সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

( ৫০ তম পর্ব )

কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা বাক্বারার ১৮০ নম্বর আয়াত থেকে ১৮২ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করবো । সুরা বাক্বারার ১৮২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে " যদি তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয় এবং যদি সে ধন-সম্পত্তি রেখে যায়, তবে উপযুক্ত পন্থা অনুযায়ী তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের জন্যে ওসিয়্যত করার বিধান তোমাদেরকে দেওয়া হল । এটাই ধর্মভীরুদের জন্য কর্তব্য । "

আমরা যারাই এ দুনিয়াতে একবার এসেছি তাদেরকে একদিন এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে । যখন এসেছিলাম, তখন আমরা খালি হাতেই এসেছিলাম এবং যখন চলে যাব তখনও খালি হাতেই চলে যাব । ঘরবাড়ী, অর্থ-গাড়ী,কল-কারখানা এসবই ছেড়ে চলে যেতে হবে । ইসলামের বিধান অনুযায়ী কেউ মারা গেলে তার তিন ভাগের দুই ভাগ সম্পদ স্ত্রী ও সন্তানদের জন্যে অথবা অন্যান্য ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করতে হবে, জন্যে ওসিয়্যতের প্রয়োজন নেই । কিন্তু প্রত্যেকেই তার সম্পদের এক তৃতীয়াংশ কীভাবে ব্যবহার করা হবে সে ব্যাপারে ওসিয়্যত করে যেতে পারে । কোরআনের এই আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ধর্মভীরুদের হালাল সম্পদ বরকত ও কল্যাণের উৎস মৃত্যুর সময় অবশ্যই বাবা , মা ও নিকট আত্মীয়দের কথা ভাবা উচিত এবং তাদের জন্য ওসিয়ত করা উচিত । কারণ, স্বাভাবিকভাবেই তিন ভাগের দুই ভাগ সম্পদ স্ত্রী ও সন্তানদের অধিকারভূক্ত হবে । অবশ্য ওসিয়্যত করতে হবে বিবেক সম্পন্নবভাবে । অযৌক্তিতভাবে অতিরিক্ত স্নেহের বশে অথবা প্রতিহিংসার কারণে কাউকে বেশী সম্পদ দেওয়া ও কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। অনেক মানুষ মনে করেন ওসিয়্যতের কারণে মানুষ দ্রুত মারা যাবে । অথচ ওসিয়ত হল এক ধরনের ভবিষ্যৎ চিন্তা যাতে অভাব বা আর্থিক সমস্যার ক্ষতি পূরণ করা যায় । এই কাজের ফলে মৃত্যুর পরেও মানুষ সওয়াব ও পুরস্কারের অধিকারী হবে । তাহলে এ আয়াত থেকে বোঝা গেল প্রত্যেক মানুষের ওপর বাবা মায়ের অনেক বড় অধিকার রয়েছে এবং তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে তিনভাগের এক ভাগ সম্পত্তি থেকে কিছু সম্পদ ওসিয়্যত করা উচিত ।

এবারে আমরা সুরা বাক্বারার ১৮১ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে কথা বলবো । এই আয়াতের অর্থ হলো ঐ ওসিয়্যত শোনার পর কেউ যদি তা পরিবর্তন করে তবে যারা পরিবর্তন করবে অপরাধ তাদেরই । আল্লাহ সবকিছু শোনেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ । অনেক সময় সন্তান বা ঘনিষ্ট আত্মীয় স্বজন ওসিয়্যত শোনার পরও ওসিয়্যতের বিভিন্ন দিক পরিবর্তন করে ফেলে । যেমন কেউ কোন দরিদ্রকে কিছু টাকা দেওয়ার ওসিয়ত করেছেন কিন্তু দেখা যায় ঐ দরিদ্রকে না দিয়ে অন্য কোন লোককে তা দিয়ে দেওয়া হয়েছে । পবিত্র কোরআন বলছে, এ ক্ষেত্রে যিনি ওসিয়্যত করেছেন তিনি তাঁর প্রাপ্য পুরস্কার পেয়ে গেছেন । যে ব্যক্তি টাকা পেয়েছে তারও কোন দোষ নেই, কারণ সে জানে না কে এই অর্থের প্রকৃত হকদার বা অধিকারী । এক্ষেত্রে জেনে শুনে ওসিয়্যত পরিবর্তনকারী ব্যক্তিই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবে । মৃত্যুর পরও সম্পদের মালিকের ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে । এমনকি সন্তানও মৃত ব্যক্তির সম্পদকে নিজের খেয়াল-খুশিমত ব্যবহার করার অধিকার রাখে না । এই আয়াত থেকে আমরা যা শিখলাম তাহল ওসিয়্যত অনুযায়ী কাজ করতে হবে এক্ষেত্রে কোন ধরনের পরিবর্তন করার মানে খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা করা। আল্লাহ সবকিছুই জানেন এবং তিনি শাস্তি দিতে সক্ষম ।

এবারে সুরা বাকারার ১৮২ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক । এই আয়াতের অর্থ হলো " তবে কেউ যদি ওসিয়ত্যকারীর পক্ষপাতিত্ব কিংবা ওসিয়্যতের ফলে পাপের আশংকা করে, অতপর সে তাদের মধ্যে মীমাংসা বা সংশোধন করে দেয়, তবে তার কোন অপরাধ নেই । আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু " । আগের আয়াতে বলা হয়েছে, যে কেউ জেনে শুনে ওসিয়্যত পরিবর্তন করবে সে অপরাধী । কিন্তু মাঝে মধ্যে ওসিয়্যতকারী নিজেই অন্যায় ওসিয়্যত করে, ফলে পরিবারে ফেতনা সৃষ্টি হয়, অথবা সম্পদের এক তৃতীয়াংশেরও বেশী ওসিয়্যত করে যা বৈধ নয়, কিংবা এমন বিষয়ের নির্দেশ দেয় যা করা পাপ । এইসব ক্ষেত্রে ওসিয়্যত সংশোধন করাই সবার জন্য কল্যাণকর । কারণ এই ধরনের সংশোধনের ফলে সমাজ ও সমস্ত উত্তরাধিকারী ন্যায্য হিস্যা পায় ।

এই আয়াত থেকে আমরা শিখলাম ইসলামে কোন অচলাবস্থা নেই । যখনই কোন বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মানুষের সামনে আসে তখন অবশ্যই সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত । ওসিয়্যতের প্রতি সম্মান দেখানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ । কিন্তু ফেতনা-ফাসাদ প্রতিরোধ করা তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ । অবশেষে আমরা আল্লাহর কাছে মুনাজাত করছি গোটা সুস্থ জীবনে আমরা যেন আমাদের কর্তব্য পালন করতে পারি । মৃত্যুর সময় যেন আমরা যথাযথভাবে ওসিয়্যত করে অন্যদের জন্য সুখময় জীবন ও সুখের স্মৃতি রেখে যেতে পারি এবং নিজে খোদায়ী পুরস্কার লাভ করতে পারি ।

কোরআনের আলো
(
৫১তম পর্ব )

কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াত থেকে ১৮৬ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো । প্রথমেই সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক । এই আয়াতে বলা হয়েছে " হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমনটি করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের ওপর যাতে তোমরা খোদাভীরু হও ।" আল্লাহর অন্যতম বিধান যা শুধু ইসলামের বিধান নয়, পূর্ববর্তী ধর্মগুলোতেও এই বিধান ছিল । রোজা হলো একটি অদৃশ্য ইবাদত । আর নামাজ ও হজ্ব দৃশ্যমান ইবাদত । কিন্তু রোজা অদৃশ্য ইবাদত বলে তা দিয়ে নিজকে জাহির করা বা লোক দেখানোর সম্ভাবনা কম । রোজা মানুষের ইচ্ছাকে শক্তিশালী করে । যারা একমাস ধরে সবধরনের খাদ্য-দ্রব্য ও ইন্দ্রীয় তৃপ্তি থেকে দূরে থাকে, তারা অন্যের ধন-সম্পত্তির ব্যাপারে নিজের লোভ-লালসাকে দমন করতে সম হয় । রোজা ধর্মীয় ও মানবীয় দয়া-উদারতাকে উৎসাহিত ও শক্তিশালী করে । যারা একমাস ধরে ক্ষুধার যন্ত্রণা উপলব্ধি করে তারা ক্ষুধার্তদের কষ্ট বুঝতে পারে এবং তাদের সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে ও সহানুভূতিশীল হয় । রোজা গুনাহ বা পাপ বর্জনের পরিবেশ সৃষ্টি করে । বেশীরভাগ পাপ পেটপূজা ও ইন্দ্রিয় পরায়ণতা থেকে উদ্ভূত । রোজা এই দুই প্রবৃত্তিকে দমনে রেখে দূর্নীতি ও পাপ হ্রাস করে এবং খোদাভীরুতা বৃদ্ধি করে । অবশ্য আহার ও পানীয় বর্জন করা সাধারন মানুষের রোজা । পবিত্র ও মহৎ লোকেরা খাবার ও পানীয়ের পাশাপাশি গোনাও বর্জন করেন । তাহলে এই আয়াতের মূল বক্তব্য হচ্ছে-

প্রথমত: রোজা ঈমানের অন্যতম লণ । এটা মানুষের মধ্যে খোদাভীরুতার চেতনাকে শক্তিশালী করে।

দ্বিতীয়ত : আল্লাহর বিধান পালন করা আমাদের জন্যই কল্যাণকর । এমন নয়, যে আল্লাহ আমাদের নামাজ ও রোজার মুখাপেক্ষী । এবারে সুরা বাকারার ১৮৪ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখা করা যাক । এই আয়াতের অর্থ হলো রোজা, নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য ফরজ । তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় ঐ সংখ্যক রোজা রাখতে হবে । রোজা যাদের জন্য কষ্টদায়ক যেমন অতি বৃদ্ধদের জন্য, তারা অবশ্যই একজন অভাবগ্রস্তকে অন্নদান করবে ।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next