সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

কোরআনের আলোর এবারের পর্বে আমরা সূরা বাকারার ১৭২ নম্বর থেকে ১৭৬ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো। সূরা বাকারার ১৭২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "হে বিশ্বাসীগণ তোমাদেরকে আমি যা দিয়েছি, তা থেকে পবিত্র বস্তু খাও এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, যদি তোমরা শুধু তারই ইবাদত কর।" এই পৃথিবী একটা বাগানের মত। পবিত্র ও সৎ মানুষ হলো এর ফুল ও উদ্ভিদ। আল্লাহর নেয়ামত বা অনুগ্রহসমূহ হল সেই পানির মত যা বাগানের মালি তার ফুলগাছগুলোকে বড় করে তোলার জন্য বাগানে প্রবাহিত করেন। কিন্তু ঘাস ও আগাছাও যদি ঐ পানি থেকে উপকৃত হয় তাহলে কি কিছু করার আছে? তাই মহান আল্লাহ বিশ্বাসীদেরকে তার অসংখ্য নেয়ামত থেকে উপকৃত হবার পরামর্শ দিয়ে বলছেন, অহেতুক কোন কিছুকে যেন তারা নিজেদের জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা না করে। কারণ এসব নেয়ামত তো মূলত: মানুষের জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। অবশ্য আল্লাহ জীবিকাকে পেট পূজা ও স্বাদ-আস্বাদনের জন্য দান করেননি। কারণ আল্লাহর বাগানের ফল পবিত্র জিনিস। তাই সবচেয়ে ভালো পন্থায় তা ব্যবহার করতে হবে। আর এটাই হল প্রকৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।

এবারে সূরা বাকারার ১৭৩ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "তিনি কেবল তোমাদের জন্য মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যা জবাই করার সময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নাম নেয়া হয়েছে, তা তোমাদের জন্য অবৈধ করেছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি নিরুপায় অথচ অন্যায়কারী কিংবা সীমালংঘনকারী নয় তার কোন পাপ হবে না, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।"

পবিত্র কোরআন সাধারনত: মানুষকে কোন কাজ করতে নিষেধ করার আগে, প্রথমে ঐ কাজের হালাল ও বৈধ পন্থাগুলো বর্ণনা করে। এরপর হারাম বিষয়গুলো উল্লেখ করে। পূর্ববর্তী আয়াতে পবিত্র ও নিষিদ্ধ নয় এমন খাবার খেতে বলার পর এ আয়াতে বলা হয়েছে, তোমাদের জন্য সব কিছুই বৈধ এবং মাশীল শুধু অল্প কিছু জিনিস-তাও তোমাদের আত্মা ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় হারাম করেছেন। রক্ত, মৃত জীব ও শূকরের মাংস বাহ্যিক অপবিত্রতার জন্য নিষিদ্ধ। কিন্তু মূর্তি পূজারীরা, মূর্তী পূজার জন্য যেসব পশু উৎসর্গ করে অথবা মূর্তি বা দেব-দেবীর নাম মুখে নিয়ে যেসব পশুর মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়-তা শির্ক বা অপ্রকাশ্য অপবিত্রতার জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইসলাম একটি সামাজিক ও সহজ ধর্ম। এখানে কোন পর্যায়েই অচলবস্থা নেই। মানুষের জন্য করণীয় সব কিছুই দরকারের সময় ইসলাম মনে করিয়ে দিয়েছে। আর এটাই আল্লাহর দয়া ও করুণার লণ। তাই জরুরী অবস্থার যে নিয়ম সে নিয়মের অপব্যবহার করা উচিত নয়।

এবারে সূরা বাকারার ১৭৪ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, " আল্লাহ তার গ্রন্থে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা যারা গোপন রাখে ও বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া অন্য কিছুই পুরে না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি।"

আগের আয়াতে বিভিন্ন হারাম খাদ্য যেমন, শূকরের মাংস ও মরা জন্তুর বিষয়ে বলা হয়েছে। এ আয়াতে একটি সামগ্রীক নীতি উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা হলো যদি মানুষ অবৈধ পন্থায় টাকা আয় করে সে টাকা দিয়ে যাই করুক না কেন তা যদি হালাল খাদ্যও হয় তবে তা হবে আগুন খাওয়ার মত এবং তাতে নিজের জন্য যন্ত্রনাই অর্জিত হবে। অবৈধ টাকা বা অর্থ আয়ের একটি পদ্ধতি হলো সত্য গোপন বা বিকৃতির মোকাবেলায় নীরব থাকা। যেমন অনেক ইহুদী ও নাসারা পন্ডিত এমনটি করতেন। তারা তাওরাত ও ইঞ্জিনের মাধ্যমে ইসলামের নবীর লক্ষণগুলো জানা সত্ত্বেও এবং তাঁকে চেনা সত্ত্বেও সামান্য সম্পদ ও পদ হারাবার ভয়ে সত্যকে গোপন ও উপো করতো। আল্লাহ এদের শাস্তি সম্পর্কে বলেছেন, যারা আল্লাহর বাণীকে পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে রাজী হয়নি তারা পরকালে আল্লাহর ভালবাসাপূর্ণ বক্তব্য শোনা থেকে বঞ্চিত হবে।

এবারে সূরা বাকারার ১৭৫ ও ১৭৬ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ দুটি আয়াতে বলা হয়েছে, "তারাই সুপথের বিনিময়ে কুপথ এবং ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে, আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল। এই শাস্তির কারণ সত্যসহ কিতাব নাজেল করেছেন, কিন্তু যারা কিতাবের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করেছে, তারা সত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে খুবই কঠোর।"

এই দুই আয়াতে দুর্নীতিপরায়ন পন্ডিত বা জ্ঞান পাপীদের মাধ্যমে সত্য গোপন করার পরিনাম উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পন্ডিতদের এই বিশেষ পাপের ফলে তারা হেদায়াত বা মুক্তির আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে বিভ্রান্তি ও লাঞ্চনার মধ্যে নিমজ্জিত হল। শুধু জ্ঞান থাকলেই মানুষ সৌভাগ্যের অধিকারী হয় না বরং তা একটি জাতি ও প্রজন্মের বিভ্রান্তিরও কারণ হয়। অসৎ পন্ডিতরা শুধু যে নিজেদেরকেই মুক্তির পথ থেকে বঞ্চিত করে তা নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু মানুষের বিভ্রান্তিরও কারণ হয় তারা।

তাই স্বাভাবিকভাবেই এ ধরণের পন্ডিতদের শাস্তি শুধু তাদের নিজেদের বিভ্রান্তির সাথে সম্পর্কিত নয় বলে অর্থাৎ বহু লোকের বিভ্রান্তির দোষে দোষী বলে তাদেরকে এইসব মানুষকে বিভ্রান্ত করার শাস্তি পেতে হবে। আর এ ধরণের শাস্তি কতই না ভয়াবহ। ১৭৬ নম্বর আয়াতে সত্য বিকৃতি বা গোপন করাকে সত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে উৎসারিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এইসব মানুষ সত্যকে জেনে শুনেও মেনে নিতে প্রস্তুত হয়নি বরং সত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে এবং বিভিন্ন পন্থায় মানুষের মধ্যে সত্য সম্পর্কে সন্দেহ ও বিভেদ সৃষ্টি করেছে।

এবারে সূরা বাকারার ১৭২ থেকে ১৭৬ নম্বর আয়াতের মূল শিক্ষাগুলো তুলে ধরছি।



back 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next