সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

এবারে সূরা বাকারার ১৯১ ও ১৯২ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে, "যেখানেই তাদের পাবে হত্যা করবে এবং যেখান থেকে তারা তোমাদের বহিস্কার করেছে, তোমরাও সেখান থেকে তাদের বহিস্কার করবে। অশান্তি হত্যার চেয়ে গুরুতর। তোমরা কাবা শরীফ বা পবিত্রতম মসজিদের কাছে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে না, যে পর্যন্ত সেখানে তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে। যদি তারা যুদ্ধ শুরু করে তবে তাদেরকে হত্যা কর, অবিশ্বাসীদের জন্য ইহলোকে এটাই প্রতিফল, যদি তারা বিরত হয় তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।"

এই আয়াতে মক্কার মুশরিকদের বিরুদ্ধে তাদেরই কাজের অনুরূপ আচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ তারা মুসলমানদেরকে তাদের নিজ শহর ও ঘরবাড়ী থেকে দূরে চলে যেতে বাধ্য করে এবং তাদেরকে এত উৎপীড়িত করে যে, কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তা ছিল হত্যার চেয়েও জঘন্য। আল্লাহ মসজিদুল হারাম বা কাবা শরীফের পবিত্রতা রার জন্য সেখানে যুদ্ধ নিষিদ্ধ করেছেন। অবশ্য অংশীবাদীরা যুদ্ধ শুরু করলে যেকোন জায়গায় আত্মরা জরুরী। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,

প্রথমতঃ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে আঘাত হানার কোন সুযোগই কাউকে দেয়া যাবে না এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশান্তি সৃষ্টিরও সুযোগ দেয়া যাবে না।

দ্বিতীয়তঃ যদিও আল্লাহর ঘর পবিত্র কিন্তু মুসলমানদের রক্ত আরো বেশী পবিত্র এবং এই রক্তের প্রতি সম্মান দেখানো আরো বেশী জরুরী।

তৃতীয়তঃ ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদেরই কাজের অনুরূপ শাস্তি দেয়া ইসলামের অন্যতম মূলনীতি।

এবারে সূরা বাকারার ১৯৩ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যে পর্যন্ত কুফর ও শির্ক বা অশান্তি দূর না হয় এবং আল্লাহর ধর্ম প্রতিষ্ঠিত না হয়। যদি তারা বিরত হয়, তবে সীমালঙ্ঘনকারী বা অত্যাচারী ছাড়া আর কাউকে আক্রমণ করা যাবে না।" ইসলামের দৃষ্টিতে জিহাদের উদ্দেশ্য ধন সম্পদ লাভ বা জাতিগত দ্বন্দ্ব কিংবা রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি নয় বরং জিহাদের উদ্দেশ্য হল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। জুলুম, অত্যাচার, অবিচার, অসত্য, শির্ক কুফরী ও কুসংস্কার নির্মূল করে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং জনগণকে আল্লাহর ধর্মের দিকে পরিচালিত করাই হল জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধের উদ্দেশ্য। তাই যারা ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন চালায়, আমরা শুধু তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে পারি। যদি তারা এসব কাজ থেকে বিরত হয় তাহলে যুদ্ধ শুরু করার অধিকার আমাদের নেই । ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মে বিশ্বাসী হবার কারণে কাউকে অসম্মান বা উৎপীড়ন করা যাবে না। এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,

প্রথমতঃ পৃথিবীতে আল্লাহর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। কারণ জালেম শাসকরা মানুষের মধ্যে ভুল ও মিথ্যা চিন্তাধারার প্রসার ঘটায়।

দ্বিতীয়তঃ সুপথে ফিরে আসা এবং ক্ষমা বা তওবার পথ কোন অবস্থাতেই বন্ধ নয়। এমনকি অবিশ্বাসী বা কাফেররাও যদি যুদ্ধের সময় তাদের ভুল চিন্তাধারা ও কাজ পরিত্যাগ করে তবে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন।

এবারে সূরা বাকারার ১৯৪ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "পবিত্র মাস, পবিত্র মাসের বিনিময়ে। এভাবে সব পবিত্রেরই বিনিময় আছে। যারা পবিত্র মাসে তোমাদের ওপর আগ্রাসন চালাবে তোমরাও তাদের অনুরূপ জবাব দেবে। তবে আল্লাহকে ভয় কর ও বাড়াবাড়ি করো না। জেনে রাখ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গী।" চারটি নির্দিষ্ট মাসে যুদ্ধ করতে ইসলাম নিষেধ করে। এই মাসগুলো হল রজব, জ্বিলকাদ, জ্বিলহাজ্ব ও মহররম। মুশরিকরা আল্লাহর এই নির্দেশ থেকে যুদ্ধের সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করতো। তারা এইসব মাসে মুসলমানদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাদেরকে অপ্রস্তুত করার পদপে নিত। তারা জানতো যে মুসলমানদের জন্য এইসব মাসে যুদ্ধ করার নিয়ম নেই। কিন্তু তারা এটা জানতো না যে, মুসলমানদের রক্তের মর্যাদা এইসব মাসের মর্যাদার চেয়েও বেশী। যারাই এই পবিত্রতা লঙ্ঘন করবে তাদের বিরুদ্ধেও মুসলমানদের পক্ষ থেকে অনুরূপ জবাব দেয়া হবে। এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে,

প্রথমতঃ শত্ররা সব সময়ই ক্ষতি করার জন্য ওঁৎ পেতে আছে। তাই তাদেরকে সুযোগের অপব্যবহার করতে দেয়া যাবে না।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next