সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

এই আয়াতে তাদেরকে সৎকর্মশীল মুমিন বলা হয়েছে, যারা অবশ্যই দিতে হবে এমন অর্থ সাহায্য বা জাকাত আদায় ছাড়াও স্বেচ্চায় অভাবগ্রস্ত দেরকে অতিরিক্ত অর্থ সাহায্য দেন। অনেক মানুষ গরীবদেরকে অর্থ সাহায্য করলেও এটাকে নিজের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলে মনে করে না, আবার অনেকে বঞ্চিত ও অভাবগ্রস্তদেরকে জাকাত দেয় না।

এবারে সূরা বাকারার ১৭৮ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "হে বিশ্বাসীরা নর হত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য প্রতিশোধের বিধান দেয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস, নারীর বদলে নারী কিন্তু এই ধর্মের অনুসারী ভাইয়ের প থেকে মা করা হলে কিসাসের পরিবর্তে প্রচলিত রক্তপণ প্রথা অনুসরণ কর ও সদয়ভাবে তার পাওনা আদায় করতে হবে। এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে লঘু বিধান ও করুণা। সুতরাং এরপর যে কেউ সীমালঙ্ঘন করবে, তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।"

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম। ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়ের সকল ক্ষেত্রে ইসলাম বিশেষ পথ নির্দেশনা ও বিধান দিয়েছে, যাতে মানব সমাজ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার অধিকারী হয়। প্রত্যেক সমাজে মাঝে মধ্যে কিছু মানুষকে হত্যার ঘটনা ঘটেহত্যা ও এর পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্য ইসলাম কিসাসের বা বদলার বিধান দিয়েছে, যাতে সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই বিধান অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। মৃত্যুদন্ডের ফলে নিরাপরাধ মজলুম ব্যক্তির রক্ত বৃথা যায় না এবং অন্যরাও মানুষ হত্যায় সাহসী হয় না। কিসাস বা প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করতে হবে। তাই নিহত ও হত্যাকারীর মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য পুরুষ হত্যার জন্য হত্যাকারী পুরুষকে হত্যা ও নারী হত্যার জন্য হত্যাকারী নারীকেই হত্যা করতে হবে, অন্য কাউকে নয়। নিহতের আত্মীয়- স্বজনের পক্ষ থেকে কিছুটা ক্ষমা করা হলে রক্তের অর্থ মূল্য দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে টাল-বাহানা করা বা কম দেয়া যেমন অন্যায়, তেমনি অর্থ আদায়ের পরও হত্যাকারীকে চাপের মুখে রাখা অন্যায়। যদি কোন পুরুষ কোন নারীকে হত্যা করে তাহলে নারীর জীবনের রক্তমূল্য দিতে হবে। আবার যদি নারী পুরুষকে হত্যা করে তবে পুরুষের রক্তমূল্য দিতে হবে। অজ্ঞতার যুগে আরবদের কোন গোত্রের একজন অন্য গোত্রের কারো হাতে নিহত হলে হত্যাকারীর পুরো গোত্রের সবাইকে হত্যার জন্য আরবরা পদক্ষেপ নিত। ফলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত উভয় পক্ষ। আর এখানেই কোরআনের এই আইনের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামের ন্যায়বিচার অনুযায়ী একজনের হত্যার বদলে হত্যাকারী ছাড়া অন্য কাউকে হত্যা করা যাবে না। উপরন্তু নিহতের আত্মীয়-স্বজনরা রক্তমূল্য নিয়ে অথবা তা না নিয়েও হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে পারে। ক্ষতিপূরণ গ্রহণ ও দেয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরণের বাড়াবাড়ি অগ্রহণযোগ্য। এ ক্ষেত্রে ঐশী আইনের লঙ্ঘনকারীরা পরকালে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। পরবর্তী আয়াতে সমাজে এই বিধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এবারে সূরা বাকারার ১৭৯ নম্বর আয়াতে অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "হে জ্ঞানী লোকেরা, তোমাদের জীবন রয়েছে কিসাসের বিধানের মধ্যে, যেন তোমরা খোদাভীরু হও।" দুঃখজনকভাবে তথাকথিত বিদ্যাবুদ্ধির দাবীদার অনেক মানুষ কিসাসের আইনের প্রভাবের দিকে লক্ষ্য না করে প্রশ্ন করেন যে, হত্যাকারীকে হত্যার ফলে কি নিহত মানুষ জীবিত হবে? এবং প্রতিশোধ বা কিসাসের ফলে আরেক জন মানুষকেই তো হত্যা করা হলো। এই প্রশ্ন আজ মানবাধিকারের নামেও আলোচিত হচ্ছে। পবিত্র কোরআন এর জবাবে একটি মৌলিক দিকের কথা উল্লেখ করেছে। আর তা হলো মানুষের জীবন ন্যায় বিচার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা ছাড়া সম্ভব নয়। আর এ দুটি বিষয় প্রতিষ্ঠার জন্য হত্যাকারীর কাছ থেকে প্রতিশোধ নেয়া জরুরী। যেমনটি কোন ব্যক্তির সুস্থতার জন্য শরীরের কোন পচনশীল অংশ কেটে ফেলা জরুরী। মূলত: কিসাসের বিধান ব্যক্তিগত প্রতিশোধের চেয়ে সামাজিক নিরাপত্তার জন্যই বেশী জরুরী। বর্তমানে কোন্ সব দেশে অপরাধ ও খুন খারাবী বেশী হচ্ছে? যেসব দেশে কিসাসের পূর্ণ বিধান বা এই বিধান আংশিকভাবে রয়েছে সেসব দেশে? না কি-সে সব দেশে মানবাধিকারের ধুয়া তোলা হয় এবং কিসাসের বিধানকে পর্যন্ত নরহত্যা বলে মনে করা হয়।

এবারে সূরা বাকারার ১৭৭ থেকে ১৭৯ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরছি।

প্রথমতঃ বঞ্চিত ও দরিদ্রদের সহায়তা করা ছাড়া এবং মানুষের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো ছাড়া আল্লাহর প্রতি ঈমানের মূল্য নেই।

দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা আন্তরিক ঈমানের লক্ষণ।

তৃতীয়তঃ দুঃখ কষ্টে, দারিদ্র-যাতনায় ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণ করা ঈমানের জন্য জরুরী। শুধুমাত্র নিরাপত্তা, শান্তি ও সুখের সময় ঈমান রাখা দৃঢ় ঈমানের পরিচয় নয়।

চতুর্থতঃ ইসলাম কোন কোন আইনের মত কিসাস বা প্রতিশোধের আইনকে একমাত্র পথ বলে মনে করে না, আবার ক্ষমা করে দেয়াকেও শ্রেষ্ঠ পথ বলে মনে করে না। ইসলাম হত্যাকারীর শাস্তির বিধানকে কিসাস বা প্রতিশোধ হিসাবে এবং ক্ষমা করা অথবা রক্তের মূল্য নেয়াকেও সহজ বিধান হিসাবে গ্রহণ করেছে। #

কোরআনের আলো



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next