থেকে বঞ্চিত তাদের জন্য এ নির্দেশ পালন করা কঠিন এবং তারা এ ক্ষেত্রে আপত্তি ও প্রশ্ন তুলছে।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next