সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

যদি কেউ স্বতস্ফুর্তভাবে সৎকাজ করে, তবে তার পক্ষে তা বেশী কল্যাণকর । যদি তোমরা উপলব্ধি করতে, তবে বুঝতে রোজা রাখাই তোমাদের জন্য বেশী কল্যাণকর । আল্লাহর বিধান যন্ত্রনাদায়ক কিংবা শক্তি হরনকারী নয় । বরং প্রত্যেকেই তার মতা ও শক্তি অনুযায়ী আল্লাহর বিধান পালন করতে পারে । যেমন সারা বছরের মধ্যে মাত্র এক মাস রোজা রাখা ফরজ । এই মাসে কেউ যদি সফরে বা অসুস্থ থাকে তাহলে অন্যান্য মাসে রোজা রাখতে হবে । আর যদি কোন মাসেই রোজা রাখার মতা না রাখে তাহলে রোজার মধ্যে ক্ষুধা সহ্য করার বদলে ক্ষুধার্তকে স্মরণ করে প্রতিটি রোজার পরিবর্তে প্রতিদিন একজন গরীবকে খাবার দিতে হবে । অবশ্য এটা স্পষ্ট, রোজার কাফফারা দিতে গিয়ে কেউ যদি একজনের বেশী মানুষকে খাবার দেয়, তাহলে তা বেশী কল্যাণকর । যদি কোন মানুষ রমজান মাসের রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়, তাহলে সে কখনও এমনটি বলবে না যে, হায় ! আমিও যদি রোজা রাখা থেকে মাফ পেতাম এবং এর পরিবর্তে গরীবকে খাওয়াতে পারতাম ! এই আয়াত থেকে আমরা যে মূল শিক্ষা পেতে পারি, তাহলো ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম এবং এটি প্রত্যেক মানুষের উপযুক্ততা অনুযায়ী বিধান দিয়েছে । তাই রোজার বিধান সফরকারী, অসুস্থ এবং সুস্থদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রকম ।

এবারে সুরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক, এই আয়াতটির অর্থ হলো : " পবিত্র রমজান মাসে কোরআন অবতীর্ন হয়েছে । কোরআন সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য ও অসত্যের পার্থক্যকারী । সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে, তারা যেন এ মাসে রোজা রাখে । কেউ অসুস্থ থাকলে কিংবা ভ্রমনে থাকলে অন্যসময় এ সংখ্যা পূরণ করতে হবে । আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ, তাই চান এবং যা তোমাদের জন্য কষ্টকর তা চান না । তাই তোমরা রোজা রাখবে অর্থাৎ রোজার সংখ্যা পূরণ করবে এবং নিজেদেরকে সৎপথে পরিচালিত করার জন্য তোমরা আল্লাহর মহিমা গাইবে ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আগের আয়াতে রোজা ফরজ হবার মূলনীতি এবং এর কিছু বিধান তুলে ধরা হয়েছে । এই আয়াতে রমজান মাসে রোজা রাখার কথা নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে । অবশ্য রমজান মাস রোজার চেয়েও যে জন্য বেশী গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এ মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে । মূলত: রমজানের মর্যাদা ও গুরুত্ব কোরআনের জন্যই । এই মাসের শবে ক্বদরের রাত্রিতেই নাজিল হয় পবিত্র কোরআন । মাসের নাম গুলোর মধ্যে শুধু রমজান মাসের নামই কোরআনে স্থান পেয়েছে ।

রামাদান শব্দের অর্থ পোড়ানো । এই মাসে রোজাদারদের পাপ বা গুনাহ পোড়ানো হয় । ইসলাম একটি সহজসরল ধর্ম । এই ধর্মের ভিত্তি হল সুযোগ সুবিধা ও সরলতা এবং জটিলতা থেকে মুক্তি । তাই রমজান মাসে রোজা রাখা যাদের জন্য কষ্টকর ও অসম্ভব, তারা বছরের অন্য সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে ৩০টি রোজা রাখতে পারে । যদি কোন সময়ই তার পে রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে রোজার কাফফারা দিতে হবে । অনুরূপভাবে নামাজের ক্ষেত্রেও যদি অজু করতে অসুবিধা থাকে, তাহলে তায়াম্মুম করার অনুমতি রয়েছে । যদি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া কষ্টকর হয়, তাহলে বসে অথবা শুয়েও নামাজ পড়তে হবে । তাই আল্লাহর কাছে এজন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, তিনি মানুষের শক্তি ও সামর্থ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন এবং কোন ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করেন নি । তাহলে এই আয়াতের মূল শিক্ষা হল রমজান মাসে রোজা রেখে আমাদের আত্মাকে পাপের কালিমা থেকে মুক্ত করতে হবে এবং আমাদের অন্তরে কোরআনের প্রভাব সৃষ্টির জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে ।

এবারে সুরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক । এই আয়াতের অর্থ হলো "আমার দাসগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে প্রশ্ন করে, তখন বলে দিন আমি তো কাছেই রয়েছি । আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে, আমি তার আহবানে সাড়া দেই । সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে, আর পূর্ণতা লাভ করে । কোন এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)কে প্রশ্ন করেন আল্লাহ কি আমাদের কাছে রয়েছেন যে নিঃশব্দে কিছু প্রার্থনা করলেও শুনবেন অথবা তিনি কি এত দূরে রয়েছেন যে উচ্চস্বরে তার কাছে কিছু চাইতে হবে ? এই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়ে আল্লাহ এ আয়াতে বলেছেন যে, "তিনি তার বান্দাদের কাছেই রয়েছেন তারা যতটুকু কল্পনা করে তার চেয়েও তিনি কাছে "। যেমন আল্লাহ সুরা ক্বাফের ১৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন, "আমি মানুষের ঘাড়ের রগের চেয়েও কাছে রয়েছি "দোয়া বা প্রার্থনার জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থান ও সময়ের দরকার হয়না । মানুষ যে কোন সময় যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারে । অবশ্য রমজান মাস দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ মাস বলেই প্রার্থনা বিষয়ক আয়াত রমজানের রোজা সংক্রান্ত আয়াতের মধ্যে স্থান পেয়েছে । এই ছোট্ট আয়াতে আল্লাহ সাতবার নিজের পবিত্র সত্ত্বার এবং সাতবার বান্দাদের কথা উল্লেখ করেছেন । যাতে মানুষ ও আল্লাহর মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় হয় । তাহলে এই আয়াত থেকে আমরা শিখলাম আল্লাহ আমাদের প্রার্থনা ও আহবান শোনেন এবং আমাদের চাহিদা বা অভাব পূরণ করেন তাই আমরা শুধু তার কাছেই চাইবো ও শুধু তারই নির্দেশ পালন করবো । কারণ আমাদের সৌভাগ্য ও উন্নতি তার প্রতি বিশ্বাসের ওপরই নির্ভর করছে ।

কোরআনের আলো

( ৫২ তম পর্ব )

কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াত থেকে ১৮৯ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো । প্রথমে সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতের অর্থ করা যাক । এই আয়াতের অর্থ হল, "রমজানের রাতে স্ত্রী-গমন তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে। তারা যেমন তোমাদের পোশাক,তোমরাও তাদের পোশাক। আল্লাহ জানতেন যে,তোমরা আত্ম-প্রতারণা করেছিলে (এ কাজ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তোমরা মাঝে মধ্যে তা করেছিলে)। এ জন্যে আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হয়েছেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছেন,সুতরাং এখন তোমরা স্ত্রী-গমন করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা বিধিবদ্ধ করেছেন,তা কামনা কর,আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাতের কালোরেখা থেকে ভোরের শুভ্ররেখা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। এরপর রাত্রির আগমণ পর্যন্ত তোমরা রোজা পূর্ণ কর এবং তোমরা মসজিদে এতেকাফ অবস্থায় তাদের সাথে মিলিত হয়োনা। এইগুলো আল্লাহর সীমারেখা। তাই গোনাহর উদ্দেশ্যে এগুলোর নিকটবর্তী হয়োনা। এভাবে আল্লাহ তার নিদর্শনাবলী মানব-জাতির জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যেন তারা সংযত হয়।"

ইসলামের সূচনা লগ্নে রোজার বিধান কিছুটা কঠিন ছিল। রমজান মাসে দিনের মত রাতেও স্ত্রীর সাথে মেলা-মেশা নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি শুধু রাতের ঘুমের আগেই পানাহার করা যেত। কিন্তু অনেক মুসলমান আল্লাহর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। অর্থাৎ তারা রমজানের রাতে পেট ও যৌন প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারেননি। কোরআনের ভাষায়- তারা নিজেদেরকেই প্রতারিত করেছে। এ অবস্থায় আল্লাহ এই পরীক্ষামূলক নির্দেশ পরিবর্তন করে রমজানের রাতের বেলায় পানাহার ও স্ত্রী-সংসর্গকে বৈধ করে দেন; যাতে তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশের অবাধ্য হতে না হয়। আল্লাহ তাদের এই নির্দেশ অমান্যজনিত গোনাহও মাফ করে দেন। অবশ্য যারা মসজিদে এতেকাফ অবস্থায় থাকবে,তাদের জন্য স্ত্রীর সাথে মেলামেশা বৈধ নয়। এই আয়াতে দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে,স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের জন্য পোশাকস্বরুপ। পোশাক একদিকে মানুষের দোষত্রুটি ঢেকে রাখে। অন্যদিকে পোশাক মানুষের সৌন্দর্য-চর্চারও মাধ্যম। স্বামী ও স্ত্রী একে অপরকে বিচ্যুতি থেকে রার পাশাপাশি পরস্পরের জন্য প্রশান্তি ও সৌন্দর্যেরও মাধ্যম। পোশাক যেমন মানুষের শরীরকে উষ্ণ রাখে,তেমনি স্বামী ও স্ত্রী পরিবারকে প্রাণচঞ্চল ও বিষাদমুক্ত রাখে। আর লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, এক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রীর সমান ভূমিকা। এবারে এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো একে একে তুলে ধরছি।

প্রথমতঃ ইসলামী বিধানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, কোন বিধান পালন কঠিন 'লে-সেক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজতর বিধান দেয়া হয়।

দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর নিদের্শ অমান্য করার অর্থ হ'ল-নিজের ওপর জুলুম করা বা নিজের ওপর প্রতারণা করা। কারণ এর জন্য আল্লাহ ক্ষতিগ্রস্থ না হয়ে নির্দেশ অমান্যকারীই ক্ষতিগ্রস্থ হবে।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next