সূরা বাকারার তাফসীর-৩

রেডিও তেহরান

কোরআনের আলো

( ৪১তম পর্ব )

কোরআনের আলোর এবারের পর্বে সূরা বাকারার ১৩৯ থেকে ১৪২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমেই ১৩৯ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "হে নবী, আপনি আহলে কিতাবদের বলুন, আল্লাহ সম্বন্ধে তোমরা কি আমাদের সাথে বিতর্ক করতে চাও? যখন তিনি আমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। আমাদের কর্ম আমাদের জন্য এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য, আমরা তাঁর প্রতি অকপট।" দুঃখজনকভাবে কোন কোন ধর্মের অশিক্ষিত অনুসারীরা মনে করেন যে, তারা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহ শুধু তাদের নিয়েই ভাবেন ও তাদের জন্যই পথ-প্রদর্শন পাঠিয়েছেন। তাই তারা অন্যান্য নবী ও তাদের অনুসারীদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। অথচ আল্লাহর সাথে কোন গোষ্ঠীর বা বংশের আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। সবাই আল্লাহর কাছে সমান এবং একমাত্র যে বিষয়টি আল্লাহর সাথে মানুষের দূরত্ব ও নৈকট্য সৃষ্টি করে, তাহলো মানুষের কর্মকান্ড। আর প্রত্যেককেই তার কর্মফল ভোগ করতে হবে। অবশ্য আল্লাহর কাছে সেসব কাজই গ্রহণীয় হবে, যেসব কাজ আন্তরিকভাবে আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করা হবে। এ ধরনের কাজ হলো প্রকৃত ঈমানের নিদর্শন এবং এসব কাজ সব ধরণের শির্কযুক্ত চিন্তাধারা। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের একাধিপত্যকামীতা কখনও এতদূর পর্যন্ত গড়ায় যে, এমনকি আল্লাহকেও পর্যন্ত শুধুমাত্র নিজেদের জন্যই চায়, অন্য কারো জন্য নয় এবং আল্লাহকে শুধু নিজেদের খোদা বলে মনে করে, অন্যদের নয়। অথচ আল্লাহ কোন ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীর একক অধিকারভুক্ত নন। তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীরই পালনকর্তা।

এবারে সূরা বাকারার ১৪০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "হে আহলে কিতাব! তোমরা কি বলতে চাও ইব্রাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরগণ ইহুদী কিংবা খ্রীষ্টান ছিল? হে নবী, আহলে কিতাবদের বলুন, তোমরা কি বেশী জান , না আল্লাহ ? আল্লাহর নিকট হতে নবীদের বিষয়ে সাক্ষ্য-যা তাঁর কাছে আছে, তা যে গোপন করে, তা অপেক্ষা কে অধিক অত্যাচারী এবং তোমরা যা করছ, সে সম্পর্কে আল্লাহ বেখবর নন।"

হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এর কোন কোন অনুসারী তাদের ধর্মের সত্যতা প্রমাণের জন্য এ দাবী করে যে স্বয়ং হযরত ইব্রাহীম ও তার পরবর্তীকালের নবীরাও ছিলেন, তাদের ধর্মের অনুসারী। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও পরবর্তীকালের নবীদের ইতিহাস অনুযায়ী এ ধরণের দাবীর পেছনে অন্যায় বিদ্বেষ ছাড়া ও জাতিগত বিদ্বেষ ছাড়া অন্য কোন যুক্তি নেই। পবিত্র কোরআন সত্যের বিকৃতিকে সবচেয়ে বড় অপরাধ বলে মনে করে। কারণ সত্যের বিকৃতি বহু যুগ ধরে বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং এর ফলে সমাজের বিকাশ ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্থ হয়।

এবারে সূরা বাকারার ১৪১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "সেই একদল ছিল, নিশ্চয়ই যারা গত হয়েছে, তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের জন্য এবং তোমরা যা অর্জন করেছ তা তোমাদের জন্য এবং তারা যা করে গেছে, সে সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে না।"

এই আয়াতে ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের ভিত্তিহীন দাবীর জবাব দেয়া হয়েছে। এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, কেন তারা তাদের ইতিহাসকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর যুগ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাচ্ছে? একটি জীবন্ত বা গতিশীল সমাজকে অবশ্যই নিজের কাজের ওপর নির্ভর করতে হবে, অতীত ইতিহাসের ওপর নয়। অতীতের সমস্ত নবী ও জাতি গত হয়ে গেছে। তাদের কর্ম তাদের সাথেই সম্পর্কিত। তেমনি ইহুদী ও নাসারা জাতিকেও তাদের কাজকর্মের জন্য নিজেদেরকেই জবাবদিহিতা করতে হবেগুণাবলী হল অর্জন করার বিষয়। আর প্রত্যেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে নিজের প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। গুণাবলী উত্তরাধিকারের মত কোন বিষয় নয় যে তা সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে লাভ করবে।

এবারে সূরা বাকারার ১৪২ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, "নির্বোধ লোকগুলো বলবে, কিসে তাদেরকে তাদের কেবলা হতে ফিরিয়ে দিল, যার দিকে তারা ছিল। বল, পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই, তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন।" এর আগে আমরা বলেছিলাম, মুসলমানদের বিরোধীতা করার ক্ষেত্রে ইহুদীদের অন্যতম অজুহাত ছিল বায়তুল মোকাদ্দাসের পরিবর্তে কাবা শরীফকে কিবলা করা। এই আয়াতে ও পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে এ বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট আলোচনা এবং ইহুদীদের আপত্তির জবাব দেয়া হয়েছে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) নবুওত লাভের পর মক্কায় থাকাকালীন সময়ে অর্থাৎ দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ রেখে নামাজ পড়তেন। কারণ-

প্রথমত : আল্লাহর সমস্ত উপাসকদের কেবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস এবং সমস্ত ঐশী ধর্মের কাছেই বায়তুল মোকাদ্দাস ছিল সম্মানিত স্থান।

দ্বিতীয়ত : মুশরিকরা কাবা ঘরকে মূর্তির ঘরে রূপান্তরিত করেছিল। এ অবস্থায় ইসলামের নবী (সাঃ) যদি কাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন, তাহলে বাস্তবে তা হতো মূর্তিদের দিকে মুখ ফেরানো। মদীনায় হিজরত করার পরও কয়েক মাস পর্যন্ত মুসলমানরা বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন। আর ইহুদীরা এ বিষয়কে অজুহাত করে বলতো, তোমরা মুসলমানরা আমাদের অনুসারী। তোমাদের কোন স্বাধীনতা নেই-কারণ তোমাদের কোন স্বতন্ত্র কেবলা নেই। এ নিয়ে উপহাস ও বিদ্রুপ মুসলমানদের জন্য অসহনীয় ছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেন। একদিন রাসূল (সাঃ) যখন মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন, তখন জিব্রাইল ফেরেশতার প্রতি নির্দেশ দেয়া হলো, নামাজের মধ্যেই রাসূল (সাঃ)কে যেন কাবামুখী করা হয়। সেই থেকে ঐ মসজিদ জু-কেবলাতিন অর্থাৎ দুই কেবলার অধিকারী মসজিদ হিসাবেই খ্যাতি লাভ করে। কিন্তু বাহানাবাজ ইহুদীরা এবার নতুন আপত্তি তুলে মুসলমানদেরকে বললো, যদি আগের কেবলা সঠিক হয়, তাহলে কোন কারণে তা বাতিল করা হলো? এবং কেন এতকাল পর্যন্ত বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ রেখে নামাজ পড়া হলো? পবিত্র কোরআনে এর জবাবে বলা হলো, কেবলার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ স্থান বা কোন অঞ্চল নিয়ে আছেন বা আল্লাহ পশ্চিম দিকে আছেন বা পূর্ব দিকে আছেন। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ পূর্ব-পশ্চিম সব দিকেই আছেন এবং সবই তার মালিকানাধীন। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোন স্থানেরই বিশেষ কোন মর্যাদা নেই। আল্লাহর নির্দেশেই আমরা কোন বিশেষ স্থানকে সম্মান করি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহর নির্দেশের অনুগত হওয়া। আল্লাহ যেদিকেই মুখ ফেরানোর নির্দেশ দেন, সেদিকেই আমাদের মুখ ফেরানো উচিত-তা কাবাই হোক বা বায়তুল মোকাদ্দাস হোক। তারাই আল্লাহর সহজ ও সঠিক পথে পরিচালিত হবে, যারা আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করবে। যা-ই তাকে বলা হবে কোন প্রশ্ন ছাড়াই তা মেনে নিতে হবে। নিজের ইচ্ছার সাথে যা সঙ্গতিপূর্ণ শুধু তা-ই গ্রহণ করা ও এছাড়া অন্য কিছুকে প্রশ্নের সম্মুখীন করা আল্লাহর আনুগত্যের পরিচয় নয়।



1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 next